kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ বিশ্ব

মঈনউদ্দিন মুনশী

১৫ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ বিশ্ব

করোনা মহামারিতে ২০১৯ সালের শেষ ভাগ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৯ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ২৪ কোটি মানুষ। বর্তমানে প্রায় সব দেশেই বেশি সংক্রামক করোনা ভেরিয়েন্টের বিস্তার দেখে মনে হয়, এই সংখ্যা আরো বাড়বে। স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকট বিশ্বকে এই শতকের এক ভয়ংকর সন্ধিক্ষণে ফেলে দিয়েছে। এই মহামারিতে আমরা লক্ষ করেছি বিশ্ব স্বাস্থ্য নিরাপত্তা কতটা দুর্বল। একটা ভাইরাসজনিত রোগ নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব কতটা অসহায় ও অপ্রস্তুত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী এই রোগের দ্রুত বিস্তার ঘটেছে।

এখন প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব বিশ্বকে বর্তমান মহামারি থেকে মুক্ত করা। আরো লক্ষ্য হচ্ছে ভবিষ্যতে এ ধরনের সম্ভাব্য মহামারি নিরোধে শক্তিশালী বিশ্ব স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশ্বনেতাদের সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ও ব্যবস্থা করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে চারটি মূল উপাদান বিবেচনায় আনতে হবে : ১. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিশ্বের সব স্বাস্থ্য সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন। জাতিসংঘ, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংক—যারা মহামারি প্রস্তুতি ও মোকাবেলায় অর্থায়ন করে, সবাইকে একত্র করে বর্তমান মহামারির সব বিষয় পরীক্ষা করে দেখতে হবে। নিশ্চিত করে জানা প্রয়োজন যে এ ধরনের পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য আছে কি না। ২. সব দেশকে প্রযুক্তি ব্যবহারে আরো পারদর্শী হতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সংকট সময়ে উদ্ভূত সংক্রামক ব্যাধি বিষয়ে সব দেশের স্বাস্থ্য পরিদপ্তরের রোগ তথ্য একে অপরের মাঝে দ্রুত আদান-প্রদান করতে হবে, যাতে এর প্রতিরোধে সময়োপযোগী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ৩. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। জীবাণুঘটিত আশঙ্কা নির্ধারণ এবং যথাযথ প্রতিক্রিয়া কার্যকর করতে প্রতিটি দেশকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এ ধরনের সংকট মোকাবেলা করতে প্রয়োজনীয় গবেষণা ও চিকিৎসা উদ্ভাবনে অর্থ খুবই জরুরি, পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে এ ধরনের কর্মসম্পাদন শক্ত। ৪. বিশ্বব্যাপী অর্থ, তথ্য ও প্রযুক্তি পরিচালনাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে এবং এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। সব দেশের সরকারকে রাষ্ট্রীয় নীতিমালার সমন্বয়, তথ্যের আদান-প্রদান, ভুল পদক্ষেপ সময়মতো শুধরে নেওয়া, যা জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে, সর্বোপরি স্বাস্থ্য ন্যায়পরতা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে।

করোনা মহামারি বিশ্বব্যাপী রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জাম এবং ভ্যাকসিন বণ্টন বিষয়ে অন্যায্যতা ও অসমতা তিক্ততার সৃষ্টি করেছে। এখন প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য নিরাপত্তার পূর্ণ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে সব মানুষ উপকৃত হয়, সুস্থ থাকে, নিরাপদে থাকে। আঞ্চলিকভাবে ভ্যাকসিন তৈরি, প্রযুক্তির হস্তান্তর, তথ্যের আদান-প্রদান মহামারির শুরুতেই করতে হবে। বিশ্বব্যাপী যাতে শুধু ধনী দেশই নয়, বরং গরিব দেশও একইভাবে উপকৃত হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধির (International Health Regulations) যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এই স্বাস্থ্যবিধি একটি বৈধ কাঠামো, যা সব দেশকে মেনে চলতে হবে। জনস্বাস্থ্য সংকটের সময় রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ, সংক্রামক ব্যাধির খবর ও এর বিস্তারের গতিবিধি দ্রুত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং গণমাধ্যমকে জানাতে হবে। আন্তর্জাতিক যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে রোগ অন্য দেশে না ছড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধির চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন, সংশোধন প্রয়োজন। এই স্বাস্থ্যবিধি শেষবার সংশোধন করা হয়েছিল ২০০৫ সালে। এই বিধি সবাই পালন করছে কি না সেটি পরিপালন কমিটিকে প্রথম থেকেই পরীক্ষা করে দেখতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিধিবদ্ধ করে আরো দায়িত্বপূর্ণ এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের এখনই সময়। সুস্থ ও নিরাপদ বিশ্ব নিশ্চিত করতে হবে।

 লেখক : মেডিক্যাল ডিরেক্টর, সংক্রামক ব্যাধি বিভাগ, সুমা বারবারটন হাসপাতাল, ওহাইও, যুক্তরাষ্ট্র

 



সাতদিনের সেরা