kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

কালান্তরের কড়চা

মানবতা না রাজনীতি, কোনটা জয়ী হবে

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

৩০ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মানবতা না রাজনীতি, কোনটা জয়ী হবে

দেশে বর্তমানে যে আন্দোলন চলছে, তা কোনো নীতি ও নৈতিকতাকেন্দ্রিক আন্দোলন নয়। নৈতিকতাকে এখানে ঢাল করা হয়েছে। আসলে আন্দোলনটি রাজনৈতিক স্বার্থকেন্দ্রিক। স্বার্থটি হচ্ছে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার ভগ্নস্বাস্থ্যকে পুঁজি করে মানুষের মনে সমবেদনা সৃষ্টি করা। তারপর সেই মানবিক সহানুভূতিকে রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণে ব্যবহার করা। এ ক্ষেত্রে বড় সুবিধা এই যে অতি বড় শত্রুও মৃত্যুপথযাত্রী জানলে মানুষ তার কোনো অপরাধ মনে রাখে না। তার প্রতি সহানুভূতিতে আকুল হয়ে ওঠে।

বিএনপি তার দলনেত্রীর এই ভীষণ অসুস্থতার সময়েও তাঁর রোগমুক্তি চায় না, তাঁর সুচিকিৎসা চায় না। চায় অসুস্থ নেত্রীর প্রতি দল-মত-নির্বিশেষে মানুষের মনে যে দয়া ও করুণা জাগ্রত হয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে দেশে সরকার পতনের আন্দোলন করার সুযোগ সৃষ্টি করা। এ ছাড়া তাদের হাতে কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নেই। থাকলে তার প্রতি জনগণের সমর্থন নেই।

আমি খালেদা জিয়ার রাজনীতির সমর্থক নই। এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত শুভাকাঙ্ক্ষীও নই। তিনি স্বৈরাচারী স্বামীর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও দ্বিতীয় ‘ইভা পেরন’ হতে পারেননি। ১৫ই আগস্টে শুধু জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার ব্যাপারে নয়, শিশু রাসেল ও নববধূ সুলতানা কামালকেও নৃশংস হত্যার ব্যাপারে তিনি যে অমানবিক মনোভাবের পরিচয় দেখিয়েছেন, যেভাবে দিনটিকে নিজের মিথ্যা জন্মদিন বানিয়ে প্রতিবছর উৎসব পালন করলেন, তা কোনো মানবিক হৃদয়ের অধিকারী মানুষ করতে পারেন না। তাঁর শাসনামলে পদে পদে জাতির পিতার অবমাননা, স্বাধীনতার শত্রুদের ক্ষমতায় আনয়ন রাষ্ট্রদ্রোহ ছাড়া আর কিছু নয়। এ জন্য আমি তো মনে করি সামান্য দুর্নীতির মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড নয়, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তাঁর আর্জেন্টিনার ইসাবেল পেরনের মতো যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া উচিত ছিল।

যা হোক, সরকারের নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত হওয়ায় খালেদা জিয়া এখন মুক্ত, কিন্তু নানা রোগে আক্রান্ত। রোগ গুরুতর। এই রোগ নিয়ে রাজনীতি করার চেয়ে তাঁর প্রাণ রক্ষার ব্যবস্থাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। কিন্তু বিএনপি গোড়া থেকেই নেত্রীর রোগ-চিকিৎসার চেয়ে তাঁর রোগ নিয়ে অমানবিক রাজনৈতিক খেলা খেলেছে। খালেদা জিয়া জেলে বসে অসুস্থ হলে সরকার তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিল। বিএনপি দাবি করে সরকারি ডাক্তারদের চিকিৎসা ভালো নয়। তাদের নিজস্ব চিকিৎসক দিতে হবে। দেওয়া হলো। তারপর দাবি উঠল তাঁকে জামিনে মুক্তি দিয়ে নিজস্ব পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসা লাভের সুযোগ দিতে হবে। সেই দাবিও মানা হলো। এখন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে বিলাতে চিকিৎসা লাভের দাবি উঠেছে।

খালেদা জিয়া যদি গুরুতর অসুস্থ হয়ে থাকেন, তাহলে প্রথমেই প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসার দ্বারা তাঁর জীবন রক্ষার ব্যবস্থা করা। এ জন্য বিদেশ থেকে নামকরা ডাক্তার আনা যেতে পারে। শেরেবাংলা ফজলুল হক ও জেনারেল আইয়ুবের গুরুতর অসুস্থতার সময় ভারত থেকে ডা. বিধান রায়কে ডেকে আনা হয়েছিল। এখনো খালেদা জিয়ার জন্য লন্ডন বা নিউ ইয়র্ক থেকে তাঁর রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টিম ডেকে আনা যেতে পারে। একজন গুরুতর দুর্নীতির মামলায় দেশের উচ্চ আদালত কর্তৃক দণ্ডিত অপরাধীকে বিদেশে পাঠানো যায় না। কিন্তু মানবতার খাতিরে অবশ্যই তাঁর উন্নত চিকিৎসা করা যায়। এ ব্যাপারে দেরি করা অপরাধ।

বিএনপি নেতারা নিশ্চয়ই ফ্রান্সের মার্শাল পেঁতার নাম জানেন। তিনি ছিলেন ফ্রান্সের জাতীয় বীর। ভার্দুন যুদ্ধে জয়ী হয়ে তিনি খেতাব পেয়েছিলেন মার্শাল পেঁতা অব ভার্দুন। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে হিটলারকে সহযোগিতা করায় তাঁকে যুদ্ধ শেষে রাষ্ট্রদ্রোহ ও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। পেঁতা তখন অশীতিপর বৃদ্ধ। বয়স বিবেচনা করে তাঁকে ন্যুরেমবার্গ বিচারের আসামিদের অন্তর্ভুক্ত না করে জেলের ভেতরেই বিচারের ব্যবস্থা করা হয় এবং বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দীর্ঘ কয়েক বছর কারাদণ্ড ভোগের পর পেঁতা জেলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি তখন মৃত্যুপথযাত্রী। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে তখন নবতিপর বৃদ্ধ এবং মৃত্যুপথযাত্রী পেঁতাকে মানবিক বিবেচনায় মুক্তিদানের আবেদন জানানো হয়, যাতে তিনি পরিবার-পরিজনের সঙ্গে শেষ কদিন কাটাতে পারেন এবং উন্নত চিকিৎসা লাভ করতে পারেন।

প্রথমে ফ্রান্সের হাইকোর্ট এই আবেদন নাকচ করেন। চূড়ান্ত পর্যায়ে সুপ্রিম কোর্ট এই মন্তব্যসহ পেঁতার পরিবারের আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেন যে ‘মার্শাল পেঁতা এতটাই রাষ্ট্রদ্রোহ করেছেন যে মৃত্যুদণ্ড তাঁর পাওনা ছিল। সেই দণ্ড না দিয়ে আদালত তাঁকে এর আগেই দয়া ও করুণা প্রদর্শন করেছেন। এর অধিক আদালতের কিছু করার নেই।’ এই রায়ের পর অসুখে ভুগে মার্শাল পেঁতা জেলেই মারা যান। তাঁর মৃতদেহ এমন এক অজ্ঞাত স্থানে মাটি দেওয়া হয়, যাতে  আত্মীয়-স্বজন ও সমর্থকরা কোনো খোঁজ না পায়।

বাংলাদেশে বসে বিএনপি নেতারা সম্ভবত শুধু এই কাহিনিটি নয়, এই কাহিনির তাৎপর্যও উপলব্ধি করেন। এ ছাড়া খালেদা জিয়াকে মানবিক সহানুভূতির পরিচয় দেখিয়ে সরকার চিকিৎসার জন্য প্যারোলের আওতায় বিদেশে পাঠাতে গেলে বিরাট রাজনৈতিক ঝুঁকি নেবে। এর আগে খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান একই অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে গেছেন। দলের নেতা হয়েছেন, কিন্তু আর দেশে ফেরেননি। সেখানে বসেই হাওয়াই রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশে তিনি সন্ত্রাসী রাজনীতির নায়ক ছিলেন। তালেবান সমর্থকদের বাংলাদেশে অভ্যুত্থান ঘটানোর ষড়যন্ত্রেও তারেক রহমান জড়িত বলে জানা যায়। এই অবস্থায় খালেদা জিয়া যদি লন্ডনে যান, তাহলে সুস্থ হয়ে উঠতে পারলে পুত্রের ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে যোগ দেবেন সন্দেহ নেই। জামিনের শর্ত মেনে তিনি দেশে ফিরে আসবেন। এটা বাতুলের প্রত্যাশা। মাতা ও পুত্রের যোগসাজশে বিদেশে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের রাজনীতির ঘাঁটি গড়ে উঠুক, সরকার কি তা চায়?

আমি খালেদা জিয়াকে মুক্তিদান ও বিদেশে পাঠানোর ঘোর বিরোধী। কিন্তু তাঁর জীবন রক্ষার জন্য বিদেশ থেকে নামকরা ডাক্তার ডেকে এনে সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাদানের পক্ষপাতী। এতে খালেদা জিয়া বাঁচবেন, দেশও বাঁচবে। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে বিএনপির ঘোঁট পাকানোর রাজনীতিও ব্যর্থ হয়ে যাবে।

লন্ডন, সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১



সাতদিনের সেরা