kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বিএনপি-আওয়ামী লীগ দ্বৈরথ এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতি

গাজীউল হাসান খান

২৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



বিএনপি-আওয়ামী লীগ দ্বৈরথ এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতি

দলীয়ভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক চরম সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছেছে বিএনপি। এই দলটিকে হয় আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে সাংগঠনিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হবে নতুবা এর অস্তিত্ব নিবুনিবু প্রদীপের মতো আরো ম্রিয়মাণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। এক-এগারোর পর থেকে কিংবা ২০০৮-এ অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর থেকে বিএনপির রাজনীতিতে দেখা দেয় বিভিন্ন সাংগঠনিক জটিলতা। ২০০৮-এ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে আজ পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বিগত ১৩ বছরে সাংগঠনিকভাবে না ঘর গোছাতে পেরেছে বিএনপি, না জনগণকে টেনে আনতে পেরেছে গণ-আন্দোলনের কোনো কার্যকর পথে। এ অবস্থার জন্য দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে মূলত দায়ী করেছে বিএনপি। বিএনপি দলীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন, দেশে এখন গণতন্ত্র কিংবা আইনের শাসন কোনোটিই নেই। সর্বত্র চলছে এক নজিরবিহীন দলন-পীড়ন, ফ্যাসিবাদী হামলা ও অপশাসনের তাণ্ডব। এ পরিস্থিতি একসময় বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন আওয়ামী লীগকেও ভোগ করতে হয়েছে। সে দলের নেতাদের ভাষায়, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশে চলছিল সামরিক শাসন। তাদের দলীয় নেতাকর্মীরা এও বলেছেন, ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যা থেকে ২০০৪-এর ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা পর্যন্ত আওয়ামী লীগের জন্যও সংগঠন করা কিংবা আন্দোলনের পথে নামা দুঃসাধ্য ছিল। কিন্তু সে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও ১৯৮১ সালে ভারত থেকে দেশে ফিরে এসে তৎকালীন বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিএনপিতে এখন দৃশ্যত তেমন কেউ নেই। এ ছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বদলেছে অনেক। পাকিস্তান আমল থেকে অদ্যাবধি যেকোনো বিরোধী দলের জন্য গণতান্ত্রিক কিংবা বৃহত্তরভাবে রাজনৈতিক দিক থেকে পরিস্থিতি ক্রমেই অত্যন্ত অসহনীয় ও দুঃসাধ্য অবস্থায় এসে ঠেকেছে। আজকের এই পরিস্থিতি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এর জন্য মূলত দায়ী আদর্শগতভাবে গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলা। এ ক্ষেত্রে পরমতসহিষ্ণুতার অভাব এবং প্রতিপক্ষকে সমূলে উচ্ছেদ করার দুরভিসন্ধিও কাজ করেছে পর্দার অন্তরালে।

বিএনপি দলনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে দলীয় নেতাকর্মীরা গত ২০ নভেম্বর থেকে গণ-অনশন কর্মসূচি পালন শুরু করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় নেতাকর্মীরা গত ২২ নভেম্বর ঢাকা প্রেস ক্লাবের সামনে একটি সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন। একই কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে নরসিংদীতে বিএনপি নেতা খায়রুল কবীর খোকনসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী অবরুদ্ধ হয়েছেন বলে জানিয়েছে গণমাধ্যম। বলা হয়েছে, স্থানীয় বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত শান্তিপূর্ণ সমাবেশ থেকে পুলিশ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে আটক করে নিয়ে যায়। এতে গ্রেপ্তারের ভয়ে বেশির ভাগ নেতাকর্মী কার্যালয়ের গেট ভেতর থেকে তালাবদ্ধ করে রাখে এবং পুলিশ সেই অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের কেন্দ্র করেই চারদিকে অবস্থান নেয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের অভিযোগ হচ্ছে, পুলিশ বিরোধী দলের কোনো ছোটখাটো শান্তিপূর্ণ সমাবেশও হতে দিচ্ছে না। এ ছাড়া বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজেদের ঘরবাড়িতে রাতে ঘুমাতে পারেন না, এমনকি অনেকে নিজ এলাকায়ও যেতে পারেন না গ্রেপ্তারের ভয়ে। দেশব্যাপী বিরোধী দল বিএনপি ও তার হাজার হাজার নেতাকর্মী এখন জেলে রয়েছেন। তাঁদের মতে, সরকার দেশে প্রকৃত অর্থেই বিরোধী দলের, বিশেষ করে বিএনপির অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে চায়। সরকারি দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মী ছাড়া কোনো নির্বাচনেই বিরোধীরা মাঠে নামতে পারে না, এমনকি ভোটও দিতে পারে না। দেশব্যাপী রাজনীতি ও নির্বাচনী পরিবেশকেই বিপন্ন করে তুলেছে সরকারের পুলিশ ও ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী। সংসদের বাইরে দেশের প্রকৃত বিরোধী দল বিএনপির বক্তব্য হচ্ছে, যে দেশে নির্ভয়ে শান্তিপূর্ণভাবে কোনো সভা-সমাবেশ আয়োজন করা যায় না, সেখানে গণ-আন্দোলনের প্রশ্ন তো সুদূরপরাহত। প্রকৃত বিরোধী দলের অংশগ্রহণ এবং প্রার্থীর অভাবে বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনে এখন সরকারি দলের প্রার্থীরাই দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে মারামারি করছেন। জাল ভোট ও বিভিন্ন কারচুপির ফলে সম্পূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থাটিই এখন প্রহসনে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির শাসনামলে বিরোধী শিবিরে থাকা আওয়ামী লীগও একই অভিযোগ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? কিভাবে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ধারা কিংবা মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার করে রাজনীতিকে একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক সরকার গঠনের জন্য উপযোগী করা যাবে—সেটি নিয়ে এখন দেশ-বিদেশে প্রচুর গবেষণা শুরু হয়েছে। তা না হলে বিশ্বের জনবহুল দেশগুলো থেকে ক্রমেই গণতান্ত্রিক রাজনীতি সাঙ্গ হয়ে স্বৈরাচার ও কর্তৃত্ববাদের রাজনীতি আরো বিস্তার লাভ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ কথা অনস্বীকার্য যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, উৎপাদন, রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকারের স্থিতিস্থাপকতার প্রয়োজন রয়েছে। তাই বলে প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রচর্চা কিংবা রাজনৈতিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে মানবসম্পদ কিংবা জনগোষ্ঠীর কোনো কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবে যেকোনো সরকারব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে কলুষিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা শক্তিশালী হয়ে ওঠে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিঠান মত প্রকাশ করছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গণতন্ত্র থেকে পিছু হটার তালিকায় এখন নাম উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রেরও। আর সেই তালিকায় বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার উপাধি হচ্ছে ‘হাইব্রিড’ ও ‘কর্তৃত্ববাদী’। সেখানে ভারতের গণতন্ত্রেও চরম অবক্ষয় দেখা দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুইডেনভিত্তিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্সের ২০২১ সালের বৈশ্বিক গণতন্ত্র পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সে প্রতিষ্ঠানটি আরো বলেছে, বাংলাদেশের মতো কিছু ‘হাইব্রিড’ ও ‘কর্তৃত্ববাদী’ দেশে নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওই নির্বাচনগুলো পুরোপুরি প্রতিযোগিতামূলক, অংশগ্রহণমূলক, স্বাধীন বা অনিয়মমুক্ত হয় না। বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা নিয়ে যখন দেশবাসী রীতিমতো গর্ব বোধ করা শুরু করেছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা কিংবা নির্বাচনে কারচুপি বা অনিয়ম নিয়ে কোনো মন্তব্য আমাদের অবশ্যই হতাশ করে। আর তারা শুধু বাংলাদেশকে নিয়ে আলাদাভাবে কথা বলেনি, বলেছে বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশকে নিয়ে; যেখানে গণতন্ত্র বিপন্ন হতে চলেছে। জানা গেছে, বিশ্বের ১১০টি দেশ নিয়ে আগামী মাসে গণতন্ত্র সম্মেলন আয়োজন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে আমরা শুনেছি, দুর্নীতিতে বিশ্বে কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। সেটি বিএনপি কিংবা যার আমলেই ঘটুক, তার জন্য লজ্জিত বাংলাদেশিরা। এ ধরনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত বাংলাদেশের রাজনীতিকদের। কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে; নতুবা দেশ সমৃদ্ধির পথে কখনো সামনে এগোতে পারবে না। আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব না আমাদের অর্থনৈতিক সংকট এবং ঘোচাতে পারব না আমাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ। সর্বস্তরে আলোকিত মানুষ তৈরি করতে না পারলে উন্নয়ন আমাদের দুর্নাম মুছে দিতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে একটি কষ্টার্জিত উন্নত দেশে বাস করছে বেশির ভাগ নীতি-নৈতিকতাহীন মানুষ।

ওপরে উল্লিখিত বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের আপামর মানুষ অবশ্যই প্রশ্ন করার অধিকার রাখে—বিএনপি কেন ক্ষমতার রাজনীতি করে কিংবা বিএনপি কেন আবার ক্ষমতায় যেতে চায়? ক্ষমতায় গেলে তারা জাতীয় উন্নয়ন বা সমৃদ্ধির জন্য আর কী কী পরিকল্পনা হাতে নেবে? মানুষের গণতান্ত্রিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তারা কতটুকু করতে চায়? পাশাপাশি দুর্নীতি উচ্ছেদ ও দেশ থেকে অর্থপাচার রোধ করতে কী কী ব্যবস্থা নেবে, তা মানুষকে জানাতে হবে। উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কী ব্যবস্থা নেবে, তা-ও জানাতে হবে দেশের মানুষকে। এ ছাড়া তথ্য-প্রযুক্তির বিস্তার ও পরিবেশদূষণ রোধ সংক্রান্ত বিষয়ে মাঝেমধ্যে সেমিনার কিংবা আলোচনাসভার আয়োজন করে বিএনপি জনমনে প্রচুর উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারে। খালেদা জিয়ার মুক্তি কিংবা বিদেশে উন্নত চিকিৎসার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে এখন সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। এর জন্য নিয়মতান্ত্রিকভাবে সভা-সমাবেশ করা যেতেই পারে। আর সেগুলো করতে গিয়ে দলগতভাবে তারা যে বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হচ্ছে তা কতটুকু স্বৈরতান্ত্রিক বা স্বেচ্ছাচারিতামূলক, তা দেশের জনগণ দেখবে, বিশ্ববাসী দেখবে। বাংলাদেশের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের আরো প্রায় দুই বছর বাকি। এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পাশ্চাত্যের অনেক গণতান্ত্রিক দেশ ও প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে সে নির্বাচন অত্যন্ত কাছে থেকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য। বিএনপি বা তার নেতৃত্বাধীন জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে কি না সে সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে হবে। ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা মারা গেছেন গত ১৩ বছরে। সে স্থানে অপেক্ষাকৃতভাবে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলা উচিত ছিল, যা আশানুরূপভাবে ঘটেনি। আগামী নির্বাচনের আগে দলের ইউনিয়ন পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। সত্তর ও আশির দশকে বিএনপি যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করত, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তাতে এখন যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (২৭টি জাতি) গঠনের পর থেকে আঞ্চলিক কিংবা বৈশ্বিক রাজনীতিতে আন্তর্জাতিকতা এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এতে বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে নিত্যনতুন ও অবাধ চিন্তা-ভাবনা কাজ করা শুরু করেছে। আর এর মধ্যে গণচীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়ন শুরু করেছে অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে।

বিএনপি প্রকৃত রাজনৈতিক স্বার্থে কিংবা অর্থে আওয়ামী লীগের চেয়ে বড় জাতীয়তাবাদী নয়। তারা তাদের জাতীয়তাবাদকে সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক আদর্শ বা নীতির সঙ্গে সমন্বয় সাধন করেছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে। সে কারণেই তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ভারতের সমর্থন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য চীন ও জাপানের সহযোগিতা নিতে পারছে একযোগে। এ ছাড়া বাংলাদেশে জনগণের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে যতটা হৈচৈ হচ্ছে, দেশের অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সাধারণ মানুষ যতটা সন্তুষ্ট, তার চেয়েও বেশি আত্মতৃপ্ত সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে। পদ্মা সেতু দক্ষিণবঙ্গের ২১টি জেলার কাছে আগামী দিনের একটি সোনালি স্বপ্ন। এই একটি সেতুকে কেন্দ্র করেই আঞ্চলিকভাবে আরো অনেক উন্নয়ন হবে, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। এর পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মিরসরাইয়ে গড়ে তোলা বিশাল শিল্পাঞ্চল, মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর, রাজধানীতে মনোরেল চালু করতে যাওয়া কিংবা বন্দরনগর চট্টগ্রামে বে টার্মিনাল নির্মাণ এবং কর্ণফুলী টানেল দেশের সাধারণ মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। সে স্বপ্ন সামনে এগিয়ে যাওয়ার, সোনার হরিণ ধরতে যাওয়ার। সুতরাং এ অবস্থায় যদি বিএনপি নেতারা মনে করেন দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেই তাঁরা ক্ষমতায় চলে যাবেন, তাহলে সেটি হবে দিবাস্বপ্ন। বিগত প্রায় ১৩ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ দলের অভ্যন্তরে দুর্নীতিবাজ, সুবিধাবাদী ও হাইব্রিড নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে না পারলেও সাংগঠনিকভাবে দলের শক্তি বৃদ্ধি করতে পেরেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশব্যাপী এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে তাঁর নীতি ও আদর্শের মহিমায়। আওয়ামী লীগের সে অবস্থান থেকে বিএনপি সহজেই তাকে সরিয়ে ফেলবে, তা ভাবার এখন তেমন সহজ পথ নেই।

তবু গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বিএনপিকে গভীর আস্থা নিয়ে বাস্তবতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। তাদের ওপর যে হামলা-মামলা ও রাজনৈতিক নির্যাতন চলছে, তা বন্ধ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন হলে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসিসহ অন্যান্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিতে হবে। তবে কারো উসকানিতে নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথ ছেড়ে মনগড়া ‘গণ-অভ্যুত্থানে’ ঝাঁপিয়ে পড়া ঠিক হবে না। এতে বিএনপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার প্রতি সহানুভূতি, সাহায্য ও সমর্থনটুকুই হারাবে।

 

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা