kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

মঙ্গার স্থায়ী নির্বাসন

ড. এম জি নিয়োগী

২৩ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মঙ্গার স্থায়ী নির্বাসন

১৯৯৩ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহের কথা। ২ অক্টোবর কুড়িগ্রামে একটি উন্নয়ন সংস্থায় কৃষি বিশেষজ্ঞ হিসেবে যোগদান করেই জানতে পারলাম, সে এলাকায় আশ্বিন-কার্তিক মাসে (সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত) মঙ্গার ভয়াবহতার কথা। গরিব মানুষের অনাহারে-অর্ধাহারে থাকার কথা। জানতে পেলাম, আশ্বিন-কার্তিক মাসে রংপুর অঞ্চলে হাজার হাজার কৃষি শ্রমিক পরিবার কৃষিকাজ না পেয়ে উপোস থাকে। মানবেতর জীবন যাপন করে।

১৯৯৮ সালের গবেষণায় জানলাম—রংপুর অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশই কৃষি শ্রমিক। এঁদের নিজেদের জায়গাজমি নেই। অন্যের জমিতে কাজ করে যে পারিশ্রমিক পান, তা দিয়েই পরিবারের ক্ষুধা নিবৃত্ত করেন। এই ৬৭ শতাংশ কৃষি শ্রমিকরা নভেম্বর-ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে বোরো ধান, আলু, ভুট্টা, সরিষা, গম, শীতকালীন সবজি, তামাকসহ বিভিন্ন ফসলের জমিতে কাজ পান। ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল, মে মাসগুলোতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফসল কাটা, মাড়াইসহ বিভিন্ন কাজে এই কৃষি শ্রমিকরা নিয়োজিত থাকেন।

এরপর জুন-জুলাই-আগস্ট মাস আমন মৌসুম। এই অঞ্চলে আমন মৌসুমে কৃষক দীর্ঘমেয়াদি আমন ধান চাষাবাদ করেন। এগুলো পাকতে ১৫০ থেকে ১৭০ দিন সময় লাগে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো—কৃষক বছরের অন্যান্য মৌসুমে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষাবাদ করে থাকেন। এসব ফসলের বীজ বপন, রোপণ, পরিচর্যা, ফসল সংগ্রহ, মাড়াই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে হয় বিধায় কৃষি শ্রমিকরা সব সময় কমবেশি কাজ পান।

কিন্তু জুন, জুলাই, আগস্ট মাসে আমন মৌসুমে শতভাগ কৃষকই আমন ধান চাষাবাদ করেন। তখন জমিতে আমন ধান ছাড়া আর কোনো ফসল থাকে না। আমন ধানের চাষাবাদে বীজতলা তৈরি হয় জুন-জুলাই মাসে। জমি তৈরি হয় জুলাই মাসে। চারা লাগানো হয় জুলাই-আগস্ট মাসে। পরিচর্যা, সার, নিড়ানি, কীটনাশক ইত্যাদি কাজ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে শেষ হয়ে যায়।

এরপর ধানের জমিতে ধান পাকার আগে আর কোনো কাজ থাকে না। সাধারণত আমন ধান পাকে নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বর মাসে। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত অর্থাৎ পাকা ধান কাটার আগে ধানের জমিতে কৃষি শ্রমিকের আর কোনো কাজ থাকে না।

যেহেতু ধান ছাড়া এই সময়ে আর কোনো ফসল থাকে না এবং যেহেতু ধানের জমিতে এই সময়ে কোনো কাজ থাকে না, সে কারণে কৃষি শ্রমিকদের এই সময়ে কৃষিকাজ করার কোনো সুযোগ থাকে না। আর কাজ না থাকার কারণে কৃষি শ্রমিকরা এই সময়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে উপোস থাকেন। মানবেতর জীবন যাপন করেন। স্থানীয় ভাষায় এটিই মঙ্গা। অর্ধাহারে-অনাহারে থাকার ভয়াবহ জীবনসংগ্রাম।

প্রায় এক মাস এ ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে প্রতীয়মান হলো—একজন কৃষকও এই এলাকায় অগ্রহায়ণ মাসের আগে পাকা ধান কাটতে পারেন না বা কাটার উপযোগী হয় না।

আমি গবেষণার বিষয়বস্তু ঠিক করে ফেললাম। গবেষণার বিষয়বস্তু হলো—অগ্রহায়ণের পাশাপাশি আশ্বিন-কার্তিক মাসেও কৃষক যেন ভালো ফলনসহ পাকা আমন ধান কাটতে পারেন। সেই সঙ্গে আয়-ব্যয়ের বিষয়টিও গবেষণার বিষয়বস্তু হলো। এ লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদি জাতের আমন মৌসুমের ধানের জাত খুঁজতে বের হয়ে গেলাম। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত ব্রি ধান৩৩ জাতটি সেই সময়ে সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের জাত ছিল। আমি সেটির বীজ সংগ্রহ করলাম।

সেই লক্ষ্য সামনে রেখে স্থানীয় স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত পারিজা, সাইটা, কটকতারাসহ আরো কিছু ধানের জাত সংগ্রহ করে আমরা গবেষণার কাজ শুরু করলাম। দেখলাম, স্থানীয় ধানের কয়েকটি জাত কম সময়ে পেকে গেল। কিন্তু ফলন কম। বুঝতে পারলাম, এত কম ফলনে কৃষকের মন ভরবে না। তবে ব্রি ধান৩৩ এবং স্থানীয় স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত পারিজাকে নিয়ে আবার গবেষণা শুরু করলাম। এবার সঙ্গে যুক্ত হলো আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) উদ্ভাবিত ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি বপন পদ্ধতিতে গবেষণা। পাশাপাশি রোপণ পদ্ধতি তো ছিলই।

২০০৩ সালে এসে দেখতে পেলাম ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি বপন পদ্ধতিতে ব্রি ধান৩৩ জাতের ধান চাষাবাদ করলে ১১৮ থেকে ১২০ দিনের পরিবর্তে মাত্র ১০০ থেকে ১০৫ দিনেই ধান কাটা যায়। ফলনও ভালো। কিন্তু বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে ধান চাষাবাদে সরাসরি বপন প্রযুক্তিটি কৃষক গ্রহণ করেননি।

২০০৪ সালের ৪ অক্টোবর রংপুর অঞ্চলে গবেষণা মাঠে ইরি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, সাংবাদিক এবং স্থানীয় কৃষকদের মঙ্গা নিরসনে ব্রি ধান৩৩ জাতের উপযোগিতা দেখানো হলো। রংপুর অঞ্চলের কৃষক সেদিন ৪ অক্টোবর অর্থাৎ ১৯ আশ্বিন প্রথম আমন ধান কাটা প্রত্যক্ষ করলেন। হেক্টরপ্রতি ফলন পেলেন ৪.২ টন, যা অন্যান্য প্রচলিত ধানের তুলনায় কোনো অংশেই কম নয়।

তবে স্বল্পমেয়াদি ধানের ফলন অপেক্ষাকৃত কম। সুতরাং এই প্রযুক্তিতে জাতীয়ভাবে ধানের উৎপাদন কমে যাবে। এটা ঠিক যে স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত তুলনামূলকভাবে ফলন একটু কম দেয়। তবে দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে, স্বল্পমেয়াদি ধানের বেলায় ৩০-৪০ দিনের চারার পরিবর্তে ২০-২৫ দিনের চারা রোপণ করা হয় এবং জমির উর্বরতা অনুযায়ী ৮-১০ ইঞ্চির পরিবর্তে ছয়-সাত ইঞ্চি দূরত্বে চারা রোপণ করা হয় এবং সর্বশেষ উপরি সার প্রয়োগ চারা রোপণের ৪০-৫০ দিনের পরিবর্তে ২৫-৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োগ করা, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি ধানের প্রায় সমপরিমাণ ফলন পাওয়া সম্ভব।

আমন ধানের পরে পরবর্তী ফসল অর্থাৎ আলু, শীতকালীন সবজি, ভুট্টা, সরিষা, গম ইত্যাদি ফসল চাষাবাদ করার সঠিক সময় নভেম্বর মাস। কিন্তু প্রচলিত আমন ধান নভেম্বর মাসে জমিতে থাকে বিধায় কৃষক সঠিক সময়ে অর্থাৎ নভেম্বর মাসে এই ফসলগুলোর চাষাবাদ করতে পারে না। এতে ওই সব ফসলের ফলন কম হয়। বিভিন্ন ধরনের পোকা-মাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যায়। উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

এই কৃষক যদি আমন মৌসুমে স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত বেছে নেন, তাহলে কৃষক একদিকে যেমন মঙ্গার সময়ে ধান পাবেন, অন্যদিকে পরবর্তী ফসল সঠিক সময়ে চাষাবাদ করতে পারবেন। এতে পরবর্তী ফসলের ফলন বেশি হবে। উৎপাদন খরচ কম হবে। কৃষক বাজারমূল্য বেশি পাবেন।

আমন ধানের ফলন এবং পরবর্তী রবি ফসলের ফলন এই দুই ফসলের মোট ফলনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কৃষক যদি স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের চাষাবাদ করে সঠিক সময়ে রবি ফসল চাষাবাদ করতে পারেন, তাহলে শুধু সঠিক সময়ে রবি ফসল চাষাবাদের কারণেই দুই ফসলের মোট ফলন ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেড়ে যায়। সুতরাং স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের চাষাবাদে জাতীয় উৎপাদন কমে যাবে—এ কথাটি ঠিক নয় বরং কৃষকের মোট উৎপাদন বেড়ে যাবে। উত্তরাঞ্চলের মোট খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

সেদিনের সেই উদ্ভাবিত পরীক্ষিত স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের প্রযুক্তি ২০০৫ সাল থেকেই কৃষকের মাঠে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কৃষক আজ নিজ উদ্যোগে স্বল্পমেয়াদি আমন ধান চাষ করছেন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভালো উৎপাদনক্ষম স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের জাত উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ব্রি ধান৭৫ নামে স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) বিনাধান-১৭ নামে স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এগুলো ভালো ফলন দিতে সক্ষম। অচিরেই এসব জাত উত্তরাঞ্চলের কৃষক এবং বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চলের কৃষক গ্রহণ করবেন।

যেখানে ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তথ্য-উপাত্তে একজন কৃষকের মাঠেও আশ্বিন-কার্তিক মাসে পাকা ধান দেখা যায়নি, আজ ২০২১ সালে উত্তরাঞ্চলে এখন প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ জমিতে কৃষক আশ্বিন-কার্তিক মাসে আমন ধান কাটছেন এবং সঠিক সময়ে অর্থাৎ নভেম্বর মাসে পরবর্তী ফসল চাষাবাদ করতে পারছেন। মঙ্গা আজ স্থায়ীভাবে দূর হয়েছে। রংপুর অঞ্চলের কৃষি শ্রমিকরা আশ্বিন-কার্তিক মাসে ধান কাটছেন, ফসল মাড়াই করছেন, পেট ভরে ভাত খাচ্ছেন।

 

 লেখক : স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী,

ডেপুটি প্রজেক্ট লিডার, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া



সাতদিনের সেরা