kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

নারী নির্যাতন ও পাচার কমাবে পারিবারিক সম্পর্ক

রাবেয়া রাবু

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নারী নির্যাতন ও পাচার কমাবে পারিবারিক সম্পর্ক

সংজ্ঞায়নের দিক থেকে পরিবার শব্দটির কাঠামোগত বা ভাবার্থের বয়স খুব বেশি না হলেও প্রচ্ছন্নভাবে মানবসমাজে এর বিস্তৃতি পাহাড়ের গুহা থেকে অট্টালিকা পর্যন্ত, যদিও সময়ের স্রোতে এর আকার-প্রকার ও ক্ষেত্রপট দুই-ই বদলে গেছে। বাঙালি সংস্কৃতির আদি সামাজিক কেন্দ্র যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে জায়গা করে নিয়েছে একক পরিবার ব্যবস্থা। পাশ্চাত্যনির্ভর এই সংস্কৃতিতে ক্ষতি হয়েছে এখানকার শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের। আবার এটিও সত্য, এই ধারার ফলে নতুন আরেক কাঠামো শিশু সদন, ছোটমণি নিবাসসহ বয়স্কদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম নামের নতুন কাঠামো গড়ে উঠেছে।

বিগত ১০ বছরের সামাজিক-পারিবারিক কাঠামো নিরীক্ষণে স্পষ্ট, যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভাঙার সঙ্গে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের আক্রান্তের হার প্রায় সমানুপাতিক। অর্থাৎ যে হারে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙেছে, ঠিক সে হারেই তাদের ওপর নির্যাতন বেড়েছে। আর এই হার সবচেয়ে বেশি নগরকেন্দ্রিক একক পরিবার ব্যবস্থাগুলোতে।

এই একক পরিবার ব্যবস্থার কারণে ছোটদের মাঝে এক ধরনের ‘স্নেহ-সংস্পর্শহীন’ শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। মা-বাবার ক্যারিয়ার কিংবা ইন্টারনেট ব্যবস্থায় ব্যস্ততার কারণে সন্তানরা প্রায় অভিভাবকহীন সময়ে বেড়ে উঠছে। ফলে শৈশব-কৈশোরে সহজেই ‘ফেমাস ফ্যান্টাসিজম’-এর মতো ফাঁদে আক্রান্ত হচ্ছে। এই জায়গাটিকেই সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে চক্র। কিছুদিন আগে চলচ্চিত্রজগতের এক নৃত্য পরিচালকের কথা জানা গেছে, যিনি গ্ল্যামারজগতের ফাঁদে ফেলে নারী পাচার করেছেন।

প্রফেশনালি তাঁকে অবিশ্বাস করারও কোনো উপায় ছিল না। কারণ নৃত্য পরিচালনায় তিনি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। ধরা পড়ার পর জানা যায়, এই ব্যক্তি বেশ কিছু উঠতি বয়সের নারীকে বিদেশে পাচার করেছেন, যাদের ভাগ্য এখন জাহান্নামের মতো। পত্র-পত্রিকা মারফত এই নারীপাচারের পরিসংখ্যান নিরীক্ষণে দেখা যায়, নিখোঁজ হওয়া বেশির ভাগ নারীই উঠতি বয়সের। আরেকটি অংশ প্রবাসীদের স্ত্রী।

এখানেই যৌথ পরিবার ব্যবস্থা কিংবা বাঙালি সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা। কারণ এখানকার সমাজব্যবস্থায় বাইরের জগৎ কিংবা কৈশোরের পরিবর্তিত শরীর সম্পর্কে যে প্রাথমিক জ্ঞান তা বাড়ির বড়দের কাছ থেকে জানত। শহুরে সংস্কৃতির থাবায় সেই পারিবারিক আবহে শেখার সুযোগ নেই। অসুস্থ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় সন্তানরা চলে গেছে অজানা সংস্পর্শে। উঠতি কৈশোর-যৌবনে কোথায় থামতে হবে এমন পরামর্শ মিলছে না।

এ ছাড়া লিঙ্গবৈষম্যের বিষয়টি তো আছেই। ট্র্যাজেডি হলো, আধুনিক কিংবা উত্তরাধুনিকতার মুখোশ পরলেও আজও এখানে কন্যাসন্তানের জন্ম অনেককে আনন্দিত করে না। একেবারে শুরুর সেই অবহেলা ও বিষণ্নতা তাকে নতুন জগৎ বা আশ্রয়ের অন্বেষণে অগ্রসর করে। এই শূন্যতাগুলো পূরণে পারিবারিক আবহের জাগরণ জরুরি।

এ ক্ষেত্রে বয়স্কদের বৃদ্ধাশ্রমের মতো বিদেশি প্রথা গ্রহণ না করে তাঁদের জন্য শিশুদের মতো স্টেডিয়াম, পার্ক কিংবা আনন্দদায়ক উদ্ভাবনী ব্যবস্থার আয়োজন করা যেতে পারে। সেখানে তাঁরা বাড়িতে থেকেই আনন্দ কিংবা সময় পার করবেন এবং বেলা শেষে ঘরে ফিরবেন। এসব ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একদিকে রিটায়ার্ড মানুষগুলোর শেষ সময়টা যেমন আনন্দের হবে, তেমনি শিশু, কিশোর-কিশোরীরা পারিবারিক স্নেহের সংস্পর্শে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রসিডেন্ট উইলিয়াম হেনরি হ্যারিসন বলেছেন, ‘সরকারের কাজগুলোর মধ্যে শোভনীয় ও মর্যাদাপূর্ণ একটি হলো—শুধু সহ্য করা নয়, বরং উৎসাহিত করাও।’ সে হিসেবে জীবননদীতে সর্বক্ষণ সাঁতরে চলা এবং প্রায় ক্লান্ত এই বয়স্কদের জন্য বেসরকারি উদ্যোগেও যেন ইভেন্ট বা আনন্দমঞ্চ নির্মাণ করা যায়, সেটি উৎসাহিত করতে হবে। এটি করতে পারলেই মিটে যাবে বহু সমস্যা।

মৌখিকভাবে প্রচলিত আছে, পেটে ভাত জুটলে বিনোদনের চাহিদা জাগে। সময়ের পরিসংখ্যানে দেশ এখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ সোপানগামী। কাজেই এখানকার মানুষের এখন নতুন নতুন চাহিদার সূচনা ঘটবে। এসব বাঙালি সংস্কৃতি দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে এবং তা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য, সংস্কৃতি মানে এখনো অনেকে শুধু গান-বাজনা বোঝেন! কিন্তু আসলে সংস্কৃতি মানে পুরো জীবনের যাপন। তাই বাঙালি সংস্কৃতির পারিবারিক আবহকে আবারও সামনে নিয়ে আসা জরুরি, যেখানে মা-বাবাসহ পরিবারের সবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক ও সংস্পর্শ থাকবে। এতে কমে আসবে নারী নির্যাতন ও পাচার।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক



সাতদিনের সেরা