kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

দিল্লির চিঠি

অপপ্রচার বন্ধে ভারতকে সক্রিয় হতে হবে

জয়ন্ত ঘোষাল

১৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



অপপ্রচার বন্ধে ভারতকে সক্রিয় হতে হবে

দিল্লিতে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রদর্শনী হয়ে গেল। আর সেই প্রদর্শনী দেখতে এলেন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা, ইন্দিরা গান্ধীর নাতি রাহুল গান্ধী এবং তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা ভদ্র। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা এই সময় ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যখন ভারত-বাংলাদেশে একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর উদযাপন করা হচ্ছে, সেই সময় এই প্রদর্শনী শুধু কংগ্রেস অফিসে নয়, এর আগে বিজ্ঞান ভবনেও প্রদর্শিত হয়েছে। বাংলাদেশের হাইকমিশনার বিজ্ঞান ভবনের সেই উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এরই মধ্যে দিল্লির প্রেস ক্লাবেও এই প্রদর্শনী দেখা গেছে। ভারত-বাংলাদেশের ৫০ বছরের সম্পর্ক আজ যেভাবে আড়াআড়ি পথে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে এই প্রদর্শনী কতটা যথেষ্ট—সেই প্রশ্নটাই মনের মধ্যে বারবার উঠছে।

রাহুল গান্ধী একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রদর্শনী দেখেছেন। তিনি ভারতের এই নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি। কিন্তু এর সঙ্গে এই প্রশ্নটাই ওঠে যে একাত্তর সালের যুদ্ধের পর কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনে সেই সময়কার ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে চলতি যেসব বিতর্ক ও মতপার্থক্য ছিল, আজও সেগুলোর নিরসন হয়নি। এ ছাড়া কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনের পর কোয়ালিশন সরকার এসেছে, গুজরাল ডকট্রিনও আমরা দেখেছি। ইন্দর কুমার গুজরালও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খুব বেশিদিন থাকতে পারেননি। তখন কংগ্রেসই সমর্থন প্রত্যাহার করেছিল এবং ফলে সেই সরকারের পতন হয়।

পরবর্তীকালে বাজপেয়ী সরকার এসেছে। এখন নরেন্দ্র মোদি সরকার এই সমস্যা নিরসনে সচেষ্ট বা সক্রিয়। এ ব্যাপারে তিনি একটা শক্তিশালী বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু মোদিরও সাত বছরের শাসন অতিবাহিত। অথচ ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের যে জট, সেটা আজও সম্পূর্ণভাবে ছাড়ানো সম্ভব হয়নি।

আসলে বাংলাদেশ-ভারত দুটি ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী রাষ্ট্র। অনেক দূরে থাকা রাষ্ট্রের চেয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গেই অনেক বেশি সংঘাত হয়। কিন্তু সেই তুলনায় অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রের চেয়ে ভারত ও বাংলাদেশের অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। এযাবৎ বাংলাদেশ যেভাবে ভারতের সার্বভৌম স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছে, জঙ্গি তৎপরতা দমনে সাহায্য করেছে, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ যেভাবে ভারতের দাবিদাওয়া মেনে নিয়েছে, এমনকি পশ্চিমবঙ্গের ভোটের সময় প্রধানমন্ত্রীর মতুয়া ধর্মের প্রতিষ্ঠাতার জন্মস্থানে যাওয়ার সব কর্মসূচি রূপায়ণে বাংলাদেশ সহযোগিতা করেছে। চীনের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের নিরপেক্ষ সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি রক্ষা করার যে চেষ্টা—এ সব কাজের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে সাধুবাদ জানানো হয়।

ভারতের কাছে বাংলাদেশের দাবিগুলো কী কী, সেগুলোর মধ্যে কী কী মীমাংসা হওয়া উচিত এবং কেন মীমাংসা হয়নি, সেগুলোও বোধ হয় এই ৫০ বছরের উদযাপনে আজ বেশি করে আলোচনা করা উচিত। শুধু একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রদর্শনী দেখলে তো হবে না, নরেন্দ্র মোদি এবং রাহুল গান্ধীকে এই প্রশ্নেরও জবাব দিতে হবে যে কেন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের জট আজও ছাড়ানো সম্ভব হয়নি?

কোনো কোনো বিষয় বাংলাদেশ চাইলেও ভারত তা করতে পারেনি বা ভারতের এখন সেগুলো করা উচিত—এই বিষয়গুলো নিয়ে আমি আমার কলেজজীবনে অনেক চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা করেছিলাম। দেখুন, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে সাংবাদিক হিসেবে আমি নিজেও খুব আগ্রহী এবং বাংলাদেশের সংবাদপত্র, সংবাদমাধ্যমগুলো অনুসরণ করারও যথেষ্ট চেষ্টা করি। আমি তো ভারত সরকারেরও প্রতিনিধি নই এবং আমি কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো এনজিও বা কোনো ক্লাব বা কোনো সংগঠনেরও প্রতিনিধি নই। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার যেটা মনে হয়, সেটা আজ আমি আপনাদের জানানোর একটা সৎ চেষ্টা করতে চাইছি।

প্রাথমিকভাবে আমি যেটা করলাম সেটা হচ্ছে, র‌্যান্ডম পদ্ধতিতে আমি অন্তত ১০ জন মানুষের কাছে একটা প্রশ্ন পাঠালাম। যেমন—আপনি তো ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহী এবং আপনি এই দুই দেশের অনেক খবর রাখেন। আপনার কী মনে হয়, কোথায় এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা এবং কোনটা করা উচিত?

কমপক্ষে ১০ জনের মতামতের ভিত্তিতে আমি একটা সাধারণীকরণ করে আপনাদের জানাচ্ছি। মূলত একটা কথা মোটামুটি সবাই যেটা বলছেন সেটা হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা ধারণা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে গভীরভাবে তৈরি হয়েছে যে হাসিনা সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করছে ভারত সরকার। বাংলাদেশের ভোট, সরকারকে রাখা বা না রাখা—এর সবটাই ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কাজেই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধেও যদি অ্যান্টি ইনকমবেন্সি বাংলাদেশের রাজনীতির ভেতরে তৈরি হয়, তাহলে সে জন্য অসন্তোষটা ভারতের বিরুদ্ধেও পরিচালিত হচ্ছে এবং মনে করা হচ্ছে যে ভারত বাংলাদেশকে সব দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে, যাতে বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। এই ধারণাটা হওয়া কিন্তু একেবারেই কাঙ্ক্ষিত নয় এবং এটা থেকে ভারত সরকারকে বেরোতে হবে।

দ্বিতীয় যে বিষয়টা বেশির ভাগ মানুষ বলেছে, এত দিন হয়ে গেল এখনো কেন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সমস্যার সমাধান হলো না? আমরা অনুপ্রবেশের কথা বলব, আর বাংলাদেশ বলবে, সীমানায় যে এত হিংসা এবং নরবলি হয়ে চলেছে সেটা বন্ধ করতে হবে। এটা অনেকটা মুরগির ডিম আগে, না মুরগি আগে—এ রকম একটা সমস্যা।

এটাও মানতে হবে, পৃথিবীতে যেসব সীমান্তে যত হিংসাত্মক ঘটনা হয়, প্রায় সে রকমই হিংসাত্মক ঘটনা আজকে ঘটে চলেছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। এমন হিংসাত্মক ঘটনা কখনোই কাম্য নয় এবং এর নিরসন হওয়া খুব দরকার।

এরপর আসছে বিভিন্ন নদীর সমস্যা। দুই দেশের মধ্যে এত নদী রয়েছে, যেগুলো ভারত-বাংলাদেশ—এই দুই দেশের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়। সেই সব নদীর পানিবণ্টন নিয়েও যে সমস্যা, তারও মীমাংসা হওয়া উচিত। আর সেটা শুধু তিস্তা নয়। কারণ তিস্তা এখন একটা রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে গেছে। আমরা তিস্তার যে সমস্যা তার সমাধান তো চাই-ই, কিন্তু তিস্তা ছাড়াও আরো অনেক নদী আছে। সেই নদীগুলোর সমস্যার সমাধান কেন হবে না?

আরেকটা কথা, বিশেষ করে বাণিজ্য সম্পর্কে যাঁরা জানেন-বোঝেন তাঁরা বলছেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হবে এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের সম্পর্ককে সুষ্ঠু করতে হবে। অবশ্য এ ব্যাপারে বিভিন্ন মতামত থাকলেও একটা মত পরিষ্কার যে ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্যের জট না ছাড়ালে দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্ক ভালো হতে পারে না।

আমি আমার নিজস্ব কাণ্ডজ্ঞান থেকে কথাগুলো বলার চেষ্টা করছি, কিন্তু যাঁরা আমার চেয়েও অনেক বেশি সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে খবর রাখেন, এখন আমি তেমন কয়েকজনের মতামত আপনাদের জানাচ্ছি। যেমন—আনন্দবাজার পত্রিকার প্রবীণ সাংবাদিক অগ্নি রায় দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ বিষয়ে গবেষণা করেন, আলোচনা করেন এবং কোনো রকম জার্সি গায়ে না দিয়েই তিনি বিশ্লেষণ করেন। অগ্নি রায়ের বক্তব্য হচ্ছে, এই যে সীমান্তে হিংসা এবং স্মাগলিং, সীমান্তে একদিকে অনুপ্রবেশের অভিযোগ, আর একদিকে হিংসার অভিযোগ—সব মিটতে পারত, যদি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে কমপ্লিট ফেনসিং তৈরি করা যেত।

দ্বিতীয়ত, নদীগুলোর যে পারস্পরিক ম্যানেজমেন্ট, সেখানে এই ট্রান্স বর্ডার নদীগুলোর ব্যাপারে একটা বোঝাপড়া হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে অগ্নি রায় মনে করেন, যেটা বিশেষভাবে প্রয়োজন সেটা হলো, দুই দেশের মধ্যে আরো অনেক বেশি আস্থা অর্জন। অর্থাৎ যেসব জায়গায় এখনো ভারতের প্রতি অনাস্থা রয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সাম্প্রতিক সময়ের সম্পর্ক নিয়ে যে প্রশ্ন আছে সেগুলোর মধ্যে অনাস্থার যে বিষয়গুলো রয়েছে তা দূর করা দুই পক্ষ থেকেই জরুরি।

জয়ন্ত রায় চৌধুরী, তিনি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় দীর্ঘদিন ধরে বিজনেস এডিটর ছিলেন। এখন তিনি ‘পিটিআই’ নামের সংবাদ সংস্থার পূর্বাঞ্চলীয় সম্পাদক হিসেবে কলকাতায় আছেন। জয়ন্ত রায় চৌধুরী ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক, বিশেষত বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে অনুধাবন করছেন এবং তিনি বহুবার ঢাকা শহরে গেছেন। জয়ন্ত রায় চৌধুরী বলছিলেন, এই দুটি দেশের মধ্যে যে ট্রেড সে বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি মুক্ত অবাধ বাণিজ্য চুক্তি হওয়া দরকার। সেখানে ঢাকা-দিল্লির বাণিজ্য নিয়ে যে গ্যাপ তা দূর করতে হবে। একদিকে চট্টগ্রামের রাস্তা এবং তার যে নিরাপত্তা—সব কিছু দেখেও বাংলাদেশ যে রকম ভারত থেকে বাংলাদেশে যাওয়ার যাত্রাপথ অনেক বেশি উন্মুক্ত করছে সে রকম ভারত থেকে যেসব এক্সপোর্ট হচ্ছে, আবার যেগুলো বাংলাদেশ ইমপোর্ট করছে, সেখানে যে কর লাগানো হয়, সেসব ব্যাপারে আরো অনেক বেশি লিবারেল হতে হবে। অর্থাৎ এই ব্যাপারে দুটি দেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে একটা সুষ্ঠু জায়গায় পৌঁছতে হবে। এর জন্য দরকার অনেক বেশি কানেক্টিভিটি। এমনকি রাজশাহী-মুর্শিদাবাদে যে একটা ব্রিজ তৈরি হওয়ার কথা চলছে, সেটাকেও বাস্তবায়ন করতে হবে।

জয়ন্ত রায় চৌধুরী আরেকটা কথা বলছেন, কলকাতায় এত ভালো ভালো বাংলা ছবি তৈরি হয়। ঢাকায়ও এত ভালো ভালো বাংলা ছবি তৈরি হয়। এ ছাড়া বলিউডের ছবি নিয়েও বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে যথেষ্ট উৎসাহ আছে। কেন ভারতীয় ছবি বাংলাদেশে দেখানো হবে না? কেন বাংলাদেশের ছবি ভারতে, বিশেষ করে কলকাতা এবং দিল্লিতে দেখানো হবে না? সেই প্রশ্নগুলোরও একটা মীমাংসা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অনেক কূটনীতিক মনে করেন, আমেরিকা ও কানাডার মতো ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভিসাহীন যাতায়াতের ব্যবস্থা করা উচিত। কিন্তু তার জন্য তো দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অবশ্য শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও হবে না, সেগুলো বাস্তবায়নও করতে হবে।

সুতরাং শুধু ভালো সম্পর্কের কথা বললেও তো হবে না, সেগুলোকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে এমন যেন মনে না হয় যে ভারতের প্রয়োজন বাংলাদেশকে। তার কারণ ভারতের ভোটের জন্য এবং বাংলাদেশের যে ভোট তাতেও কিন্তু ভারতের আগ্রহ অনেক বেশি। সুতরাং আওয়ামী লীগের কন্ট্রোলার হচ্ছে ভারত—এই ধারণা বাংলাদেশে যত বাড়ছে সেটা ততটাই ভারতের জন্যও খারাপ, বাংলাদেশ সরকারের জন্যও খারাপ।

কাজেই ভারত যদি এই মুহূর্তে নদীর পানির যে শেয়ারিং এবং তার যে চুক্তি সেটা তিস্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন নদী চুক্তি নিয়ে এখনই বিশেষভাবে সক্রিয় না হয় এবং যদি প্রদর্শন করতে না পারে যে তারা কিছু করছে, তাহলে কিন্তু খুব মুশকিল। অর্থাৎ সীমান্তে যে সংযম, সেটা বাংলাদেশের সীমান্ত বাহিনীকেও দেখাতে হবে এবং ভারতেরও সীমান্ত বাহিনীকে দেখাতে হবে। বাংলাদেশ সরকারকেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্মাগলিংয়ের ব্যাপারে কড়া মনোভাব নিতে হবে।

বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেক ভারতীয় সাংবাদিক, যাঁরা আমার প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন তাঁরা বলছেন, এই যে পেঁয়াজ ও ভারতীয় মসলা—এগুলো যে বাংলাদেশে যাচ্ছে এবং সে ক্ষেত্রে কিন্তু ভারতকে কর আরোপের মাধ্যমে এবং রপ্তানি করার ব্যাপারেও অনেক বেশি উদার হতে হবে। এই যে কিছুদিন আগেও সীমান্তে পেঁয়াজবোঝাই লরি আটকে রইল এবং সেই পেঁয়াজগুলো পচে গেল; কিন্তু বাংলাদেশে পৌঁছল না—এ ঘটনায় কিন্তু বাংলাদেশে খুব নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়েছে প্রতিষেধক কূটনীতিতে। প্রতিষেধক কূটনীতিটা হলো এমন যে প্রতিষেধকের পয়সা দেওয়া হলো এবং সেটা ঠিকমতো পৌঁছল না অথবা সেটা এত দিন পরে যাচ্ছে। এর ফলে কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে খুব খারাপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে।

একজন বাংলাদেশের কূটনীতিক বলছিলেন, ৫০ বছর যে পালন করা হচ্ছে সেটাতে কিন্তু সাধারণভাবে একটা ট্রাস্ট ডেফিসিট ভারত সম্পর্কে বেড়েছে। এত প্রচার, এত প্রদর্শনী করেও ট্রাস্ট ডেফিসিট কেন ঘোচানো যাবে না? তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে তো উদ্যোগ নিতেই হবে। সীমান্তের ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদি অনেকটাই কাজ করেছেন। আরো অনেক কাজ বাকি আছে। কিন্তু বাণিজ্যের ব্যাপারে এখন আরো অনেক বেশি সক্রিয় হতে হবে।

বাংলাদেশে আছেন আমার একজন পুরনো স্কুলের বন্ধু। তিনি বলছিলেন, এই যে একাত্তরের যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের ভারত এভাবে সমর্থন করেছিল এবং এক কোটি উদ্বাস্তুকে থাকার জায়গা দিয়েছিল। এমনকি কলকাতা থেকে একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে চলার সুযোগ করে দিয়েছিল। আর সেই সময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ভারতের সংসদেও চিৎকার করে বলা হয়েছিল। অবশ্য তৎকালীন মন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় একটা ইতিবাচক ভূমিকা নিয়েছিলেন। এই সব ইতিবাচক যে ইতিহাস, সেই ইতিহাসটা কিন্তু বাংলাদেশের আজকের প্রজন্ম যতটা না মনে রেখেছে, তার চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক বাংলাদেশের মানুষের কাছে যেন এটা মনে হচ্ছে যে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বহু ক্ষেত্রে ভারত যেগুলো ভবিষ্যতের জন্য করতে হবে বলছে, সেগুলো করছে না।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগীয় প্রধান দীপঙ্কর সিনহার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারের ওপরে দখলদারির চেষ্টা করছে—এই যে পারসিপশন, এটাকে ভাঙতে হবে। বাংলাদেশ তার সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এগোচ্ছে এবং বাংলাদেশকে সেই জায়গাটা দিতে হবে, তা না হলে কিন্তু বিপদ।

এ ছাড়া নদী এবং সীমান্ত নিয়ে যে বিবাদ এবং সীমান্তে গুলি চালনার ঘটনা, যেটা সবাই বলেছে, সেসব তো আছেই; কিন্তু এ সব কিছুর মধ্যে দীপঙ্করবাবু বলছিলেন, তিনি নিয়মিত বাংলাদেশের কাগজ পড়েন এবং বাংলাদেশের মিডিয়া দেখেন। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে এই ধারণা ক্রমেই বাড়ছে যে এভাবে ভারত যেন একটা নতুন উপনিবেশবাদ তৈরি করতে চাইছে। এই ধারণাটা কিন্তু ভারতের জন্য মোটেই ভালো নয়।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠের

বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা