kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দিল্লির চিঠি

পশ্চিমবঙ্গের উপনির্বাচনে সবার দৃষ্টি ভবানীপুরে

জয়ন্ত ঘোষাল

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পশ্চিমবঙ্গের উপনির্বাচনে সবার দৃষ্টি ভবানীপুরে

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১। এই দিনটিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট। কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে মমতার উপনির্বাচন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ২০০-র বেশি আসন পেলেও নন্দীগ্রামে সামান্য ভোটের ব্যবধানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছেন। আর সেই কারণে ভবানীপুরে উপনির্বাচন হতে চলেছে। কেননা পরাজিত বিধায়ক শপথ গ্রহণ করলে সংবিধানের ধারা অনুযায়ী তাঁকে ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচনে জিতে আসতে হয়। ভবানীপুরে যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেরে যান তাহলে তিনি আর মুখ্যমন্ত্রী হতে পারবেন না।

ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজিত হবেন—এমনটা কিন্তু আমার একেবারেই মনে হচ্ছে না। এর আগে ভবানীপুর বিধানসভার উপনির্বাচন ছয় মাসের মধ্যে হবে কি হবে না, তা নিয়েও সংবাদমাধ্যমে যথেষ্ট আলাপ-আলোচনা হয়েছে। নন্দীগ্রামের বিধায়ক, বিজেপির বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী চেয়েছিলেন, যাতে কভিডের যুক্তি দেখিয়ে এবং তৃতীয় ওয়েভের সম্ভাবনা বা আশঙ্কার জন্য আপাতত এই ভোট না হয়। কেননা ভোট করা মানেই জনসভা করতে হবে, কভিড-বিধি মানা যাবে না ইত্যাদি। রাজ্য বিজেপি নির্বাচন কমিশনের কাছে একটি স্মারকলিপি পাঠিয়েও এই আবেদন জানিয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী, অমিত শাহর কাছে গিয়েও এই অনুরোধ করেছিলেন। এই আবেদনে যুক্তি ছিল একটাই যে ছয় মাসের মধ্যে যদি ভোট না হয়, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নির্ধারিত দিনের মধ্যে ইস্তফা দিয়ে অন্য কাউকে মুখ্যমন্ত্রী করতে হতো। এর কারণ, সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে ভোট ছয় মাসের মধ্যে না হলে ফের শপথ নিয়ে, আবার ছয় মাসের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন না।

বেশির ভাগ সাংবাদিক এমনটা বলেছিলেন যে বিজেপি মমতাকে এমব্যারাস করার জন্য এই কাজটা করতে পারে। সেই সময় কিন্তু আমি এই সংবাদমাধ্যমেই লিখেছিলাম, এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করেন, তখন এই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছেন। তার কারণ প্রধানমন্ত্রীর মনে হয়েছিল, ভোটের সময় তৃণমূল ও বিজেপির আসনসংখ্যা যা-ই হোক না কেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিপুল ভোটে জিতেছেন এবং জয়টা তাঁর নেতৃত্বেই হয়েছে।

সুতরাং এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয়টাকে বিজেপি ‘টকিং পয়েন্ট’ করতে পারে। আর বিজেপি যদি এই বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি রাজনীতি করে তাহলে জনমত বিজেপির বিরুদ্ধে যাবে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার ‘ভিকটিম স্ট্যাটাস’ পেতে পারেন। সাংবিধানিক শর্ত মেনে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটে লড়তে চাইছেন, তখন প্রধানমন্ত্রীর ও সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে লড়তে না দেওয়া কোনোমতেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হতে পারে না। এর ফলে বিজেপির লাভের চেয়ে লোকসান বেশি হতে পারে।

এবার পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী দিয়েছে প্রিয়াঙ্কা টেবরিওয়ালকে। তিনি মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। অর্থাৎ তাঁর শিকড় রাজস্থানে হলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে কলকাতায় বসবাস করছেন। টেবরিওয়াল হলেন বিজেপির মুখপাত্র। তিনি একজন আইনজীবী এবং খুব ভালো বক্তা। এর আগে বিধানসভা নির্বাচনে তিনি এন্টালি থেকে হেরেছেন। তারও আগে কলকাতা পুরসভার ভোটেও তিনি হেরেছেন। যেহেতু ভবানীপুর কেন্দ্রটিতে মাড়োয়ারি ভোট আছে, গুজরাটি ভোট আছে, পাঞ্জাবি ভোট আছে এবং এই কেন্দ্রটি যথেষ্ট কসমোপলিটন—সেই কারণে টেবরিওয়ালকে প্রার্থী করা হয়েছে এই কেন্দ্রে, যাতে বিজেপি এই এলাকার অবাঙালি ভোটগুলো পেতে পারে।

এর আগের দুটি বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাস্ত করার জন্য বিজেপির দিকে যে অবাঙালি ভোট অনেকটা ঢলেছে সেই ভোটগুলো যাতে আবার তৃণমূলে ফেরত না যায়, বিজেপির পক্ষ থেকে সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। আর সে কারণেই বিজেপি তৃণমূলকে সে সুযোগ না দিয়ে হরদেব পুরির মতো শিখ-পাঞ্জাবি বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে কলকাতায় পাঠানো হয়েছে। আরেক সংসদ সদস্য ব্যারাকপুরের নেতা অর্জুন সিংহ, যিনি একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে পরিচিত, তাঁকে কোনো দায়িত্ব দেওয়ার প্রসঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।

এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুরে বিভিন্ন এলাকায় প্রচারে যাচ্ছেন এবং তিনি বারবার বলছেন, ভবানীপুর হলো ‘মিনি ইন্ডিয়া’। তিনি কিন্তু অবাঙালিদের জন্য আরো বেশি করে যাচ্ছেন। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বাঙালি ও অবাঙালির যে ইস্যু হয়েছিল, সেটা ছিল মূলত বিজেপির হিন্দুত্ব রাজনীতিকে মোকাবেলা করার জন্য। যাতে ধর্মের ভিত্তিতে মেরুকরণ না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বাঙালি জাতিসত্তার তাসটা খেলেছিলেন। বিতর্ক হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছিলেন তা কিন্তু বাঙালি সত্তাকে যথেষ্ট জাগরিত করতে কাজে দিয়েছিল। হতে পারে সেই স্লোগানটি বাংলাদেশের কাছ থেকে ধার করা এবং হতে পারে সেটা বাংলাদেশে কিঞ্চিৎ প্রতিক্রিয়াও হয়েছিল। এই কাজটি যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপরিকল্পিতভাবে করেছিলেন, সেটা এখন বেশ বোঝা যাচ্ছে। কারণ এখনো কিন্তু বিভিন্ন জনসভায় গিয়ে তিনি এই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি দিচ্ছেন।

২০১৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি ছিলেন সবচেয়ে বড় মুখ। তিনি বিপুল ভোটে জিতে এসেছিলেন। ২০২৪ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ হতে পারেন—এমন কথা বলছেন খোদ বিজেপি থেকে সদ্য তৃণমূলে আসা সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে বিরোধীদের মধ্যে যে ঐক্য দেখা যাচ্ছে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এই মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে উঠেছেন বিরোধী ঐক্যের মধ্যমণি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে আঞ্চলিক দলগুলো জোটবদ্ধ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কংগ্রেস নেতৃত্ব যে যথেষ্ট দুর্বল তা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে পাঞ্জাব, ছত্তিশগড়, গোয়াসহ বিভিন্ন রাজ্যে। উত্তর প্রদেশে তো কংগ্রেসকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না।

এমন একটা পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী শিবিরে এক আশার আলো তৈরি করেছেন। এ কথা ঠিক যে প্রধানমন্ত্রী হতে গেলে অন্য অনেকের সমর্থন দরকার। সেখানে কংগ্রেসকেও ভালো ফল করতে হবে। কারণ পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি আসনের ৪০টিই যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়ে যান, তাহলেও কেন্দ্রে তৃণমূল একা সরকার গড়তে পারবে না। সরকার গড়তে গেলে দরকার হবে অনেক বেশি আসন। সে জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অন্য আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থন আশা করবেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি বিরোধী বৃত্তের মুখ হিসেবে আগামী দিন অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে অবতীর্ণ হবেন, নাকি পশ্চিমবঙ্গে তাঁর ৪২টি আসন যাতে অটুট থাকে সেই চেষ্টা করবেন? কেননা ২০১৯ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ১৮টি আসন পেয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গে যে হারে বিজেপির ভোটব্যাংক তৈরি হচ্ছে, সেটা গোকূলে যে বাড়ছিল, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ২০২৪ সালে মমতার আরেকটা লক্ষ্য হচ্ছে, যাতে সর্বোপরি ১৮টি আসন তৃণমূলের কাছে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। অন্যদিকে বিজেপির লক্ষ্য হচ্ছে, ভবানীপুরে যে ভোট বিজেপি পেয়েছে সেই ভোট অটুট রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া, যাতে ২০২৪ সালে লোকসভায় বিজেপির আসন কমে না যায়।

ভবানীপুর এমন একটা জায়গা, যা বাঙালির ইতিহাসে বড় গর্বের জায়গা। এখানে এলগিন রোডে নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের বাড়ি। এই ভবানীপুরে রানি রাসমণির বাড়ি, যদুবাবুর বাজার, যেটা এখন জগুবাবুর বাজার নামে পরিচিত। এখানে অষ্টাদশ শতাব্দীর অনেক বেশি সক্রিয় সাংস্কৃতিক জীবন বেড়ে উঠেছে। এর ফলে ভবানীপুরের একটি বিশেষ ঐতিহ্য আছে, যা বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুরের মানুষের কাছে পৌঁছতে চাইছেন। আবার এই কেন্দ্রে মুসলমান ভোট আছে শতকরা ২০ ভাগ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু মেরুকরণের রাজনীতি চাইছেন না। সে কারণে গুরুদুয়ারা, মন্দির, মসজিদ—সর্বত্রই তিনি যাচ্ছেন এবং সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তা দিতে চাইছেন। অনেকে মনে করছেন, তিনি যদি বিপুল ভোটে জেতার মার্জিন তৈরি করতে পারেন, তাহলে ভবানীপুরের এই জয়লাভ আগামী দিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জাতীয় রাজনীতিতে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। বিধানসভা নির্বাচনের সময় নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ বারবার কলকাতায় এসেছিলেন এবং মমতার বিরোধিতা করেছিলেন। অথচ এবার ভবানীপুরে যখন খোদ মমতার লড়াই, তখন মোদি, অমিত শাহ তো দূরের কথা, শুভেন্দু অধিকারীকেও দাঁতে দাঁত দিয়ে লড়াই করার শক্তি ক্ষয় করতে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

 

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র

বিশেষ প্রতিনিধি

 



সাতদিনের সেরা