kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

সেলাই করা খোলা মুখ

মানুষের আদি ও অকৃত্রিম পরিচয় সে মানুষ

মোফাজ্জল করিম

২৩ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



মানুষের আদি ও অকৃত্রিম পরিচয় সে মানুষ

শুরুতেই একটি চিত্রকল্প। স্থান : কুমিল্লা-ত্রিপুরা সীমান্তে শালদা নদীর তীরবর্তী রণাঙ্গন। সময় : ১৯৭১-এর সেপ্টেম্বরের কোনো একদিন। বেলা দ্বিপ্রহর। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের পূর্ব পার্শ্বে মুক্তিবাহিনী ও পশ্চিম পার্শ্বে খানসেনারা। তুমুল লড়াই চলছে উভয় পক্ষে। একেবারে মুখোমুখি যুদ্ধ। দুই মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু রশীদ আর বিমল অস্ত্রহাতে নিজ নিজ পজিশন থেকে অবিরাম গুলি ছুড়ছে শত্রুদের লক্ষ্য করে। এরা দুজন ছিল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের বি.এ. ক্লাসের ছাত্র। দুজনের বাড়িও একই গ্রামে, শহর থেকে মাইল তিনেক দূরে। ছোটবেলা থেকে দুজন শুধু সহপাঠী নয়, একেবারে জানী দোস্ত। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কাউকে না জানিয়ে দুজনে সল্লা করে একদিন রাতের অন্ধকারে কুমিল্লা শহরের কাছেই বিবির বাজার বর্ডার দিয়ে সোজা মেলাঘর। সেখানে অন্যদের সঙ্গে তাদেরও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিয়ে নিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার। তারপর মাসখানেক ট্রেনিংয়ের পর শুরু হলো ছোটখাটো অপারেশনে অংশগ্রহণ। বড় লড়াইয়ে আসা হয়েছে এবারই। দুই বন্ধু কাছাকাছি পজিশন থেকে যুদ্ধ করছে। একজনের কাছ থেকে আরেকজনের অবস্থান মাত্র হাত দশেক দূরে। ফলে দুজনেই মাঝে মাঝে ফিসফিস করে কথা বলছে। ‘জানিস বিমল, এই বড় বড় গোলা আসছে কোত্থেকে?’ রশীদ জানতে চাইল। বিমল বলল, ‘ঠিক বলতে পারব না।’ ‘সি অ্যান্ড বি রোডের ওপর যে কালামুড়ার ব্রিজ আছে না, সুবেদার সাহেব বলেছেন সেখানে ব্যাটারা নাকি বিরাট একটা বাঙ্কার বানিয়েছে। ওখান থেকেই সেই সকাল থেকে থেমে থেমে শেলিং করছে জানোয়ারগুলা।’ রশীদের কথা শেষ হওয়ার আগেই বিকট শব্দ করে একটা গোলা পড়ল তার পজিশনের কাছে। অমনি ‘মাগো’ বলে আর্তনাদ করে উঠল রশীদ। একটা স্প্লিন্টার বুকের বাঁ পাশটায় আঘাত করেছে। সঙ্গে সঙ্গে গলগল করে বুকের লাল তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। প্রাণপ্রিয় বন্ধুর এই অবস্থা দেখে বিমল রাইফেল হাতে দ্রুত হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছে গেল রশীদের কাছে। রশীদ তখন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে কুঁকড়ে বলছে, ‘তুই কোনো গাছের আড়ালে চলে যা, বিমল। তোকে বাঁচতে হবে। স্বাধীন করতে হবে দেশকে।’ ঠিক তখনই আরেকটি শেল এসে পড়ল ওদের কাছে। সঙ্গে সঙ্গে ‘মাগো’ বলে লুটিয়ে পড়ল বিমল। তারও বুকে স্প্লিন্টার ঢুকে পড়েছে। বইতে শুরু করেছে তাজা রক্তস্রোত। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে দুই বন্ধু জোরে একবার ‘জয় বাংলা’ বলে চিৎকার দিয়ে উঠল। দুজনের প্রবহমান রক্তধারা মিশে গিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে যেন ছুটে চলল স্বপ্নের জয় বাংলার দিকে। একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে ওখানেই শহীদ হলো তারা। তাদের দুজনের মিলিত রক্তস্রোত মাস তিনেক পরেই জন্ম দিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। সেদিন এই দুই শহীদের মা-বাবারা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করে কেঁদেছিলেন পুত্রশোকে। আর দেশের হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খৃস্টান আপামর জনসাধারণ তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্মাণ করেছিল শহীদ মিনার। শহীদদের উদ্দেশে তাদের কণ্ঠে ছিল কালজয়ী মন্দ্রগীত : এক সাগর রক্তের বিনিময়ে/বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা/আমরা তোমাদের ভুলব না।

২.

হ্যাঁ, স্বাধীনতার অর্দ্ধ শতাব্দী পর আজও আমাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’। কিন্তু সত্যি কি তাই? রশীদ-বিমলদের কথা সত্যি কি আমাদের মনে আছে? কোনো দিন সত্যি কি তাদের জন্য আমাদের মন কেমন করে? অশ্রু জমা হয় চোখের কোণে? যদি হতো তবে তো আমরা একটিবার হলেও নিমীলিত নেত্রে বসে বসে ভাবতাম, ‘আচ্ছা ওরা কী উদ্দেশ্যে, কীসের জন্য একাত্তরে নিজেদের অমূল্য জীবন বিসর্জন দিয়েছিল। সাড়ে সাত কোটি মানুষের একটি লাঞ্ছিত, নির্যাতিত, অসহায় জাতি হঠাৎ কেন রাতারাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে অস্ত্র ধারণ করল এক দানবীয় পরাশক্তির বিরুদ্ধে। এমন ঐক্য যা কেউ কোনো দিন দেখেনি। সেদিন তাদের কণ্ঠে ছিল সেই অমর সঙ্গীত: ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম’? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?/কাণ্ডারি! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার!...জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দানবের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করাই ছিল সেদিনের বাংলাদেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের স্বপ্ন। আর সেই সঙ্গে দানবনিধন করে দেশকে শত্রুমুক্ত করাই ছিল তাদের লক্ষ্য।

আর আজ? আজ শত্রুমুক্ত দেশে ভাইয়ের গলায় ভাই ছুরি বসাতে পাগলের মত আচরণ করছে। আমি মনে করি, এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে কতগুলো চিরায়ত মূল্যবোধের দ্রুত অবক্ষয়। এ দেশের মানুষ চিরকাল ধর্মীয় ভেদাভেদকে ঘৃণা করত। ব্যক্তিগত কারণে হানাহানি, শত্রুতা সর্বকালে সকল সমাজে আগেও ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু একই দেশের মানুষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, চালচলন, রীতিনীতির বিভিন্নতার কারণে একজন আরেকজনকে শত্রু জ্ঞান করবে এমনটি এই ভূখণ্ডে কদাচিৎ দেখা গেছে বা শোনা গেছে। এদেশের প্রধান দুই ধর্মের মানুষ—হিন্দু ও মুসলমান পরস্পরের সঙ্গে বৈরীভাব নয়, বরং মিত্র ভাবাপন্ন হয়ে সমাজে বসবাস করত। একের পয়-পরবের প্রতি অপরজন শ্রদ্ধাশীল ছিল। শৈশবে পাঠশালায় তাদের মুখস্থ করতে হতো : মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান/মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তাহার প্রাণ। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল ধর্মীয় শিক্ষা, যার প্রতি দায়িত্বশীল অভিভাবকরা বিশেষ যত্নবান ছিলেন।

ধর্মের কথা যখন উঠলই তখন একথা জোর দিয়ে বলতেই হয়—সব ধর্ম নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকে। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো ধর্মই অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে অসূয়া-দ্বেষ ছড়ানোর শিক্ষা দেয় না। একজন প্রকৃত ধার্মিক ব্যক্তির মুখে অন্য ধর্ম সম্বন্ধে কখনো কটুকাটব্য শোনা যায় না। আর ইসলাম ধর্মে তো পবিত্র কুরআন-হাদিসে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ইসলাম ধর্ম প্রচারের উষালগ্ন থেকে মহানবী (সা.) আল্লাহপাকের নির্দেশে শান্তির পথ, আদর্শের পথ অনুসরণ করেছেন, পরিহার করেছেন ফিতনা-ফ্যাসাদ, জোর-জুলুম-জবরদস্তির পথ। ইসলাম যে শান্তির ধর্ম, হযরত মুহাম্মদ (সা.) যে আইয়্যামে জাহেলিয়াতের আরবভূমিতে গোত্রে গোত্রে নিত্যদিনের ঝগড়া-বিবাদ, মারদাঙ্গা, রক্তপাতের জীবনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সত্য, ন্যায়নীতি ও সকল মানুষকে ভালবাসার মধ্য দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে চান এবং তা যে সমাজের সব মানুষের জন্য মঙ্গলময়—একথা মক্কাবাসী দ্রুতই অনুধাবন করতে পারল। ফল দাঁড়াল, মক্কার কাফিররা দলে দলে ইসলামের আদর্শে আকৃষ্ট হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রচারিত একেশ্বরবাদকে গ্রহণ করতে লাগল। আর পবিত্র কুরআনের অমোঘ বাণী ‘লা ইকরাহা ফিদ্দীন’ (ধর্মে জোর-জুলুম নেই) এবং ‘লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়া দীন’ (তোমাদের ধর্ম তোমাদের কাছে, আমার ধর্ম আমার কাছে) এই মূলনীতি অনুসরণ করে মহানবী (সা.) আল্লাহপাকের নির্দেশমত সম্পূর্ণ অহিংস পথে ইসলাম প্রচার করে গেলেন। আজ দেড় হাজার বছর পর আমরা কি রাসুলে করীম (সা.)-এর প্রদর্শিত আদর্শের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে শান্তির ধর্ম ইসলামকে বিশ্ববাসীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ (নাউজুবিল্লাহ) করব? আমাদের বাড়াবাড়ি আচরণে কি ইসলামের খেদমত না হয়ে উল্টোটা হচ্ছে না? কবুল করছি, এসব ব্যাপারে কথা বলার জন্য আমি সামান্যতম জ্ঞানেরও অধিকারী নই। আমি বরং আমাদের প্রাজ্ঞ আলিম সমাজের নিকট বিনীত আরজ জানাব, তাঁরা যেন স্ব স্ব এলাকায় এসব ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য রাখেন। কোনটা কাচ আর কোনটা কাঞ্চন সেটা বোঝানোর যোগ্যতা অবশ্যই তাঁদের আছে। বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে আমাদের পরম সম্মানিত আলিম সমাজ তাঁদের সামাজিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবেন—এ বিশ্বাস আমার আছে। তবে কোনো অবস্থায়ই দয়া করে মানুষকে উত্তেজিত করবেন না আপনাদের বক্তৃতা-বয়ানের মাধ্যমে। বরং মেহেরবানি করে চেষ্টা করবেন উত্তেজনা প্রশমনের।

তবে হ্যাঁ, অভিজ্ঞতার আলোকে অতীত ঘেঁটে দু-একটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতাপূর্বকালে ষাটের দশকে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশে প্রায়শই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হতো। দাঙ্গা না বলে বোধ হয় মুসলমান নির্যাতন বা হত্যা বলা উচিত। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে তৎকালীন বাংলাদেশে পরিবেশ বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠত। তবে ১৯৬৪ সাল ছাড়া আর কখনো এদেশে সংখ্যালঘু নিধন বা নির্যাতন হয়েছে বলে শোনা যায়নি। ১৯৬৪ সালে ভারতের আহমদাবাদে (নরেন্দ্র মোদি সাহেবের এলাকা) বেশ বড় রকমের দাঙ্গা হয়। এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সেবার ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে বেশ কিছু সনাতনধর্মী মানুষ প্রাণ হারান। মুসলমান কেউ মারা গিয়েছিলেন কিনা মনে পড়ছে না। তো সেবার বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বেশ কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সংখ্যালঘুদের জানমাল রক্ষা করতে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে। নারায়ণগঞ্জে জনাব আমীর হোসেন নামক একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি সংখ্যালঘুদের বাঁচাতে গিয়ে যতদূর মনে পড়ে নিজের জীবন বিসর্জন দেন। ওই সময় তাঁর এই আত্মদান দেশে-বিদেশে খুব সাড়া জাগিয়েছিল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশে, কখনো কখনো বিচ্ছিন্নভাবে হিন্দু-নিধনের ঘটনা ঘটলেও জনাব আমীর হোসেনের মত কেউ দাঙ্গা দমনে বড় রকমের ভূমিকা রেখেছেন বলে শোনা যায়নি। দেশভাগের (১৯৪৭) আগে ১৯৪৬ সালে কলকাতায় যে ভয়াবহ দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল তাতে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের বহু নারী-পুরুষ নিহত হয়েছিলেন। এর পাল্টা জবাব ছোট আকারে হলেও দেওয়া হয় পূর্ববঙ্গের নোয়াখালীতে। তখন দাঙ্গা-উপদ্রুত নোয়াখালী সফর করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। এসব কাসুন্দি ঘাঁটার কারণ হলো কুমিল্লা-চাঁদপুর-বেগমগঞ্জ-পীরগঞ্জ ইত্যাদি স্থানে সম্প্রতি যেসব দুঃখজনক হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও আনুষঙ্গিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে গেল তাতে আমরা কোনো আমীর হোসেনকে তো দেখিনি, পরন্তু কোনো কোনো মহল বিশেষকে পুরো বিষয়টা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা চালাতে দেখা গেছে। কোথায় উত্তেজনা প্রশমনের জন্য বক্তৃতা-বিবৃতি-ভাষণ দেবেন, বের করবেন সর্বদলীয় শান্তি মিছিল—তা না, কর্তাব্যক্তিরা ব্যাট হাতে (থুড়ি, মাইক হাতে) নেমে পড়লেন তাঁদের প্রিয় ‘ব্লেইম গেম’ খেলতে। ওমানে মাহমুদুল্লাহ গংরা নব্য পাত-পাওয়া স্কটল্যান্ডের কাছে মান-সম্মান খোয়ালেও আমাদের তাবড় তাবড় ‘ব্লেইম গেম’ খেলুড়েরা, মাশাল্লাহ, চৌকা-ছক্কার ফুলঝুরি ছুটিয়ে চলেছেন। তাঁরা যদি মাইকে টিভিতে একে অন্যকে দোষারোপের বাউন্সার না দিয়ে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে মুনাযাতও করতেন, তা হলেও হয়ত পবিত্র কুরআন শরীফ অবমাননাকারী ধরা পড়ত। সেই ব্যাটা তো আড়াল থেকে তামাশা দেখছে, আর মুচকি হাসছে এই ভেবে যে অপরাধ করার আগে সে যা ভেবেছিল স্যারেরা ঠিক তাই করছেন। কিন্তু আমাদের মাননীয়দের কে বোঝাবে যে দেশের আপামর জনসাধারণ (যাদের সাত রাজার ধন ভোটটির দিকে আপনাদের চোখ) আপনাদের এসব কথা এখন আর ‘খায়’ না। তারা চলে তাদের নিজেদের হিসাবমত, যে হিসাব তাদের কখনো ভুল হয় না।

৩.

আচ্ছা, যদি বলি এই একবিংশ শতাব্দীতে সাম্প্রদায়িক ইস্যু নিয়ে মাঠ কাঁপানো, ফেসবুকে গলাবাজি, পাবলিক খেপানোর ‘টিরিকবাজি’ ইত্যাদি ইংরেজিতে যাকে বলে ‘অবসলিট’ (অর্থাৎ বহু ব্যবহারে ভোঁতা বা সেকেলে, অনেকটা আমাদের এককালের সর্বরোগের মহৌষধ হরতালের মত) হয়ে গেছে, তা হলে কি খুব ভুল হবে? এখনকার তরুণ-তরুণীরা মহাব্যস্ত ‘লেটেস্ট মডেলের’ নিত্যনতুন ইস্যু নিয়ে, তাদের মাথায় এখন সারাক্ষণ চরকির মত ঘুরপাক খাচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকা-জাপান-চীন ইত্যাদির সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বিশ্বের কোন শহরে কবে ‘লকডাউন’ উঠে যাচ্ছে এইসব। তাদের সময় কোথায় বিভিন্ন ধর্মের তুলনামূলক আলোচনা ও আপেক্ষিক ভালো-মন্দ বিচারের। আমাদের এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের মহাসড়কে উল্কাবেগে ছুটে চলার সময়, আমাদের কি সাজে পালকি চড়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার উনবিংশ শতাব্দীর বাবুয়ানা।

তবে সব কথার শেষ কথা হচ্ছে, প্রতি বছর পূজা আসবে, শিয়া মুসলিমদের মুহররম আসবে, বৌদ্ধদের বৌদ্ধ পূর্ণিমা আসবে, আর হঠাৎই একেকটা কুমিল্লা, নাসিরনগর, রামু সংবাদ শিরোনাম হবে—এই তামাশা (হ্যাঁ তামাশাই তো। এক থাপ্পড়ে যে মশা মারা যায় এক শ কামান ফিট করেও তার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটাতে না পারা তামাশা না তো কী!) আর কত দিন দেখতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে আমাদের নোবেল প্রাইজ পাওয়ার কথা। এটা দেখে কোনো ফেল্টুসের মাথা ঘুরছে কিনা খোঁজ নিয়ে দেখুন। কে জানে তিনি হয়ত নিরলে বসে বাংলাদেশ নামক চুনালোকে উদ্ভাসিত দেশটির বিরুদ্ধে প্যাঁচ কষছেন।

আর দোহাই মাননীয় কর্তৃপক্ষ, নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করুন তদন্তকার্যে, প্রকৃত অপরাধীকে ধরে ‘ফুল ডোজ’ শাস্তি দিন, দেশের লোকের আস্থা ফিরে আসুক প্রশাসনের ওপর।

সেই সঙ্গে আমার মত যারা পাবলিক তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ধর্মকর্ম করবেন, অবশ্যই করবেন, নিজের ঐহিক ও পারলৌকিক মঙ্গলের জন্য। নিজ নিজ ধর্মকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসুন কিন্তু ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করবেন না। অন্তত দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ধর্মে বাড়াবাড়ি করতে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আছে।

শেষ করব আমার নিজের প্রিয় একটি পঙিক্ত উদ্ধার করে : ‘মানুষের আদি ও অকৃত্রিম পরিচয় সে মানুষ।’

 

 লেখক : সাবেক সচিব, কবি

 [email protected]



সাতদিনের সেরা