kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ওমিক্রন ভেরিয়েন্ট : বিশ্বজুড়ে বিপৎসংকেত

অনলাইন থেকে

২৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। অনেকেই আশা করেছিলেন মহামারির ভয়াবহতা শেষ হয়ে গেছে। এই শীতে মহামারি আরো গুরুতর হয়ে ওঠার সতর্কবাণী সত্ত্বেও আধাস্বাভাবিক পরিস্থিতি উপভোগ করতে পারায় এমনটা ভাবা হচ্ছিল। এই মুহূর্তে ইউরোপজুড়ে এমনিতেই কভিড সংক্রমণের ঘটনা বাড়ছে। কিছু বিরতি দিয়ে যুক্তরাজ্যে আবার সংক্রমণের হার বাড়ছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় শনাক্ত হওয়া করোনাভাইরাসের নতুন ভেরিয়েন্ট বিশ্বজুড়ে বিপত্সংকেত বাজাচ্ছে।

এই ধরনটির বিপদ সম্পর্কে সীমিত ধারণা পাওয়া গেছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে ‘উদ্বেগের’ তালিকায় রেখেছে। ভয়টি হচ্ছে ওমিক্রন ধরনটির বহুমাত্রিক রূপান্তর (মাল্টিপল মিউটেশন)। এর স্পাইক প্রোটিনে ৩২টি রূপান্তর পাওয়া গেছে। আমাদের শরীরের কোষগুলোকে উন্মুক্ত করতে এই স্পাইক প্রোটিনই চাবি হিসেবে কাজ করে। সুতরাং এর বহুমাত্রিক রূপান্তরের অর্থই হচ্ছে পূর্ববর্তী সংক্রমণ বা টিকা থেকে প্রাপ্ত অ্যান্টিবডিগুলো এটিকে প্রতিহত করতে যথেষ্ট নয়। ফলে বিজ্ঞানীরা এখন ইমিউন সিস্টেমের আরেকটি দিক টি-সেলের সঙ্গে এর মিথস্ক্রিয়ার দিকটি খুঁটিয়ে দেখছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার গোটেং প্রদেশে আক্রান্তের ঢেউ ওঠায় ভেরিয়েন্টটির সংক্রমণ সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আমরা এখনো জানি না এটি আরো গুরুতর রোগের কারণ হতে পারে কি না। যুক্তরাজ্যের হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সির প্রধান চিকিৎসা উপদেষ্টা ডা. সুসান হপকিন্স এটিকে ‘আমাদের দেখা সবচেয়ে উদ্বেগজনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ সতর্ক করেছেন, ‘এটি ডেল্টা ভেরিয়েন্টের চেয়ে বেশি সংক্রামক হতে পারে এবং বিদ্যমান টিকাগুলো এর বিরুদ্ধে কম কার্যকর হতে পারে।’

এটি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দিচ্ছে, এমনকি যদি শেষ পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় বলে প্রমাণিত হয়, তবু তা-ই করতে হবে। আমরা বারবার দেখেছি যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থায় তুলনামূলকভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে কম মূল্য দিতে হয় এবং সহজেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। কিন্তু বিলম্বিত পদক্ষেপে জীবনের মূল্য দিতে হয় এবং কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপের ঝুঁকি বাড়ায়। গত শীতে এটি দেখা গেছে। প্রশ্ন হতে পারে, কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ উপযুক্ত হবে। যদিও যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশ আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে ফ্লাইট স্থগিত করে দিয়েছে; কিন্তু এটিও সত্য যে এরই মধ্যে ভেরিয়েন্টটি ওই দেশগুলোর বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, দক্ষিণ আফ্রিকা নতুন ধরন শনাক্তে যে দক্ষতা ও স্বচ্ছতার পরিচয় দিয়েছে, পরিবহন সংযোগ বন্ধ করে এখন তাকে শুধু এর শাস্তিই দেওয়া হচ্ছে। অথচ এমন একটি ধরনের উদ্ভব অন্য কোথাও হতে পারে। এমন সন্দেহও রয়েছে যে ধরনটি যদি ইউরোপ বা আমেরিকায় উদ্ভব হতো, তাহলে পদক্ষেপ ধীরলয়েই হতো।

যা-ই হোক, ভ্রমণ স্থগিত ভেরিয়েন্টের বিস্তার আটকাতে পারে না। কেউ কেউ মনে করেন, আরো বেশি বেশি টিকা প্রদান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে আরো মূল্যবান সময় ব্যয় করা দরকার। বিচার-বিবেচনা করেই সময়টি ব্যয় করতে হবে। বাধ্যতামূলক মাস্ক পরার বিষয়টি কখনোই ‘প্ল্যান-বি’ হওয়া উচিত ছিল না। ব্রিটিশ সরকারের উচিত এখন এটি আবার চালু করা। এর পাশাপাশি বড় অনুষ্ঠানের জন্য ভ্যাকসিন পাসপোর্ট এবং অসুস্থ বা আইসোলেশনে থাকা লোকদের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ও এর প্রতিবেশী দেশগুলোকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। লক্ষ রাখতে হবে, অপুষ্টি, বিদ্যমান স্বাস্থ্য সমস্যা ও অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবার কারণে দরিদ্র দেশগুলোর মানুষ অতিরিক্ত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এই ধরনটি একটি শক্তিশালী বার্তাও দিচ্ছে। সেটি হচ্ছে ন্যায়সংগতভাবে ভ্যাকসিনগুলো বিতরণ করতে না পারা শুধু নৈতিকতার ব্যর্থতাই নয়, বরং আত্মসুরক্ষার ব্যর্থতাও। তাই ভাইরাসটি যত বেশি বিস্তৃত হবে, নতুন নতুন ধরন উদ্ভবের ঝুঁকি তত বাড়বে। দক্ষিণ আফ্রিকা, বতসোয়ানা ও অন্যান্য দেশ দীর্ঘদিন ধরেই কভিড ভ্যাকসিন, পরীক্ষাসামগ্রী ও ওষুধের মেধাস্বত্ব মওকুফের আহ্বান জানিয়ে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই আহ্বানে সমর্থন জানালেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য উদ্ভাবক দেশ এখনো তা ধরে রেখেছে। অথচ পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের হাতে থাকা ডোজ সমানভাবে বিতরণে ব্যর্থ হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্তমান সমস্যা শুধু টিকাপ্রাপ্তি নয়, টিকা প্রদানেও সমস্যা রয়েছে। কারণ ব্যাপক মাত্রার টিকা দ্বিধাগ্রস্ততা সেখানে রয়েছে। ফলে টিকাদানে বিলম্বিত শুরু সমস্যাগুলো দূর করতে পারেনি। এ ছাড়া অন্য আফ্রিকান দেশগুলো টিকা পেতে এখনো সংগ্রাম করছে।

মহামারি শেষ হতে এখনো অনেক বাকি; কিন্তু একদিন শেষ হবে। যদিও মানুষ এর গতিপথ ঠিক করে দিতে পারে না, তবে এটি ঠিক যে আমাদের পদক্ষেপ এর ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম। বিজ্ঞানী, চিকিৎসাকর্মী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মীর ত্যাগ এই মহামারির সবচেয়ে খারাপ দিকটি কমিয়ে এনেছে। এখন আমাদের বাকিদের নিজ নিজ ভূমিকা পালন করে যেতে হবে।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য)

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা