kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

টিকা মজুদদারি সর্বনাশ ডেকে আনবে

গর্ডন ব্রাউন

৩ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টিকা মজুদদারি সর্বনাশ ডেকে আনবে

স্বাস্থ্যনেতাদের পক্ষ থেকে বারবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হলেও উন্নয়নশীল বিশ্বে মানুষের হাতে হাতে কভিডের টিকা দেওয়ায় আমাদের ব্যর্থতা এখন আমাদেরই তাড়া করতে ফিরে আসছে। আগে থেকে আমাদের সতর্ক করা হলেও আমরা একই জায়গায়ই রয়ে গেলাম। আমরা ভুলে গেলাম গণটিকার অভাবে কভিড শুধু অরক্ষিত মানুষের মধ্যে বাধাহীনভাবেই ছড়ায় না, বরং এর রূপান্তরও ঘটে। এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে একদিকে দরিদ্র দেশগুলোতে নতুন নতুন ধরন বের হচ্ছে, অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর সম্পূর্ণভাবে টিকা দেওয়া লোকদের সংক্রমিত করার পথ খুলে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এযাবৎকালের সবচেয়ে ‘জটিল’ এবং ‘উদ্বেগজনক’ ওমিক্রন ধরনটির উদ্ভব গণটিকার অভাবে হয়েছে। অথচ বিশ্বে এখন পর্যন্ত ৯১০ কোটি কভিড টিকা উৎপাদিত হয়েছে এবং বছরের শেষে তা এক হাজার ২০০ কোটিতে উন্নীত হবে. যা দিয়ে পুরো বিশ্বকেই টিকা দেওয়া যায়।

আগামী সোমবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) নীতিনির্ধারক বডি বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদ (ডাব্লিউএইচএ) একটি বিশেষ অধিবেশনে বসবে। তারা আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের ছয়টি দেশে ডিসেম্বরের মধ্যে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রার ৪০ শতাংশের কম অর্জিত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে শুনানি করবে। দেশগুলোর মধ্যে জিম্বাবুয়ে মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষ প্রথম ডোজ এবং ১৯ শতাংশ পূর্ণ ডোজ টিকা পেয়েছে। লেসোথো ও এসোয়াতিনিতে জনসন অ্যান্ড জনসনের সিঙ্গেল ডোজের টিকা পেয়েছে যথাক্রমে মাত্র ২৭ এবং ২২ শতাংশ মানুষ। নামিবিয়ায় সংখ্যাটি আরো কম, ১০ শতাংশ মানুষ, যাদের মাত্র ১২ শতাংশকে পূর্ণ ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা অবশ্য তার ২৭ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে পেরেছে; কিন্তু এর গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে এখনো টিকাদানের হার এক অঙ্কেই রয়ে গেছে।

শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, সমগ্র আফ্রিকাা মহাদেশই এখন টিকা না পাওয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ। এর যুক্তিসংগত কারণও আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নয়া উপনিবেশবাদের কারণে টিকাদানে আফ্রিকানদের নিজস্ব প্রচেষ্টাকে কয়েক মাস ধরে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। এমনকি যখন দেখা গেল ইউরোপের টিকা আছে এবং আফ্রিকার টিকা নেই—এই ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে, তখনো ইউরোপীয় ইউনিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকায় উৎপাদিত জনসন অ্যান্ড জনসনের কয়েক মিলিয়ন সিঙ্গেল ডোজ টিকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং তা আফ্রিকা থেকে ইউরোপে পাঠানোর জন্য চাপ দেয় ।

গত জুনে বরিস জনসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তাঁর দেশ ও জি-৭-ভুক্ত অন্য দেশগুলোর উদ্বৃত্ত টিকাগুলো সারা বিশ্বে ব্যবহার করা হবে। সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে ৯২টি দরিদ্রতম দেশের জন্য ডিসেম্বরের মধ্যে ৪০ শতাংশ জনসংখ্যাকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর আড়াই মাস পর ৮২টি দেশে লক্ষ্য পূরণের সম্ভাবনা খুব সামান্যই রয়েছে। গত ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতির মাত্র ২৫ শতাংশ টিকা সরবরাহ করেছিল। এয়ারফিনিটির তথ্য মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিশ্রুতির মাত্র ১৯ শতাংশ, যুক্তরাজ্য ১১ শতাংশ, কানাডা মাত্র ৫ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়া ১৮ শতাংশ ও সুইজারল্যান্ড ১২ শতাংশ টিকা দিয়েছে। চীন ও নিউজিল্যান্ড প্রতিশ্রুতির অর্ধেকেরও বেশি প্রদান করেছে, যদিও তাদের অঙ্গীকারের পরিমাণ যথাক্রমে মাত্র ১০ কোটি ও ১৬ লাখ। এর ফলে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে যেখানে মাত্র ৩ শতাংশ লোককে সম্পূর্ণভাবে টিকা দেওয়া হয়েছে, সেখানে উচ্চ আয়ের দেশ ও উচ্চমধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই সংখ্যা ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

ভালো খবর হলো আমাদের চিকিৎসা প্রতিভাবানরা ওমিক্রন ধরনটি দ্রুত শনাক্ত করেছেন এবং দ্রুত গতিতে এর সিকোয়েন্স করা হচ্ছে। এখন আমাদের বিজ্ঞানীদের সাফল্য ও বিশ্বনেতাদের ব্যর্থতার বৈপরীত্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই সপ্তাহ থেকেই এমন কোনো জোর প্রচেষ্টা শুরু করতে হবে, যা ভয়গুলো দূর করতে পারে। না হলে টিকাবিহীন লোকদের মধ্যে নতুন নতুন রূপান্তর কভিডকে তৃতীয় বছরে নিয়ে যাবে এবং সংক্রমণের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম ঢেউ নিয়ে আসবে।

এ অবস্থায় আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারি। জি-৭-ভুক্ত দেশগুলোতে এখন ৫০ কোটি অব্যবহৃত টিকা রয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে তা ৬০ কোটিতে উন্নীত হবে এবং ফেব্রুয়ারির মধ্যে হবে ৮৫ কোটি টিকা, যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের দেশগুলোতে পাঠানো যেতে পারে। এর বিকল্প চিন্তা—তথা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে টিকাগুলো ধ্বংস করা হবে ভয়াবহ। কোভ্যাক্সের মতে, পশ্চিমা দেশগুলোর প্রায় ১০ কোটি টিকা ডিসেম্বর-মেয়াদি উত্তীর্ণ হবে।

এই পরিস্থিতিতে ‘মহামারি বিস্তার রোধ চুক্তি’ নামে কোনো কিছু করার জন্য আরো কোনো কিছুই জরুরি হতে পারে না। আসছে সপ্তাহে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদ যে নতুন ও বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তির কথা বিবেচনা করতে যাচ্ছে, তাতে অবশ্যই আমাদের নজরদারি ও প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থার উন্নত করতে হবে এবং দরিদ্র দেশগুলোতে চিকিৎসাসুবিধা দ্রুত হস্তান্তর নিশ্চিত করতে হবে। আমরা টিকা জাতীয়তাবাদ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাবাদকে প্রত্যাখ্যান করতে পারলেই শুধু প্রাদুর্ভাবকে মহামারিতে পরিণত হওয়া বন্ধ করতে পারব।

 

লেখক : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক স্বাস্থ্য অর্থায়ন বিষয়ক দূত ও যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য)

 



সাতদিনের সেরা