kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৮। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৩ সফর ১৪৪৩

শুভ জন্মদিন

মঙ্গলময় আগামীর স্বপ্নচারী

সৌমিত্র শেখর

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মঙ্গলময় আগামীর স্বপ্নচারী

বিশিষ্ট ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্রগবেষক, চিন্তক ও প্রাবন্ধিক আহমদ রফিক ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার সাহবাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। আজ তাঁর জন্মদিন। প্রিয় পাঠক, আসুন, আহমদ রফিকের উদ্দেশে বলি : শুভ জন্মদিন। তিনি যেন নীরোগ ও সচলভাবে দীর্ঘায়ু লাভ করেন, এই প্রার্থনাও করি।

বিচিত্র জীবনের অধিকারী এই মানুষ। দেশভাগের বছর (১৯৪৭) নড়াইল মহকুমা হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চিত্রা নদীর স্বচ্ছ জলধারা আর দুধারে বসবাসরত মানুষের সংস্পর্শে তাঁর মানসলোকে অসাম্প্রদায়িকতার বীজ উপ্ত হয় সেই বিভাজনের কালেও। প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয়শংকর, সাহিত্যিক নীহাররঞ্জন গুপ্ত, কবিয়াল সম্রাট বিজয় সরকার, গণমানুষের চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জন্মস্থান নড়াইলের মাটি তাঁকে দেয় শিল্প-সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ। বিক্রমপুরের হরগঙ্গা কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হয়ে আহমদ রফিক স্বপ্ন দেখেন ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করার। কলেজের অধ্যাপক অরবিন্দ পোদ্দারের সঙ্গে বিক্রমপুরের রাস্তায় বিকেলে হেঁটে হেঁটে তিনি বিপ্লবের মন্ত্র লাভ করেন। অরবিন্দ পোদ্দারের জন্ম বাংলাদেশের শ্রীহট্টে, আজ যেটি সিলেট। তাঁর পিতা রাধাগোবিন্দ পোদ্দার। তিনি স্কুলজীবনের লেখাপড়া করেছেন ময়মনসিংহে। কর্মসূত্রে বাংলাদেশের কয়েকটি জায়গায় যুক্ত থাকার পর কলকাতায় কয়েকটি কলেজ ও পরে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তবে ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন বামপন্থী এবং সে কারণে একাধিকবার তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। কারাবরণের কারণে তাঁর লেখাপড়ার ধারা ব্যাহত হলেও তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পণ থেকে সরে যাননি। অসংখ্য অনুরাগী সৃষ্টি করেছিলেন অরবিন্দ পোদ্দার। তাঁর রচিত ‘বঙ্কিম-মানস’ গ্রন্থের ছায়ায় মুনীর চৌধুরী লেখেন ‘মীর-মানস’। আহমদ রফিকও অরবিন্দ পোদ্দারের আদর্শের ছায়ায় শীতল হয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালে আহমদ রফিক হরগঙ্গা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ভর্তি হন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে। এরই মধ্যে শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। এতে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন আহমদ রফিক। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে একদা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী এই মানুষটি এই আন্দোলন সম্পর্কে বলেছেন : ‘আটচল্লিশ থকে বাহান্নর তরুণ প্রজন্ম বিশেষত ছাত্রসমাজ মাতৃভাষা বাংলার অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে, দাবি জানায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী সব। তারা বুঝতে পারে দেশের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হলে বাঙালি জাতির উন্নতির সম্ভাবনা নেই। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সে দাবি মানতে নারাজ।  তাই তাদের আন্দোলনে নামতে হয়। সে আন্দোলনে যোগ দেয় ছাত্র নয়, এমন সব তরুণও, সব কিছু দেখে এগিয়ে আসে সাধারণ মানুষ। আন্দোলন এভাবেই জমজমাট হয়ে ওঠে। পুলিশের গুলিতে রক্ত ঝরে, শহীদ হন অনেকেই। ওই আন্দোলনের জেরে ১৯৫৬ সালে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে মেনে নেয় পাকিস্তান সরকার। এই ভাষা আন্দোলনের জের ধরে গণ-আন্দোলন শুরু, শেষ পর্যন্ত একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ।’ (—‘রাষ্ট্রভাষার লড়াই’) এভাবেই ভাষার লড়াই গণ-আন্দোলনে পর্যবসিত হয় এবং সেই ধারায় অর্জিত হয় বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে ভাষার প্রার্থিত মর্যাদা লাভ না হওয়ায় তাঁর বক্তব্য : ‘তাই বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না কেন একুশের চেতনা তার পরিপূর্ণ চরিত্রে বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে উঠেছে এবং উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞানশিক্ষাসহ শিক্ষার সর্বস্তরে মাতৃভাষার ব্যবহার আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ ও জাতির স্বার্থে আমরা চাই না শিক্ষার্থী সমাজ-বিভক্ত হোক, চাই না নিম্নবিত্তদের সুযোগ-সুবিধা সংকুচিত হোক। আমরা চাই বৈষম্যহীন শিক্ষানীতি, যা একুশের চেতনার আলোকে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার পথ খোলা রাখবে।’ (—প্রাগুক্ত) তাঁর এই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হোক, এটাই আমাদের কামনা।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় লেখাপড়ায় কিছু সময় তাঁর অতিরিক্ত ব্যয় হয়। তাই ১৯৫৮ সালে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে নিতে হলে যে শিক্ষানবিশি পরীক্ষা দিতে হয়, সেটিতে তিনি বসেননি। সাহিত্যকর্মকে তিনি তাঁর পেশা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। লিখেছেন বিভিন্ন শ্রেণির গ্রন্থ। এর মধ্যে কবিতার বই : নির্বাসিত নায়ক (১৯৬৬), বাউল মাটিতে মন (১৯৭০), রক্তের নিসর্গে স্বদেশ (১৯৭৯), বিপ্লব ফেরারী তবু (১৯৮৯), পড়ন্ত রোদ্দুরে (১৯৯৪), ভালোবাসা ভালো নেই (১৯৯৯), মিশ্র অনুভূতির কবিতা (২০১৯) উল্লেখযোগ্য। তাঁর কবিতায় আছে মেহনতি মানুষের প্রতি পক্ষপাত, সাম্যবাদের প্রতি আগ্রহ আর ভালোবাসার ঈষদুষ্ণতা। সময়কে তিনি জয় করে প্রণয়িণীর কাছে ফিরে আসতে চেয়েছেন। প্রথম জীবনে তিনি ছোটগল্পও লিখতেন। ১৯৬৬ সালে বের হয়েছিল ছোটগল্পগ্রন্থ ‘অনেক রঙের আকাশ’। এই গল্পগ্রন্থে মানুষের চিন্তার বিস্তার আর ভিন্নতা স্বীকার করেও মানসিক ঐক্যের যে সূত্রসন্ধান করা হয়েছে, তাই যেন গণতন্ত্রের মূলকথা, যে কথা আহমদ রফিক তাঁর লেখা ছোটগল্পের মাধ্যমে বলেছেন। তবে কবিতা-গল্পের বাইরে  তিনি প্রবন্ধ-গবেষণায় সিদ্ধজন। একজন প্রকৃত চিন্তকের মতো সময় ও সমাজের বিভিন্ন বাঁকফেরাকে তিনি লক্ষ করেন এবং প্রগতিমুখী অগ্রসরমাণতার কথা বলেন। তাঁর রচিত প্রবন্ধ-গবেষণার কয়েকটি বইয়ের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে : শিল্প সংস্কৃতি জীবন (১৯৫৮), আরেক কালান্তরে (১৯৭৭), রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ (১৯৮৭), ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও তাৎপর্য (১৯৯১), জাতিসত্তার আত্মঅন্বেষা : বাঙালি বাংলাদেশ (১৯৯৭), বাংলাদেশ জাতীয়তা ও জাতিরাষ্ট্রের সমস্যা (২০০০), রাজনীতির স্বদেশ বিদেশ (২০১১), দেশভাগ : ফিরে দেখা (২০১৪), সংঘাতময় বিশ্বরাজনীতি (২০১৭) ইত্যাদি। এসব বইয়ে আহমদ রফিক সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি, স্বদেশ, বিদেশ ইত্যাদি—সব কিছু নিয়ে সুচিন্তিত ব্যাখ্যা ও মত প্রদান করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ওপর তাঁর রচিত অন্তত ছয়টি গ্রন্থ রয়েছে। এসব বইয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্য নিয়ে যত না আলোচনা করেছেন তার চেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন পূর্ববঙ্গের সঙ্গে রবীন্দ্র-সম্পর্ককে তুলে ধরার। এটিও জাতীয়তাবাদী চেতনা। রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের যে স্লোগান উঠেছিল পাকিস্তান আমল থেকে পরে বাংলাদেশেরও নানা সময়, এরই বিপরীতে পূর্ববঙ্গ-রবীন্দ্র সম্পর্কের সঠিক চিত্র তুলে ধরা এক ধরনের সাংস্কৃতিক লড়াই বটে। তাঁর কিছু লেখা বা প্রবন্ধ একাধিক বইয়ে যুক্ত হতে দেখা যায়, এমনকি একই বই দুই নামেও বাজারে আছে। যেমন—বিষ্ণু দে : কবি ও কবিতা (২০১০) এবং বিষ্ণু দে : চেতনালোক ও সত্তারূপ (২০২০) মূলত একই বই কিন্তু দুই নামে দুই প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে।

প্রবন্ধ-গবেষণা ছাড়াও বিজ্ঞান বিষয়ে তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখেছেন। যেমন : জীবন রহস্য (১৯৬৭), অণুর দেশে মানুষ (১৯৬৮), বিজ্ঞানের জয়যাত্রা (১৯৬৮)। আমার মনে হয়, এ ধরনের বই আহমদ রফিক আরো বেশি লিখলে ভালো হতো। বিজ্ঞানচিন্তাহীন জাতির মনোরাজ্যে বস্তুবাদী চিন্তার বিস্তার ঘটাতে এ ধরনের বইয়ের প্রয়োজন অনেক বেশি। মানবজীবনের রহস্য যেকোনো অলৌকিকত্বে নয়, বস্তুর গঠন যে অণু-পরমাণুতে, বিজ্ঞান যে বিচিত্রমুখী অভিযাত্রায় অগ্রসরমাণ এসব তরুণের মধ্যে সহজ করে তুলে ধরা হয়েছে এসব বইয়ে। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের প্রাথমিক বইগুলো রচনা করে বিজ্ঞানের প্রতি তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করাও এক ধরনের জাতীয়তাবাদী বিজ্ঞানচর্চা। আহমদ রফিক পরম জাতীয়তাবাদীর মতো সব কিছুতেই দেশচেতনাকে সর্বাগ্রে রেখেছেন আর চেয়েছেন সবার জন্য সুখময় ভবিষ্যৎ, যেখানে সম্প্রীতি আর সৌহার্দ থাকবে অনাবিল।

মঙ্গলময় আগামীর স্বপ্নচারী আহমদ রফিক দীর্ঘায়ু লাভ করুন।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা