kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন আশার আলো

মো. জাকির হোসেন

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন আশার আলো

জাতিসংঘের মতে, এই গ্রহের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা। আর আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা মেডিসিনস স্যান ফ্রন্টিয়ারস বলছে, পৃথিবী থেকে বিলুপ্তপ্রায় আদিগোষ্ঠীর তালিকায় ভয়াবহ অবস্থানে রয়েছে রোহিঙ্গারা। আজকের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের রয়েছে গৌরবময় অতীত। রোহিঙ্গাদের স্বাধীন রাজ্য ছিল। রাজ্যের আদি নাম ছিল আরাকান। যেমন—মিয়ানমারের আদি নাম ছিল বার্মা। আরাকান ছিল বরাবরই স্বাধীন ও অতিশয় সমৃদ্ধ একটি দেশ। বাংলার প্রাচুর্যের কারণে যেমন এখানে ইউরোপীয়দের আগমন ঘটে, তেমনি আরাকানেও পর্তুগিজ ও ওলন্দাজদের আগমন ঘটে। ওলন্দাজরা আরাকান থেকে দাস ও চাল ক্রয় করত। আর তারা সেখানে নিয়ে আসত লোহা ও লৌহজাত সামগ্রী। আরাকানের মুসলমানরা বার্মিজ মগদের চেয়ে সুপ্রাচীন। বর্মিদের কয়েক শ বছর আগে থেকে সেখানে মুসলমানদের বসবাস। সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। অন্যদিকে দশ কিংবা বারো শতকের আগে বর্মি অনুপ্রবেশ ঘটেনি। সেই হিসাবে রোহিঙ্গারা আরাকানের ভূমিপুত্র। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের আরাকান স্বাধীন রাজ্য ছিল। ১৭৮৫ সালের প্রথম দিকে মিয়ানমারের রাজা ভোধাপোয়া এটি দখল করে বার্মার (মিয়ানমার) করদরাজ্যে পরিণত করেন। রাজা ভোধাপোয়া আরাকান দখল করে বার্মার সঙ্গে যুক্ত করার আগে ১৪০৪ থেকে ১৬২২ সাল পর্যন্ত ১৬ জন মুসলিম রাজা আরাকান শাসন করেন। রাজ্য হারানোর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা শুরু হয়। ভোধাপোয়া আরাকান আক্রমণ করে ভয়ংকর নৃশংসতা চালান। সে সময় দুই লক্ষাধিক আরাকানবাসীকে হত্যা করা হয়। পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়, যাতে এ জাতির পুনরুত্থানের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ১৮২৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি বার্মা দখল করে। এরপর দীর্ঘ ১০০ বছর পর্যন্ত আরাকানিরা অনেকটা স্বস্তিতে ছিল। কিন্তু ১৯৪২ সালে আরাকান জাপানিদের অধীনে চলে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপানি সেনাদের নৃশংসতায় অনেক রোহিঙ্গা প্রাণ হারায়, রোহিঙ্গা নারীরা ধর্ষণের শিকার হয়। ১৯৪৫ সালে আবার ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করার পর নতুনভাবে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, গণধর্ষণ, নির্যাতন আর উচ্ছেদে মেতে ওঠে বর্মিরা। ১৯৮২ সালে নতুন নাগরিকত্ব আইন করে ভূমিপুত্র রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের বহিরাগত আখ্যা দিয়ে রোহিঙ্গা নামে কোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব মিয়ানমারে ছিল না বলে দাবি করছে। তার পরও মাতৃভূমির মায়ায় মাটি কামড়ে মিয়ানমারে বসবাস করছিল রোহিঙ্গারা। কিন্তু ২০১৭ সালে নির্যাতনের মাত্রা এতটাই ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছে যে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশ সরকার দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আলাপ-আলোচনা ও দূতিয়ালির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে নানাভাবে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চুক্তি হলেও মিয়ানমারের দুর্বৃত্ত সরকারের নানা প্রতারণা ও ছলচাতুরীতে একজন রোহিঙ্গাকেও আজ পর্যন্ত ফেরত পাঠানো যায়নি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র চীন ও রাশিয়ার মনোভাবের কারণে জাতিসংঘের মাধ্যমে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে খ্যাত ভারতও স্পষ্টতই মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে। মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বাংলাদেশ সরকার ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার সহায়তায় আফ্রিকার রাষ্ট্র গাম্বিয়াকে দিয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলা করিয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ছয় দফা নির্দেশনা সংবলিত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছেন। মূল মামলা শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ তালিকাভুক্ত রয়েছে। গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ইত্যাদি আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের জন্য ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯৭ সালে গৃহীত যে রোম সংবিধির আওতায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠিত হয়েছে, মিয়ানমার তার পক্ষ না হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে পারবেন কি না আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান কৌঁসুলি আদালতের কাছে জানতে চেয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করার কর্তৃত্ব আদালতের রয়েছে।

বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনার আগ্রাসন ও সম্প্রতি আফগানিস্তানে তালেবানের আবার ক্ষমতা দখলের ঘটনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি প্রায় আন্তর্জাতিক এজেন্ডার সাইডলাইনে চলে গিয়েছিল। অতীতের অভিজ্ঞতায় এমন অবস্থা নানা কারণে হতাশাজনক ও আশঙ্কারও বটে। নিজ দেশের নাগরিকদের বিতাড়ন ও আশ্রিতদের প্রত্যাবাসনে গড়িমসিসহ বেশ কিছু বিষয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে ভুটান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া ও নেপালে আশ্রয় নেওয়া লোতশাম্পা শরণার্থীদের মিল রয়েছে। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে ভুটান তার মোট জনসংখ্যার এক-ষষ্ঠমাংশ লোককে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। মিয়ানমারের নাগরিকত্ব শুদ্ধি অভিযান স্টাইলে ভুটানও জাতিগত শুদ্ধি অভিযান ‘এক জাতি, এক জনগণ’ (ওয়ান নেশন, ওয়ান পিপল) নীতি হাতে নেয়। এর ফলে দেশটিতে কয়েক শতাব্দী ধরে বসবাসরত নেপালি ভাষাভাষী মানুষ, যারা লোতশাম্পা নামে পরিচিত তারা ভয়ংকর পরিচয়সংকটের মুখে পড়ে। যেমন—পরিচয়সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে। মিয়ানমারে বসতি স্থাপনকারী রোহিঙ্গাদের পূর্বপুরুষদের মতো লোতশাম্পাদের পূর্বপুরুষরাও কয়েক শতাব্দী আগে ভুটানের দক্ষিণের নিম্নভূমিতে এসেছিল। মিয়ানমারের জান্তা যেমন নাগরিক আইন সংশোধন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়, তেমনি ভুটানেও নাগরিকত্ব আইনের সংস্কার দ্বারা লোতশাম্পাদের নাগরিক হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। নাগরিক নয় বলে রোহিঙ্গাদের মতো লোতশাম্পাদেরও রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধাগুলোতে কোনো অধিকার নেই। জাতিগত শুদ্ধিতার নামে নিপীড়নমূলক অভিযান শুরুর পরই লোতশাম্পারা সীমান্ত অতিক্রম করে চলে এসেছিল ভারতে। সেখানেও তাদের ঠাঁই মেলেনি। ভারতের সীমান্তরক্ষীরা তাদের ঠেলে দিয়েছিল নেপালে। ২৪ বছর ধরে লোতশাম্পারা শরণার্থী হয়ে নেপালের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে। ২৪ বছর ধরে ভুটান সরকারের নানা পর্যায়ের প্রতিনিধিরা নেপাল সফর করে লোতশাম্পাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বারবার আশ্বাস দিলেও একজন শরণার্থীকেও ভুটানে ফেরত নেননি। ২৪ বছর নানা টালবাহানার পর ভুটান সরকার শরণার্থী সমস্যা আরো দীর্ঘায়িত করার কৌশল হিসেবে যখন নেপালকে জানায় যে জনগণের প্রতিনিধিরা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন এটি স্পষ্ট হয়ে যায় শরণার্থীদের ফেরার আশা তলানিতে ঠেকেছে। অবশেষে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আন্তরিক প্রচেষ্টা শুরু করে লোতশাম্পা শরণার্থীদের তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসনের জন্য। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী শরণার্থীদের শতকরা এক ভাগেরও কম তৃতীয় দেশে পুনর্বাসিত হয়। এদিক থেকে নেপালের ভুটানি উদ্বাস্তুদের জন্য তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন কর্মসূচি খুবই ব্যতিক্রম। জাতিসংঘ কার্যালয়ের হিসাব মতে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ১১ হাজার লোতশাম্পা শরণার্থী যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেয়েছে। তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসনের পরও নেপালে আট হাজার ৫০০ ভুটানি শরণার্থী রয়েছে। ঝাপা জেলার ক্যাম্পের এই আট হাজার ৫০০ শরণার্থীর জন্য কোনো বিকল্প খুঁজে বের করতে পারেনি নেপাল সরকার ও ইউএনএইচসিআর। নেপালে থেকে যাওয়া শরণার্থীদের কেউ কেউ ভুটানে ফিরে যেতে চায়। অনেকে যুক্তরাষ্ট্র কেন, ভুটান বাদে পৃথিবীর কোথাও যেতে রাজি নয়। তাদের স্বপ্ন একটাই, মাতৃভূমিতে ফেরা। বিশ্বাস করে, জীবদ্দশায়ই সমাধান ঘটবে এবং তাদের ফেরানোর জন্য ভুটান তার সীমান্ত খুলে দেবে। ওখানকার সঙ্গে তাদের নাড়ির সম্পর্ক। মনে করে, ওটিই তাদের দেশ; কায়মনে প্রার্থনা করে মৃত্যুটা যেন ভুটানে গিয়ে হয়। আবার অনেকে নেপালেই থেকে যেতে আগ্রহী। নেপালের সঙ্গে ভুটানি শরণার্থীদের সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও ধর্মীয় বেশ মিল আছে। ঝাপা ক্যাম্পের লোতশাম্পা শরণার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেপালি নাগরিকদের বিয়ে করেছে। তাদের সন্তানও রয়েছে। ইউএনএইচসিআর কর্মকর্তাদের মতে, ভুটানেই উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবাসনের চেষ্টা চললেও এটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা অবশিষ্টদের নেপালি সমাজে আত্তীকরণের কথা বলছে আকারে-ইঙ্গিতে। ইউএনএইচসিআর বলছে, তারা (ভুটানি শরণার্থীরা) সুশিক্ষিত, কঠোর পরিশ্রমী এবং নেপালি সমাজে পুরোপুরি অবদান রাখতে প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইশারা-ইঙ্গিতে বাংলাদেশেও রোহঙ্গািদের আত্তীকরণের বিষয়ে বলার চেষ্টা করছে, যা খুবই আশঙ্কাজনক। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক এজেন্ডার সাইডলাইনে চলে যাওয়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এক নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে। মিয়ানমারে নির্বাচিত সরকারকে উত্খাত করে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা কুক্ষিগত করায় এর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় ঐক্য সরকার (ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট—এনইউজি) গঠিত হয়েছে। জাতীয় ঐক্য সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দুআ লাসি লা বলেছেন, ‘মিয়ানমারে কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নের দায় পুরোপুরি ওই দেশের সামরিক বাহিনীর।’ জাতীয় ঐক্য সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আরো বলেছেন, বিগত দশকগুলোতে রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত সব ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ দায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর। রোহিঙ্গা নিপীড়নের জবাবদিহির ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্য সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বলেছেন, এটি গুরুতর সব অপরাধের হোতাদের জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করবে। জাতীয় ঐক্যের সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) লিখিতভাবে জানিয়েছে যে তারা মিয়ানমারের ওপর আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার মেনে নেবে। জাতীয় ঐক্য সরকার শুধু ওষ্ঠ সেবা নয়, এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রেজিস্ট্রারের কাছে একটি ঘোষণাপত্র জমা দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আইসিসির রোম সংবিধির ১২(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ২০০২ সালের ১ জুলাই (রোম সংবিধি কার্যকর হওয়ার তারিখ) থেকে সামরিক বাহিনীর সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক এখতিয়ার জাতীয় ঐক্য সরকার মেনে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পাশাপশি আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার দায়ের করা রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায়ও জাতীয় ঐক্য সরকার মিয়ানমারের প্রতিনিধিত্ব করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জাতীয় ঐক্য সরকার রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারের সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত দিয়েছে। তারা বলেছে, ‘বর্তমানে আমাদের দেশ যে সংকটময় পরিস্থিতিতে আছে তার একমাত্র সমাধান ফেডারেল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।’ অর্থাৎ রাখাইন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ হিসেবে গণ্য হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সামরিক বাহিনীর সরকার স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিলকে স্বীকৃতি না দিয়ে যদি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্য সরকারকে স্বীকৃতি দেয়, তবে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আদালত, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবে জাতীয় ঐক্য সরকার। তবে এরূপ স্বীকৃতি দেওয়ার আগে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের শর্ত আরোপ করতে হবে। কোনো সরকার বা রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে শর্ত যুক্ত করা আন্তর্জাতিক আইনে পুরোপুরি বৈধ। জাতীয় ঐক্য সরকারকে স্বীকৃতির আগে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে, বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে লিখিত সম্মতি বা চুক্তির একটি রূপরেখা তৈরি করা আবশ্যক। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতীয় ঐক্য সরকার সম্মত থাকলে চীন ও রাশিয়ার ভেটো কোনো বাধা হতে পারবে না। উপরন্তু গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের পথও সুগম হবে। জাতীয় ঐক্য সরকারকে স্বীকৃতি দিলে সেটি হবে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। এই সিদ্ধান্ত সামরিক একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এসিড টেস্ট তারা জাতীয় সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করতে চায়, না গোপনে সামরিক সরকারের দোসর হয়ে রোহিঙ্গা সংকটকে দীর্ঘায়িত কিংবা অনির্দিষ্টকালের জন্য অমীমাংসিত রেখে নাজায়েজ ফায়দা হাসিল করতে চায়।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]



সাতদিনের সেরা