kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব ও জনজীবনে অংশগ্রহণ

ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া

৩ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব ও জনজীবনে অংশগ্রহণ

‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ এর বাস্তব রূপায়ণে প্রয়োজন সমাজের পেছনের মানুষগুলোর অবস্থা ও অবস্থানগত পরিবর্তন। দেশে প্রতিবন্ধী জনগণের আর্থ-সামাজিক অধিকার আদায়ে অগ্রগতি হলেও অগ্রগতি নেই নেতৃত্ব ও জনজীবনে অংশগ্রহণ তথা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে। গণতান্ত্রিক অধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নেতৃত্ব ও জনজীবনে অংশগ্রহণ। নেতৃত্ব নিশ্চিত করে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিসরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শামিল হওয়ার সক্ষমতা আর জনজীবনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে নেতৃত্বের বিকাশ।

বিজ্ঞাপন

এই পরিপূরক মেলবন্ধন ব্যতীত অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়। জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসের প্রতিপাদ্যেও এ কথারই প্রতিফলন ঘটেছে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘কভিড-১৯ পরবর্তীতে অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রবেশযোগ্য এবং টেকসই বিশ্ব বিনির্মাণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ’। আজ ৩ ডিসেম্বর ৩০তম আন্তর্জাতিক এবং ২৩তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস। কভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের সব পর্যায়ের মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব আরো গুরুতর এবং বহুমাত্রিক। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানগত, সুরক্ষাগত এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জনজীবন এবং অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব প্রদান প্রক্রিয়ায় কভিড-১৯ মহামারি সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গবেষণায় উঠে এসেছে যে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী কভিডকালীন আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর পাশাপাশি জনজীবন এবং নেতৃত্বেও অনেক পিছিয়ে পড়েছে। প্রতিবন্ধী মানুষের ‘জনজীবনে অংশগ্রহণ’ বলতে সমাজ পরিসরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা)-এর পরিচালনা কমিটিতে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ, পরিবার ও সমাজে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মতামত প্রদানের সুযোগ, রাষ্ট্রীয় পরিসরে ভোটাধিকার (ভোট প্রয়োগ ও ভোটে অংশগ্রহণ) এবং জনপ্রতিনিধিত্বকে বোঝানো হয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রবেশযোগ্য এবং টেকসই বিশ্ব বিনির্মাণে এসব পর্যায়ে  প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব প্রদানের সুযোগের সৃষ্টি হলে কভিড-১৯-পরবর্তী জীবনধারায় তাদের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সারা বিশ্বে ৭০০ কোটির অধিক মানুষের বসবাস। এর মধ্যে ১০০ কোটির অধিক মানুষ কোনো না  কোনোভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার। গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বে প্রতি সাতজনের মধ্যে একজন এবং ২০ জন শিশুর মধ্যে একজন প্রতিবন্ধিতার শিকার। বিশ্বব্যাপী প্রতিবন্ধী মোট জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশে এবং ২০ শতাংশ উন্নত দেশে বসবাস করে। বিশ্বে ৭০ লাখ প্রতিবন্ধী জনগণের হুইলচেয়ারের প্রয়োজন, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৫ থেকে ১৫ শতাংশ প্রতিবন্ধী মানুষ হুইলচেয়ার ব্যবহার করার সুযোগ পায়। বিশ্বে ৯৩ লাখ প্রতিবন্ধী শিশু রয়েছে। এর মধ্যে যাদের বয়স এক থেকে ১৫ বছর তারা সবচেয়ে মধ্যম ও চরম মাত্রার প্রতিবন্ধিতার শিকার। বিশ্বের ৫০ শতাংশ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। সারা বিশ্বের তিন কোটি ৬০ লাখ মানুষ শ্রবণপ্রতিবন্ধিতার শিকার। সারা বিশ্বে উৎপাদিত মোট শ্রবণ উপকরণ মাত্র ১০ শতাংশ শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারে। এর মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের মাত্র ৩ শতাংশ। এ ছাড়া বিশ্বের যোগাযোগ বৈকল্যে আক্রান্ত  মানুষগুলো এখনো প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির বাইরে রয়েছে (ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন প্রজেক্ট-২০২১)। এ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিত কভিড-পরবর্তী বিশ্বে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বের বিকাশ এবং অধিকার আদায়ে জনজীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ আজ সময়ের দাবি।   

সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও এ পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে, উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার অংশীদার হতে পারে। জগত্খ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এ ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন-২০১১-এর শুরুতেই স্টিফেন হকিং তাঁর নিজ জীবন সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘সফলতার পথে প্রতিবন্ধিতা কোনো বাধা হতে পারে না। আমি আমার প্রাপ্ত বয়সে পেশির স্নায়ুবিক রোগে আক্রান্ত হয়েছি। কিন্তু এ অবস্থা হতে জীবনব্যাপী পরিত্রাণ না পেলেও আমি আমার পেশাগত ও পারিবারিক জীবনের সর্বোচ্চ উৎকর্ষে পৌঁঁছেছি’। শুধু স্টিফেন হকিং নয়, যুক্তরাষ্ট্রের চারবারের প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। সুতরাং প্রতিবন্ধিতা নয়; প্রতিবন্ধী মানুষের সক্ষমতার ওপর দৃষ্টিপাত করতে হবে। তাহলেই উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। এ ক্ষেত্রে দেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা এবং সমাজের মূল স্রোতোধারায় সম্পৃক্তকরণের মধ্য দিয়ে তাদের সার্বিক উন্নয়নে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশ সরকারের ভিশন-২০২১, সপ্তম পঞ্চম বার্ষিক পরিকল্পনা এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-২০৩০-এর ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে পাঁচটি লক্ষ্যে (লক্ষ্য-৪, ৮, ১০, ১১ ও ১৭) প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। জাতিসংঘ প্রণীত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদের সঙ্গে সংগতি রেখে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন ও তাদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি সুনিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার দুটি যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। এ ছাড়া সরকারের প্রতিবন্ধীবান্ধব গৃহীত উদ্যোগগুলোর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ জরিপ, স্বাস্থ্য, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, অনুদান ও সুদমুক্ত ঋণ, থেরাপি এবং চাকরির ক্ষেত্রে বয়স ও কোটা প্রবর্তন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে কভিড-১৯-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষাকে সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের উচিত দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অঙ্গীকার, বিশেষ শিশুদের শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি এবং শিক্ষাচক্রের সফল সমাপনে কমপক্ষে দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে বিশেষায়িত স্কুলের স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তির কার্যক্রম অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করা। দেশে  বর্তমানে এক হাজার ৭৭২টি বিশেষায়িত স্কুল রয়েছে। স্কুলগুলোতে পাঁচ লাখের অধিক প্রতিবন্ধী শিশু পড়াশোনা করছে। ৫০ হাজারের অধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং পেশাজীবী কর্মরত রয়েছেন। উল্লেখ্য, এক হাজার ৭৭২টি বিশেষায়িত স্কুলের মধ্যে মাত্র ৫৭টি স্কুলের সরকারি স্বীকৃতি এবং এর মধ্যে ৩৪টি স্কুলের এমপিওভুক্তি রয়েছে। পাঁচ লাখের অধিক প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষাজীবন এবং শিক্ষকদের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়ে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সৃষ্টি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

নেতৃত্বের চর্চা অগ্রগামিতার পথকে প্রস্তত করে। যা করতে গিয়ে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন সৃজনশীলতা ও সাহসিকতা, কৌতূহল ও প্রশ্ন জানার আগ্রহ এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস হৃদয়ে ধারণ করা। কারণ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব সহজ হলেও এর পথযাত্রা সহজ নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ‘কভিড-১৯ পরবর্তীতে অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রবেশযোগ্য এবং টেকসই বিশ্ব বিনির্মাণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ’ নিশ্চিতকরণে সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সাতটি প্রস্তাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে। যথা—এক. স্থানীয় সরকারের সব স্তরে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব সৃষ্টিতে কোটা প্রথা চালু করা,  দুই. ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার বিভিন্ন কমিটিতে যোগ্যতাসম্পন্ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সদস্য পদ প্রদান করা, তিন. শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কমিটিতে বিশেষায়িত সদস্য পদ সৃষ্টি করা, চার. জাতীয় সংসদে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ সৃষ্টি করা, পাঁচ. ভবিষ্যৎ সুনাগরিক গঠনে প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষাজীবন নিশ্চিতকল্পে সাধারণ ও একীভূত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সরকারি স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তির কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা, ছয়. প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কোটা প্রথা বহাল রাখা এবং সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যে বা যাঁরা জড়িত তাঁদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বিষয়ে সংবেদনশীল করা।  

লেখক : উপব্যবস্থাপক (প্রশিক্ষণ)

পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা