kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সামাজিক উন্নয়ন ও সম্প্রীতির উৎসব

ড. অসীম সরকার

১৪ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শরৎকালে অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজা উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব। পক্ষান্তরে বসন্তকালে অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজা বাসন্তীপূজা নামে অভিহিত। বাসন্তীপূজা এখনো প্রচলিত থাকলেও শারদীয় দুর্গাপূজাই আবহমান কাল থেকে মহাসমারোহে উৎসবাকারে পালিত হচ্ছে। শারদীয় দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা বেশি। বাসন্তীপূজা মূলত কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সমাজের উন্নয়ন তথা সামাজিক সমৃদ্ধি ও সম্প্রীতি রক্ষায় শারদীয় দুর্গাপূজার গুরুত্ব অপরিসীম।

শারদীয় দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হলো বাঙালির প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। এটি এখন বাংলাদেশের অন্যতম উৎসব। দেবীবন্দনায় মুখরিত হয় বাংলাদেশের সমগ্র আকাশ-বাতাস। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে সর্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব। বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের কাছে এ পূজা চিরায়ত ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এক অনুপম প্রীতিময় আনন্দ উৎসব। অশুভ ও অপশক্তির পরাজয় এবং শুভশক্তির জয়, সত্য ও সুন্দরের আরাধনায় সর্বজীবের মঙ্গল সাধন শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট্য। অশুভ ও আসুরিক শক্তি দমনের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার, সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা, সব মানুষের সমানাধিকার নিশ্চিতকরণ, মানুষের মধ্যকার সর্বপ্রকার বৈষম্য বা ভেদাভেদ ও অন্যায়-অবিচার দূরীকরণ এবং অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, হানাহানিমুক্ত অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সমাজ গঠন করার শিক্ষালাভই দুর্গোৎসবের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশে দুর্গাপূজা মানেই সর্বজনীন। এখানে উৎসবের আনন্দে গোটা দেশে প্রাণের সঞ্চার হয়। যেকোনো পূজামণ্ডপে গিয়ে বোঝা যায় না কে কোন জাতির। উদ্যোক্তা কিংবা আয়োজক শুধু হিন্দু সম্প্রদায় নয়, অন্য সম্প্রদায়ের উপস্থিতিও লক্ষ করা যায়। পূজার শুরু থেকে বিসর্জন পর্যন্ত সব আয়োজনে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষের উপস্থিতি লক্ষণীয়। উৎসব ঘিরে এই আনন্দঘন পরিবেশ ও মিলন বিশ্বে বিরল। এটা এমন এক অপূর্ব দৃশ্য, যা শুধু বাংলাদেশেই দেখা যায়।

শারদীয় দুর্গোৎসব সমাজকে অসহিষ্ণু, হিংসা, বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের অশুভ প্রভাব থেকে মুক্ত করে মানুষের মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করে। ঐক্যবদ্ধ করে সমগ্র বাঙালিকে। এক মায়াবী বন্ধনে জড়িয়ে রাখে সব বাঙালিকে। উদ্বুদ্ধ করে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতি চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হতে। সবার মধ্যে সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধন সুদৃঢ় করে। দুর্গোৎসবের শুভ্র ও আনন্দ জাগানিয়া পরশ শুধু বাঙালি হিন্দু ধর্মানুসারীদেরই নয়, এর চিরায়ত ঐকতান স্পর্শ করে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়কে। দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে যে অনাবিল আনন্দ সবার মনে জেগে ওঠে তা বাঙালির প্রতিটি গৃহকে আলোকিত করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার মঙ্গল ও হিত কামনায়।

সমাজ প্রগতির নানা অনুষঙ্গের মধ্যে ধর্ম কিংবা ধর্মীয় আচার অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। ধর্মীয় আচার যখন কোনো একটি জাতির জীবনে উৎসবের মর্যাদা প্রাপ্ত হয়, তখন তা ধর্মীয় চেতনার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে হয়ে ওঠে অগ্রবর্তী সমাজকাঠামোর ভিত্তিমূলের চলমান সোপান। বাঙালির জীবনে শারদীয় দুর্গোৎসব তেমনি এক বহমান অসাম্প্রদায়িক চেতনসত্তার প্রতিরূপ। যেখানে থাকে না কোনো জাত-পাতের বাছ-বিচার, থাকে না কোনো ভেদাভেদ, থাকে না সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। বাঙালি যে অসাম্প্রদায়িক জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তা প্রতিবছরই প্রমাণিত হয় দুর্গোৎসবের মধ্য দিয়ে। এ কারণেই দুর্গোৎসব হচ্ছে সম্প্রীতির আর বাঙালির আনন্দ-উচ্ছ্বাস উদযাপনের উৎসব—এক মহামিলনধর্মী সত্যিকার সর্বজনীন উৎসব। দুর্গাপূজা আক্ষরিক অর্থেই সর্বজনীন নয়, এর রয়েছে ব্যাপক ও সুস্থ সামাজিক প্রভাব, যা একান্তই চিরন্তন ও স্বতঃস্ফূর্ত। এ জন্যই শারদীয় দুর্গাপূজা সামাজিক সম্প্রীতি, মহামিলন এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার চিরন্তন সর্বজনীন উৎসব।

 ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—এই চেতনাকে ধারণ করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী-নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণ শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপন করে এবং আনন্দ উৎসবে অংশগ্রহণ করে। সব বাঙালি মিলিত হয় অভিন্ন মোহনায়, অভিন্ন চেতনায়। পূজার ধর্মীয় অংশটুকু হিন্দুদের; কিন্তু মেলা, উৎসব ও আপ্যায়নে অংশগ্রহণ ও আনন্দ উপভোগ করে সবাই। সবার অংশগ্রহণ ও উপস্থিতিতে শারদীয় দুর্গাপূজা পরিণত হয় সর্বজনীন উৎসবে, পরিণত হয় সর্বস্তরের মানুষের মিলনমেলায়, পরিণত হয় অন্যতম জাতীয় উৎসবে। ঐক্য ও সমন্বয়ের প্রতীক হিসেবে এ উৎসব পরিণত হয় সম্প্রীতিময় আনন্দযজ্ঞে। সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ এবং ঐক্যসূত্রে গ্রথিত হয় সব মানুষের হৃদয়; দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয় ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। পূজা থেকে উৎসবে রূপান্তরের এই যে প্রক্রিয়া, এটি বাঙালি জাতির অসাম্প্রদায়িক সত্তার চিরন্তন বহিঃপ্রকাশ। আমাদের জাতীয় জীবনে এবং সম্প্রীতি রক্ষায় দুর্গাপূজার ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।

লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, সংস্কৃত বিভাগ; ট্রাস্টি, হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট; উপদেষ্টা, শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র; সিনেট সদস্য ও সাবেক প্রাধ্যক্ষ, জগন্নাথ হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 



সাতদিনের সেরা