kalerkantho

শনিবার । ৮ মাঘ ১৪২৮। ২২ জানুয়ারি ২০২২। ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

কপ-২৬ : পুঁজিবাদের পরবর্তী ধাপের লড়াইয়ের প্রস্তুতি

সাইমন লুইস

১১ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গ্লাসগোতে চলমান জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন কপ-২৬-এ ১২০ জনের বেশি বিশ্বনেতা অংশ নিচ্ছেন। তার পরও এর সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আগের বড় সম্মেলনগুলোর তুলনায় এবারের সম্মেলনটি কি আদৌ কোনো পার্থক্য তৈরি করবে?

যেহেতু ১৯৯৫ সালে কপ-১ অনুষ্ঠিত হওয়ার এত বছর পরও কার্বন ডাই-অক্সাইডের নির্গমন আগের তুলনায় এখন ১৪ বিলিয়ন টন বেশি, তাই কপ-২৬-এর পুরো আয়োজনটাকে যদি একটি প্রহসন মনে করি, তাহলে কি আমাদের ক্ষমা করা যাবে? তবে এটা ঠিক যে এই সময়টি অতীতের চেয়ে আলাদা। কারণ এটা শুধু কার্বন নির্গমন হ্রাস নিয়ে নয়, পুঁজিবাদের পরবর্তী ধাপের বিরুদ্ধে এক নতুন ধারার লড়াই।

বিজ্ঞাপন

এর প্রভাব আমাদের সবার ওপরই পড়বে।

বিশ্বের সরকারগুলো এখন জলবায়ু পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মারাত্মক চাপের মুখে রয়েছে। জলবায়ু সংকট আর বিমূর্ত নয় এবং ভবিষ্যতের বিষয়ও নয়। আমরা যে দাবদাহ, বন্যা ও খরা অনুভব করছি বা খবরে দেখি, তাতে সহজেই অনুমেয় যে আরো বিপর্যয়, আরো খবর আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

অদম্য সাহসের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত আন্ত সরকার প্যানেলের বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে আমাদের দেখিয়েছে যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হারকে গড় শূন্যে নামিয়ে আনার মাধ্যমেই শুধু আমরা পৃথিবীর জলবায়ুকে স্থিতিশীল করতে পারি, যা নেট জিরো নির্গমন নামে পরিচিত। এর অর্থ হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসা এখন আর ‘যদি’ ব্যাপার নয়, বরং সময়ের ব্যাপার।

নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে সমাজকে শক্তিশালী করা এখন প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিকভাবেও সম্ভব। তেল ও গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানা নির্মাণের ব্যয়ের চেয়ে বায়ু ও সৌরশক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কমে গেছে এবং আরো কমে আসবে বলেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তাই জলবায়ু পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে নিষ্ক্রিয় থাকার জন্য অর্থনৈতিক অজুহাত দেখানোর দিন শেষ হয়ে গেছে।

গ্লাসগো আলোচনার বিভ্রান্তিকর জটিলতার বিষয়গুলোকে দেশ, কম্পানি ও প্রতিবাদ আন্দোলন—এই তিনটি প্রধান ব্লকের লড়াই হিসেবে দেখা যেতে পারে। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত নয় এবং একত্রে আলোচনাও করে না, তবে একই ফলাফল পেতে চায়।

এই ত্রিমুখী যুদ্ধ এরই মধ্যে কিছু বিস্ময়কর ও দ্রুত পরিবর্তনের দিকে নিয়ে গেছে। বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের জন্য প্রায় ৭৭ শতাংশ দায়ী দেশগুলো এখন মধ্য শতাব্দীর নেট জিরো ঘোষণার আওতায় রয়েছে, যার মধ্যে সৌদি আরব, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ জলবায়ু পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ঐতিহ্যগতভাবে বৈরী কিছু দেশ এবং আমেরিকা, ইইউ, যুক্তরাজ্য ও চীনের মতো শীর্ষ নির্গমনকারী দেশও রয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, জলবায়ু বিলম্বকারীরা কেন স্বেচ্ছায় নেট জিরো লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করছে? এটি প্রথম ব্লক থেকে আসা বৈশ্বিক নিন্দা ও অবিশ্বাসের কারণে হতে পারে। এটাও একটা কারণ হতে পারে যে ইইউ সম্মত হয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটরা উচ্চ কার্বন আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করে কার্বন সীমা সমন্বয় করার প্রস্তাব করেছে। এর অর্থ শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোকে বিশাল বাজারে প্রবেশের জন্য নিজেদের নির্গমন হ্রাসের বাধ্যবাধকতায় পড়তে হবে।

সামগ্রিকভাবে বাহ্যিক সংবেদনশীলতা প্রদর্শনের কারণে ধনী দেশগুলোর সমস্যা রয়েছে। যদি বিশ্ব অর্থনীতির মূল অঞ্চলের সরকারগুলো সবুজ শিল্প বিপ্লব শুরু করার জন্য বিনিয়োগ শুরু করে, তখন বাজারে নতুন প্রযুক্তি সেবার মূল্য হ্রাস পাবে। এর ফলে জীবাশ্ম জ্বালানি প্রতিযোগিতা থেকে সরে যাবে এবং নির্গমনও হ্রাস পাবে। এই প্রক্রিয়া বিশ্বকে কার্বন সীমা সমন্বয়ের কাছে নিয়ে আসবে।

ভিন্নভাবে দেখলে এই প্রক্রিয়া বেশির ভাগ জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্প বন্ধ এবং জলবায়ু সংকটের প্রকৃত সমাধানের কাছাকাছি যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে না। কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলনের জন্য নতুন নতুন অনুসন্ধান বন্ধ করার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে হাতে হাত মিলিয়ে বিকল্প খাতে বিনিয়োগে যাওয়া। তবে অনেক সরকার নিজেদের বিজ্ঞানের যৌক্তিক অনুসারী হিসেবে তুলে ধরলেও তারা আত্মবিভ্রমে আক্রান্ত। তারা দেশের ভেতরে নির্গমন হ্রাস করে, আবার রপ্তানির জন্য তেল, কয়লা ও গ্যাসের লাইসেন্স দেয়। নরওয়ে, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাজ্য ও কানাডা সবাই এটা করছে।

ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বাজার পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গির আরো মৌলিক সমস্যা হলো তাদের বাজারগুলো ন্যায্য নয়। কভিড ভ্যাকসিন কেলেঙ্কারি দেখিয়েছে যে কিভাবে নতুন প্রযুক্তি এবং বাজার দৃষ্টিভঙ্গি কোটি কোটি মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তাই জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এটা যদি ভেস্তে যায়, তাহলে বিপর্যয় হাতছানি দেবে। শক্তিশালী দেশ ও কম্পানিগুলোকে অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে বাজারের ওপর নির্ভর করে নেট জিরো অর্জন করা সম্ভব নয়। তাদের দুর্বল দেশ এবং জনগণের কথা শুনতে হবে। জলবায়ু সংকট সমাধানের জন্য দ্রুত ও ন্যায্য—উভয় পদক্ষেপই নিতে হবে।

লেখক : ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন ও লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক পরিবর্তন বিজ্ঞানের অধ্যাপক

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য)

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : আফছার আহমেদ

 

 



সাতদিনের সেরা