kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ এবং পরাশক্তির ভূমিকা

গাজীউল হাসান খান

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ এবং পরাশক্তির ভূমিকা

প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের শেষার্ধে নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সভা বসে। বিশ্ব সংস্থার সাধারণ পরিষদে অনুষ্ঠিত সে সভা যেন বিশ্বনেতাদের এক বিশাল মিলনমেলা। বিশ্বের ১৯৩টি সদস্য দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা সেখানে বিভিন্ন চলমান বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে থাকেন। অন্যান্য বছরের মতো এবারও সাধারণ পরিষদে বিশ্বনেতাদের ৭৬তম অধিবেশন শুরু হয়েছে গত ১৬ সেপ্টেম্বর। ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে বিশ্বনেতাদের বক্তব্য প্রদান কর্মসূচি। সে অনুষ্ঠানে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২১ সেপ্টেম্বর প্রথম বক্তব্য দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তব্য দেবেন কাল ২৪ সেপ্টেম্বর।

বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় তৎকালীন লীগ অব নেশনস ব্যর্থ হওয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বহু চেষ্টা-তদবিরের পর নতুন আঙ্গিকে গঠন করা হয়েছিল এখনকার জাতিসংঘ। যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে ২৪ অক্টোবর ১৯৪৫ সালে আত্মপ্রকাশ করেছিল এই বিশ্ব সংস্থা, যার সদর দপ্তর হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল নিউ ইয়র্ক নগরীকে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধবিগ্রহের আশঙ্কাকে অবদমিত করাই জাতিসংঘের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল না। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে, বিশেষ করে পশ্চাৎপদ বা অনুন্নত দেশে টেকসই উন্নয়নের ধারা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, বহিরাগত কিংবা শরণার্থী সমস্যা সমাধান এবং রাষ্ট্রহীন ভাসমান মানুষের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাও জাতিসংঘের বিশেষ কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে। এ ছাড়া কৃষি, শিল্প ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার রোধ করা পর্যন্ত জাতিসংঘের কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে।

বিভিন্নভাবে পরিবেশদূষণের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকানো এবং করোনার মতো অতিমারির হাত থেকে বিপন্ন মানুষকে বাঁচানোর মতো জরুরি বিষয়াদি এবার কাঙ্ক্ষিতভাবেই বিশ্বনেতাদের বক্তব্য উঠে আসবে। এ ছাড়া রয়েছে জাতিসংঘের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী এবং বিশেষ কর্মসূচি। আর তা হচ্ছে, বিভিন্ন রাষ্ট্রের সহযোগিতার মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (Sustained Economic Graph) নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের ‘বৈশ্বিক কর্মসূচি ২০৩০ (Agenda 2030)-এর সফল বাস্তবায়ন। এ বিষয়টি অবশ্যই একটি দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ আলোচনার দাবি রাখে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের জন্য চাই উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা নিশ্চিত করা। তা না হলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচন মোটেও সম্ভব হবে না। তাতে বহিরাগমন সমস্যা বিশ্বব্যাপী আরো বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে। তারপর কর্মসূচিতে রয়েছে বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা। এ ছাড়া জঙ্গিবাদের উত্থান রোধ করে বিশ্বকে একটি শান্তিপূর্ণ স্থানে পরিণত করাও জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু সর্বত্রই এখন নাগরিকসমাজে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ উঠেছে, বিশ্বের পরাশক্তি কিংবা জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্যদের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে বিশ্ব আবার বিভিন্ন শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ছে এবং অতীতের ঠাণ্ডা লড়াই কিংবা শীতলযুদ্ধ আবার নতুনভাবে দানা বেঁধে উঠছে।

বিরাজমান এ বিশ্ব পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ্বনেতারা তাঁদের বক্তব্য দিয়ে যাবেন। জাতিসংঘের শক্তিধর নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। এই পাঁচ পরাশক্তির হাতে রয়েছে ভেটো প্রদানের ক্ষমতা। তারা কোনো কিছু নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেই তাদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে যেকোনো প্রস্তাব আটকে দিতে পারে। এর ফলে জাতিসংঘের মাধ্যমে কোনো সমস্যার সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্বের জনসংখ্যা এখন সাত বিলিয়নের ওপরে চলে গেছে। অথচ তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে পাঁচটি পরাশক্তির দেশ। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না কোনো কোনো পরাশক্তির দ্বিমত বা ভেটোর কারণে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের ক্ষমতাধর নিরাপত্তা পরিষদে লাতিন আমেরিকা (দক্ষিণ আমেরিকা) এবং আফ্রিকা মহাদেশ থেকে স্থায়ী সদস্য হিসেবে কারো কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। বিশ্বের বৃহত্তম মহাদেশ এশিয়া থেকে চীন, উত্তর আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ থেকে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এবং রাশিয়াকে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদে নতুন স্থায়ী সদস্য হিসেবে ব্রাজিল, ভারত, মিসর ও জাপানের নাম প্রস্তাব করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সম্প্রতি তার বিরোধিতা করে বসে। ফলে জাতিসংঘের সব অঞ্চলের মানুষের সঠিক প্রতিনিধিত্ব না হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সেই পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘকে নতুন করে অর্থাৎ যুগোপযোগী করে পুনর্গঠন করার দাবি এখন সর্বত্র। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। ফলে বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষ জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে এখন খুব কমই মাথা ঘামায়। জাতিসংঘ নিয়ে মানুষ যেন দিন দিন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

তবে এত কিছুর পরও এখনো বিশ্বের কোথাও যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা কোনো অশান্তি ও বিরোধ সৃষ্টি হলেও জাতিসংঘ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে গিয়ে ধরনা দেওয়া যায়, আলাপ-আলোচনা কিংবা বৃহত্তর সমঝোতার মাধ্যমে অশান্তি ঠেকানো যায়, বিরোধের আংশিক সুরাহা করা যায়। যারা জাতিসংঘ সৃষ্টি করেছে কিংবা তার সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য বিধি-বিধান প্রণয়ন করেছে, তাদেরই শেষ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানের গৃহীত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব না মানতে কিংবা অগ্রাহ্য করতে দেখা যায় বেশি। এর ফলে কাশ্মীর কিংবা ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের কোনো নিষ্পত্তি হচ্ছে না। যে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘকে অগ্রাহ্য করে একতরফাভাবে ইরাক আক্রমণ করেছে কিংবা ‘নাইন-ইলেভেনের’ আক্রমণের অভিযোগে গত ২০ বছর আফগানিস্তানে অন্যায্য যুদ্ধ চালিয়ে গেছে, তার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি। বলতে গেলে তাদের অর্থে জাতিসংঘ চলে। এখন যুক্তরাষ্ট্র চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঠেকানো এবং দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরে তার বাণিজ্য ও নৌযান চলাচলে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার জন্য ‘কোয়াড’ নামে (Quadrilateral security Dialogue) একটি নতুন জোট সৃষ্টি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত নবগঠিত কোয়াডের সদস্য। এতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠবে বলে চীন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। কারণ এতে প্রশান্ত মহাসাগরের এক প্রান্ত থেকে আফ্রিকা মহাদেশের অন্য প্রান্তে অর্থাৎ ভারত মহাসাগরের শেষ সীমানা পর্যন্ত এক নতুন বিরোধ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এর ফলে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন বিঘ্নিত এবং বিশ্ববাণিজ্য বিপর্যস্ত হবে বলে চীনের আশঙ্কা। এর পরও যুক্তরাষ্ট্র থেমে থাকেনি, অটকটঝ নামে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যকে নিয়ে চীনকে ঠেকাতে ইন্দো-প্রশান্ত এলাকাকে কেন্দ্র করে তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এটি করে যুক্তরাষ্ট্র তার রাজনৈতিক সংকীর্ণতা ও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে বলে চীন অভিযোগ করেছে। এ চুক্তির কারণে অস্ট্রেলিয়া ১৬টি সাবমেরিন কেনার জন্য ফ্রান্সের সঙ্গে আগে পাঁচ হাজার কোটি টাকার যে চুক্তি করেছিল তা বাতিল করেছে। সে প্রস্তাবিত সাবমেরিন এখন পারমাণবিক শক্তি সমৃদ্ধ (Nuclear Powered Submarine)অবস্থায় তৈরি করবে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র, যা দক্ষিণ চীন সাগরে টহল দিয়ে বেড়াবে। এর ফলে ফ্রান্স যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তার প্রতিরক্ষা আলোচনা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। চীন বলেছে, ভূ-রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে পশ্চিমা বিশ্ব এখন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কিংবা তার সাধারণ পরিষদের ভেটো ক্ষমতাহীন সদস্যদের কোনো কিছুই করার ক্ষমতা নেই।

যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে বিগত ২০ বছর যুদ্ধ চালিয়ে গত মাসে তার সেনা প্রত্যাহার করেছে। এটিকে ভিয়েতনামের পর যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি পরাজয় বলে অনেকে আখ্যায়িত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও সিরিয়া থেকেও তাদের অবশিষ্ট সেনা প্রত্যাহার করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু তার পাশাপাশি আবার চীনকে ঠেকানোর জন্য দক্ষিণ চীন সাগর ও তার পার্শ্বর্তী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গঠন করেছে নতুন জোট। এ যেন একবিংশ শতাব্দীতে আরেক শীতলযুদ্ধের সূচনা। অথচ শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত প্যারিস জলবায়ু এবং পরিবেশসংক্রান্ত চুক্তিতে ফিরে গেছে। আবার ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তিতেও ফিরে যাওয়ার বাসনা প্রকাশ করছে। কিন্তু জো বাইডেন রিপাবলিকান দলীয় না হয়েও ভুলতে পারেননি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র—এ অভিযোগ ওয়াকিফহাল মহলের। সে কারণেই হয়তো বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে তিনি বিশ্বকে আবার দুই শিবিরে বিভক্ত করতে চান। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কোনো আলোচনায় না বসে গঠন করেছেন কোয়াড (QUAD) ও অকাস (AUKUS)।

এ অবস্থায় অত্যন্ত ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে বাস করেও এখনো নিজেকে নিরাপদ দূরতে রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বশান্তি নিশ্চিত কিংবা তা প্রতিষ্ঠার দাবিকে জোরদার করার স্লোগান নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এখন বিশ্বের করোনা পরিস্থিতি এবং আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে কথা বলা ছাড়াও তিনি জাতিসংঘে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর কী বলেন, তা শোনার অপেক্ষায় রয়েছেন অনেকে।

লেখক :  বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ দূতাবাসে নিযুক্ত সাবেক মিনিস্টার

[email protected]



সাতদিনের সেরা