kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

বাড়ছে বিপজ্জনক বর্জ্য, প্রয়োজন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা

মৃত্তিকা দাশ দূর্বা

২৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাড়ছে বিপজ্জনক বর্জ্য, প্রয়োজন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা

জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, প্রযুক্তির বহুল ব্যবহার, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি ইত্যাদি কারণে ক্রমাগত বাড়ছে বর্জ্য পদার্থ। বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য পদার্থের মধ্যে এমন কিছু বর্জ্য আছে যেগুলোকে বলা হয় বিপজ্জনক বর্জ্য, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। রাসায়নিকভাবে সক্রিয়, দাহ্য, বিস্ফোরক, তেজস্ক্রিয় পদার্থ, ক্ষয়কারী পদার্থসহ বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ বিপজ্জনক বর্জ্যের অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ রাসায়নিক সার, কীটনাশক, বিভিন্ন ওষুধ, নষ্ট ব্যাটারি, তেজস্ক্রিয় পদার্থ—এসব কিছুই জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিপজ্জনক বর্জ্যের নানা রকম উৎস রয়েছে; যেমন—শিল্পে উৎপাদিত বিভিন্ন পেস্টিসাইড, কীটনাশক আগাছানাশক এবং রাসায়নিক বস্তু, ধাতব বস্তু (সিসা, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, পারদ ইত্যাদি) এসব থেকে বিপজ্জনক বর্জ্য তৈরি হয়। বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, গৃহস্থালি কাজ, হাসপাতালের পরিত্যক্ত, নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রপাতি, রক্ত ধৌত পানি—এসব পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। এ ছাড়া রয়েছে কাগজশিল্পের আবর্জনা, ওষুধশিল্পের বর্জ্য, ইঞ্জিন দহন বর্জ্য, খাদ্যশিল্পের বর্জ্য, বৈদ্যুতিক বর্জ্য, কৃষি বর্জ্য, বিস্ফোরক কারখানা থেকে উৎপাদিত বর্জ্য, সামরিক বর্জ্য, চিকিৎসার অবশিষ্টাংশ ইত্যাদি।

বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) মতে, প্রতি সেকেন্ডে ১৩ টন বিপজ্জনক বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতিবছর যার পরিমাণ ৪০০ মিলিয়ন টনেরও বেশি। এই পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন শিল্প-কারখানা থেকে বিপজ্জনক বর্জ্যের বেশির ভাগ আসছে। শিল্প-কারখানার প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে উৎপন্ন ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প বর্জ্য নানা ধরনের হয়ে থাকে; যেমন—বস্ত্র, চামড়া, সার, সিমেন্ট ইত্যাদি। ন্যাশনাল কনসাল্ট ইনভেন্টরির এক রিপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর টেক্সটাইলশিল্প থেকে এক লাখ ১৩ হাজার ৭২০ টন, হাসপাতাল থেকে ১২ হাজার ২৭১ টন, ট্যানারিশিল্প থেকে ২৬ হাজার ২৫০ টন, সার-কীটনাশক কারখানা  থেকে ৬৩৪ টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। আর এসব শিল্প-কারখানার বেশির ভাগই তাদের বর্জ্য নদ-নদীতে ফেলে। শিল্প বর্জ্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর চাপে তারা এসব বর্জ্য কিছুটা শোধন করলেও সংশ্লিষ্ট আইন-কানুন যথাযথভাবে মেনে চলে না। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে শুধু চার লাখ টন বৈদ্যুতিক বর্জ্যই জমা হয় এবং ২০৩৫ সাল নাগাদ ৪৬ টনে দাঁড়াবে, যা যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ।

বিপজ্জনক বর্জ্য থেকে নানা রকম রোগ সৃষ্টি হয়ে থাকে, একই সঙ্গে তা পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জমে থাকা বিপজ্জনক বর্জ্য দূষিত গ্যাস সৃষ্টি করে পরিবেশ দূষিত করে। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে এসব বস্তু জলাশয়ে পড়ে এবং পানি দূষণ করে, যা থেকে জলজ প্রাণী ও গৃহপালিত প্রাণীর বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ভারী মৌল, যেমন—আর্সেনিক পানিদূষণ ঘটায়, আর্সেনিকদূষিত পানি পান করলে আর্সেনিকোসিস রোগ সৃষ্টি হয়, সিসা মানবদেহে ডিসলেক্সিয়া, ক্যাডমিয়াম থেকে ইটাই ইটাই, পারদ থেকে মিনামিটা রোগ হয়। এ ছাড়া রয়েছে আচরণগত অস্বাভাবিকতা, ক্যান্সার, জিনগত ত্রুটি, শারীরিক ত্রুটি, জন্মত্রুটিসহ বিভিন্ন জটিল রোগ। কৃষিতে বহুল ব্যবহৃত কীটনাশক, রাসায়নিক সার বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে জলাশয়ে গিয়ে পড়ে পানিকে বিষাক্ত করে তোলে। কিছু বিপজ্জনক বর্জ্য যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। টিএনটি, বিভিন্ন জৈব পার-অক্সাইড উত্কৃষ্ট বিস্ফোরক, যাদের সঠিক উপায়ে সংরক্ষণ করা না হলে যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। ক্ষতিকারক বস্তুগুলো পরিবেশে দুভাবে বিষাক্ততা ছড়াতে সক্ষম—ক্রনিক  (Chronic), একিউট  (Acute)| যখন এসব বস্তু খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে বিষাক্ততা ছড়াতে সক্ষম, তখন একে একিউট প্রভাব বলে। অন্যদিকে কিছু পদার্থ দীর্ঘদিন পরিবেশে উন্মুক্ত থেকে ধীরে ধীরে পরিবেশে বিষাক্ততা তৈরি করে, একে ক্রনিক বিষাক্ততা বলে। তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো একিউট, ক্রনিক দুভাবেই ক্ষতিসাধন করতে পারে। কারণ এসব পদার্থ পরিবেশে বহুদিন থেকে যায় এবং ক্ষতিকারক (আলফা, বিটা, গামা) রশ্মি ছড়ায়। সর্বোপরি বিপজ্জনক বর্জ্যগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে মিশে জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। তবে উৎস থেকে বর্জ্য উৎপাদন হ্রাসকরণ  (Reducing) বা পুনরুৎপাদন  (Recycling) পদ্ধতিগুলো সবচেয়ে উপযোগী। রিসাইক্লিং পদ্ধতিতে পুরনো বর্জ্যগুলোকে পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন করে ব্যবহার্য বস্তুতে রূপান্তর করতে পারি। রিসাইক্লিং, রিডিউসিং পদ্ধতিগুলো শুধু পরিবেশদূষণ কমাতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে না, এর মাধ্যমে বর্জ্যের পরিমাণও কমে যায় অনেক গুণ। তবে এমন কিছু বর্জ্য থেকেই যায়, যাদের সংরক্ষণ কিংবা অপসারণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় পরিশোধন করা জরুরি। বর্জ্যবিশেষে রাসায়নিক, জৈবিক, ভৌতিক, তাপীয় নানাভাবেই পরিশোধন করা যায়। রাসায়নিক পদ্ধতিগুলোর মধ্যে আয়ন বিনিময়  (Ion change), অধঃক্ষেপণ (Precipitation), জারণ, বিজারণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তাপীয় পদ্ধতিতে ইনসিনেরেশন বা ভস্মীকরণ প্রক্রিয়ায় উচ্চ তাপমাত্রায় বর্জ্যগুলোকে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এই পদ্ধতিতে জৈব বর্জ্যকে পুরোপুরি বিষমুক্ত ও বিনষ্ট করে দেওয়া যায়। পৃথিবীর বহু দেশেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইনসিনেরেশন পদ্ধতিটি বেশ পরিচিত।

একটি প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুধু তেজস্ক্রিয়তা প্রশমনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই লাঘব হতে পারে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নিষ্কাশনের সাধারণ পদ্ধতি হলো তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা নিরাপদ পর্যায়ে নেমে না আসা পর্যন্ত এসব বর্জ্য নিরাপদ স্থানে মজুদ রাখা। বাংলাদেশে তেজস্ক্রিয় পদার্থের ব্যবহার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সার্বিকভাবে বাংলাদেশে বিপজ্জনক বর্জ্য পরিশোধনে কার্যকর হয়নি তেমন কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা। ফলে এ ধরনের বর্জ্যের উৎস, ক্ষতিকারক দিকগুলো সম্পর্কে সাধারণ জনগণের তেমন কোনো ধারণাই তৈরি হয়নি। বেশির ভাগ মানুষ এখানে-সেখানে ময়লা ফেলতে বেশি অভ্যস্ত, যার ফলে তৈরি হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। বিপজ্জনক বস্তুগুলো এই আবর্জনার স্তূপের মধ্যেই মিশে যাচ্ছে এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করছে। সর্বোপরি পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুনজর আশা করি, যেন সুপরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এসব বর্জ্য অপসারণ করে দূষণমুক্ত একটি পরিবেশ গড়ে তোলার দিকে অগ্রসর হতে পারি।

 

  লেখক : শিক্ষার্থী, পরিবেশবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা