kalerkantho

শনিবার । ৮ মাঘ ১৪২৮। ২২ জানুয়ারি ২০২২। ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

মানবপাচার রোধে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

২ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মানবপাচার রোধে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ

সাধারণত জোরপূর্বক শ্রম, যৌন দাসত্ব অথবা পাচারকৃত মানুষকে ব্যাবসায়িক যৌন শোষণমূলক কাজে নিয়োজিত করার জন্য সংঘটিত অবৈধ মানব বাণিজ্যকে মানবপাচার বলে। মানবপাচার একটি দেশের অভ্যন্তরে বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে সংঘটিত হতে পারে। তবে মানবপাচার যেখানে এবং যেভাবেই সংঘটিত হোক না কেন, তা বড় ধরনের অপরাধ। মানবপাচার আইন-২০১২ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির অধিকার হরণ করে জবরদস্তিমূলক শ্রম আদায়, দাসত্বমূলক আচরণ, পতিতাবৃত্তি বা যৌন শোষণ বা নিপীড়নের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে শোষণ বা নিপীড়ন করা হলে তা মানবপাচার হিসেবে গণ্য হবে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী, মানবপাচার হচ্ছে মানুষের অধিকারের লঙ্ঘন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে, যা দুঃখজনক। অভাবের তাড়নায় কিংবা অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে অথবা উন্নত জীবনের আশায় বাংলাদেশ থেকে নারী-পুরুষ মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রায় প্রতিনিয়ত পাচারের শিকার হচ্ছে। উন্নত জীবন আর ভালো চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের পাচার করার পর শেষ পর্যন্ত তাদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। অর্থলোভী, অসৎ ব্যক্তি এবং দালালদের খপ্পরে পড়ে এভাবেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে অনেক মানুষের জীবন। সম্প্রতি ঢাকা ও চুয়াডাঙ্গায় অভিযান চালিয়ে মানবপাচার চক্রের প্রধানসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। সেই সঙ্গে উদ্ধার করা হয় পাচার হতে যাওয়া ২৩ জন নারীকে। বিদেশে চাকরিসহ নানা প্রলোভনে তাদের পাচার করা হচ্ছিল। গত বছরের ২৭ মে লিবিয়ায় ৩০ জন অভিবাসীকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যার মধ্যে ২৬ জনই বাংলাদেশের নাগরিক এবং তাদের বেশির ভাগই ছিল মানবপাচারের শিকার। ২০১৫ সালের ১ মে থাইল্যান্ডের গহিন অরণ্যে পাওয়া গিয়েছিল গণকবর। এরপর মালয়েশিয়ায়ও পাওয়া যায় গণকবর। ওই সব গণকবরে পাওয়া যায় অনেক বাংলাদেশির লাশ, যাদের বেশির ভাগই মানবপাচারের শিকার। ওই বছর ওই দুটি দেশ আর ইন্দোনেশিয়া থেকে মানবপাচারকারীদের নির্যাতনের শিকার ১৭৫ জনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এর পরও থেমে নেই মানবপাচার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবপাচারকারীরা ইউরোপে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দেশের মানুষকে লিবিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে। শীত মৌসুমে সাগর শান্ত থাকায় এ সময় মানবপাচারকারীদের অপতৎপরতা বেড়ে যায়। বর্তমানে মানবপাচারকারীদের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে মিয়ানমার থেকে নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। পাচারকারীরা রোহিঙ্গা পুরুষদের চাকরি ও মেয়েদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পাচারের চেষ্টা করে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত শুধু কক্সবাজার জেলা থেকেই পাচার হয়েছে এক লাখের বেশি লোক। পরবর্তী সময়ে মেয়েদের বিক্রি করে দেওয়া হয় যৌনপল্লীতে আর শিশুদের নিযুক্ত করা হয়েছে অবৈধ ও জবরদস্তি শ্রমে। এমনও দেখা গেছে, ইউরোপে যেতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকে নির্যাতনের কারণে এবং খাদ্যের অভাবে সাগরেই মর্মান্তিকভাবে মারা গেছে। এভাবেই উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন ভেসে যায় সাগরে, কখনো বা সেই স্বপ্নের কবর রচিত হয় গহিন বনে অথবা গণকবরে কিংবা পতিতাপল্লীতে।

বাস্তবতা হচ্ছে, মানবপাচারসংক্রান্ত ঘটনায় অনেক মামলা হলেও শেষ পর্যন্ত এসব মামলার তদন্ত ও বিচার এগোয় না। এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১২ সালে দেশে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন হওয়ার পর থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মানবপাচারসংক্রান্ত প্রায় ছয় হাজার মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয় ৯ হাজার ৬৯২ জন। ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এসব মামলায় সাজা হয় মাত্র ৫৪ জনের। মানবপাচারসংক্রান্ত এসব মামলার নিষ্পত্তির হার খুবই কম। মূলত পাচারের শিকার বেশির ভাগ পরিবার সমস্যা আর ভোগান্তির মধ্য দিয়ে দিন কাটায়। আর মানবপাচারকারী ও দালালরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সিনেমার ‘দাদা ভাই’-এর মতো পর্দার অন্তরালে থাকে। ফলে মানবপাচার বন্ধ হয় না। অনেক সময় মানবপাচারসংক্রান্ত মামলার তদন্তে ঘাটতি থাকায় আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। বলা বাহুল্য, আইনের প্রকৃত শাসন থাকলে এত মানুষ পাচারের শিকার হতো না। এটা বন্ধ করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার প্রয়োজন। বর্তমানে মানবপাচারের সবচেয়ে বড় রুট হলো কক্সবাজার। এখানে মানবপাচারের মামলা হয়েছে ৬৩৭টি; কিন্তু নিষ্পত্তি হয়েছে দু-একটি। অর্ধেক মামলা তদন্তাধীন রয়েছে আর খারিজ হয়ে গেছে ১৬টি মামলা। এর আগে দেশে মানবপাচার বিষয়ক কোনো সুনির্দিষ্ট আইন ছিল না। তখন দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মানবপাচারসংক্রান্ত অপরাধের বিচার করা হতো। সর্বশেষ ২০১২ সালে ‘মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২’ নামক আইন প্রণয়ন করা হয়। এ আইনের ৬ ধারায় মানবপাচার নিষিদ্ধ করে এর জন্য অনধিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়। আইনটির ৭ ধারায় সংঘবদ্ধ মানবপাচার অপরাধের দণ্ড মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা কমপক্ষে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়। এ আইনের অধীনে কৃত অপরাধগুলো আমলযোগ্য এবং তা আপস ও জামিনের অযোগ্য অপরাধ।

মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন হওয়ার পর গত ৯ বছরে এসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা পাঁচ হাজার ৭১৬টি। এ পর্যন্ত মাত্র ২৪৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ মামলা নিষ্পত্তির হার মাত্র ৪ শতাংশ। অনেক বিচার এখনো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালেই হচ্ছে। মানবপাচারসংক্রান্ত মামলা দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকার পেছনে এটিও একটি কারণ। আরেকটি বড় কারণ হলো মানবপাচার মামলায় আদালতে পুলিশ কর্তৃক সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হওয়া। মানবপাচার মামলায় সাধারণত নিয়মিতভাবে সাক্ষী পাওয়া যায় না। ভুক্তভোগীরা সহায়তা না করলে শেষ পর্যন্ত মামলা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, মানবপাচার রোধে আইনের সঠিক প্রয়োগ ঘটানো হলে, সরকারিভাবে দেশে বিভিন্ন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে এবং জনগণ কর্তৃক দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার মানসিকতা পরিহার করলে মানবপাচারের সংখ্যা নিঃসন্দেহে কমে আসবে। যেহেতু দেশে মানবপাচারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে, তাই মানবপাচার রোধে এখন আইনের কঠোর প্রয়োগের বিকল্প নেই। পাশাপাশি মানবপাচার রোধে গণমাধ্যমসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে অধিকতর তৎপর হতে হবে। অন্যথায় মানবপাচার বন্ধ হবে না এবং মানবপাচারকারীরাও শাস্তি পাবে না।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য এবং ফিলিপাইনের লাইসিয়াম অব দ্য ফিলিপাইন ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং প্রফেসর

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা