kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ কার্তিক ১৪২৮। ২৬ অক্টোবর ২০২১। ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ইয়াসমিন হত্যা দিবস এবং কিছু কথা

স্বাতী চৌধুরী

২৪ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ইয়াসমিন হত্যা দিবস এবং কিছু কথা

২৬ বছর আগে দিনাজপুরে ইয়াসমিন নামের ১৪ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে তার লাশ গাড়ি থেকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল দুই টহল পুলিশ। ঘটনার বছর দুয়েক আগে কিশোরীটি দুমুঠো ভাতের জন্য ঢাকার এক বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন মায়ের সান্নিধ্যবঞ্চিত কিশোরীটি মাকে দেখতে অধীর হয়ে গৃহস্থকে না জানিয়ে একাই বাড়ি ফেরার দুঃসাহস করেছিল। নীলফামারীগামী গাড়িতে উঠেছিল বলে গাড়ির স্টাফরা ইয়াসমিনকে রাত ৩টায় দিনাজপুর দশমাইল মোড়ে নামিয়ে একটি চা দোকানদারের জিম্মায় রেখে অনুরোধ করে ভোরবেলা দিনাজপুরগামী গাড়িতে তুলে দেওয়ার জন্য। তখন সেই চা দোকানি বা সেখানকার কাস্টমার নয়, বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার নাম করে রাস্তার দুই টহল পুলিশ যাদের দায়িত্ব ছিল রাতের অন্ধকারে যাতে অপরাধ সংঘটিত না হয় তার নজরদারি করা, তারা তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণের পর হত্যা করে তার লাশ চলন্ত গাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়।

দিনটি ছিল ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট। ঘটনাটি জানাজানি হলে দিনাজপুরের সর্বস্তরের মানুষ ও নারী সংগঠনগুলো প্রতিবাদে মুখর হয়। তারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশ থেকে দোষীদের শাস্তির দাবি জানায়। ২৬ আগস্ট রাতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী দিনাজপুর সদর থানা ঘেরাও করে। ২৭ আগস্ট কয়েক হাজার প্রতিবাদী মানুষ বিক্ষোভ মিছিলসহ দোষীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দেয়। এ সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে সাতজন নিহত ও কয়েক শ মানুষ আহত হয়। ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে ১৪৪ ধারাও জারি করা হয়। শেষ পর্যন্ত আন্দোলন শুধু দিনাজপুরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। দুর্বার আন্দোলনের মুখে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হয়। অভিযোগ প্রমাণের পর দুই পুলিশ ও তাদের গাড়িচালকের ফাঁসির রায় হলে ২০০৪ সালে তা কার্যকরও হয়। তাই ইয়াসমিন শুধু এক নির্যাতিত কিশোরী থেকে হয়ে ওঠে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের প্রতীক। যে কারণে প্রতিবছর ২৪ আগস্ট পালিত হয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস।

কিন্তু গভীর পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয়, দুই যুগের বেশি সময় ধরে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে শুধু প্রতিবাদ ও আন্দোলনই সার হচ্ছে। কোনোভাবেই দেশের কোথাও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ হচ্ছে না, বরং ২৬ বছরে নারী নির্যাতনের ধরনে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এসিড নিক্ষেপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হলে পরে শুরু হয় যৌন নিপীড়ন ও উত্ত্যক্তকরণ, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ। চলন্ত বাসে ধর্ষণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণ। ধর্ষণের পর হত্যা। তারপর সমাজের দুষ্টক্ষত এসব ধর্ষক নারী নিপীড়ক তথ্য-প্রযুক্তির উৎকর্ষকে তাদের নিকৃষ্ট জঘন্য বর্বরতম কাজে লাগাল ধর্ষণের ছবি ভিডিও করে ইন্টারনেটে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে। গত ২৬ বছরে ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার মিছিলে যুক্ত হয়েছে কত শত নাম। ফুলের মতো ছোট্ট মেয়ে তৃষা যৌন নিপীড়কদের ধাওয়া খেয়ে পানিতে পড়ে মারা গেল। ফাহিমা, মহিমা, সীমি, রূপা, মিতু, তনু, নুসরাতসহ আরো কত নাম না জানা মেয়ে বলি হয়েছে তার সঠিক হিসাব হয়নি। দুই, তিন ও চার বছরের শিশুরাও ধর্ষকদের হাত থেকে রক্ষা পায় না। ইয়াসমিন হত্যার কাছাকাছি সময়ে ঢাকায় চার বছরের এক শিশু ধর্ষিত হলে সারা দেশ তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু শিশু ধর্ষণ আজও থামেনি। একের পর এক শিশু ধর্ষণ ঘটেই চলেছে।

ইয়াসমিন হতদরিদ্র মায়ের কন্যা ছিল। মেয়েকে পেটভরে খাওয়ানোর সামর্থ্য ছিল না বলে মা তাকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন গৃহকর্মীর কাজ করতে। এই বয়সের একটি মেয়ে মা-বাবার স্নেহের ছায়া ও মমতায় বড় হয়, বিকশিত হয়। কিন্তু তাকে মাতৃস্নেহের ছায়া থেকে দূরে পরের বাড়িতে থাকতে হয়েছিল। মাকে দেখার জন্য সে রাতের গাড়িতে বাড়ি ফেরার দুঃসাহস করেছিল। আর মধ্যরাতে মহাসড়কের চা দোকানের বেঞ্চিতে বসে ছিল বলে সে দুই হায়েনার খোরাক হয়ে গেল!

ইয়াসমিনের হত্যাকারীদের তবু শাস্তি হয়েছিল। তার পরও ধর্ষণ ও হত্যার শিকার যারা তাদের বিরুদ্ধেই আঙুল ওঠে—তাদের পোশাক ঠিক ছিল না, তাদের চালচলন ঠিক ছিল না। মেয়েটি কেন নাটক করত? মেয়েটি একা একা গাড়িতে উঠেছিল কেন? প্রশাসন, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা, এমনকি আইনও যেন তৈরি অপরাধীকে বাঁচাতে। অপরাধীর প্রতি সবার গভীর সহানুভূতি। তাই বারবার পার পেয়ে যায় ধর্ষক, খুনিসহ সব নারী নির্যাতনকারী। আর নারী নির্যাতন বাড়তেই থাকে। এই মহামারিকালেও নারী নির্যাতন থেমে নেই। বিগত বছর করোনা মহামারির মধ্যেই সাভার, সিলেট, কক্সবাজার ও নোয়াখালীর সুবর্ণচরে নারীর ওপর ভয়াবহ যৌনসন্ত্রাস সংঘটিত হয়েছে। সিলেটে বরের সঙ্গে বেড়াতে আসা সদ্যোবিবাহিত তরুণীকে ছিনিয়ে নিয়ে কলেজের ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ করে ছাত্রলীগের কর্মীরা। সাভারে প্রেম প্রত্যাখ্যান করায় খুন হয় স্কুলছাত্রী নীলা। সুবর্ণচরে রাতের অন্ধকারে ঘরে ঢুকে মধ্যবয়সী নারীকে তার সন্তানদের সামনে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের দৃশ্য ধারণ করার পর তা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয় প্রভাবশালীর আশ্রয়পুষ্ট একদল গুণ্ডা। এখনো একটি অপরাধেরও বিচার হয়নি। বিচারহীনতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, নির্যাতিত নারীকে চরিত্রহীন প্রমাণ করা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই পাতায় পাতায় ধর্ষণের খবর। গ্রাম্য সর্দার, প্রভাবশালী নেতা থেকে শুরু করে বিচারকরাও সেই ধর্ষকের সঙ্গেই নির্যাতিতার বিয়ে দিয়ে দেন। একদিকে আইন হয় ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড আর বাস্তবে শাস্তির বদলে ধর্ষককে পুরস্কৃত করা হয়।

কিন্তু নারীর ওপর কেন এত সহিংসতা, ধর্ষণ? নারীকে দুর্বল করে রাখা হয় বলেই তো। তা ছাড়া দেশে পর্নোগ্রাফির অবাধপ্রবাহ, ভোগবাদের নির্লজ্জ উল্লাস, বিত্তবাসনার উন্মাদনায় সন্তানের সুশিক্ষা হয়েছে গৌণ। নষ্ট রাজনীতির ঘূর্ণিপাকে তরুণ প্রজন্ম বেড়ে উঠছে আদর্শ মূল্যবোধ ছাড়া। যার পরিণাম সম্প্রতি ঢাকার এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের নির্মম শিকার হয়ে জীবন দিতে হলো।

ইয়াসমিনকে স্মরণ করে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালন অর্থবহ হবে, যদি দেশে আর একটিও নারী নির্যাতিত না হয়। সে রকম দিন আনতে হলে আগে নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী-পুরুষের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে ঘরে-বাইরে সর্বত্র। শুধু নারী নির্যাতনবিরোধী আইন হলেই চলবে না, আইনের যথাযথ প্রয়োগও করতে হবে। এ ব্যাপারে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে সবাইকে। তার আগে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। নারী কোনো ক্ষেত্র বা বস্তু নয় যে তাকে কেউ দখল করবে। নারীর পোশাক, চলাফেরার দিকে উদ্ধত অঙ্গুলি নামিয়ে প্রত্যেক নারী-পুরুষের জীবন আচরণে বিশ্বাস স্থাপন ও অভ্যাস প্রতিষ্ঠা জরুরি যে পুরুষ যতটা মানুষ, নারী ততটাই মানুষ। সূর্যের আলোয় বা চাঁদের আলোয়, ঘরের ভেতরে বা রাজপথে নারী-পুরুষের অধিকার সমান সমান। কোনো নারী স্বল্পবসনে বা খোলা জায়গায় বা একা থাকলেই তাকে কোনো পুরুষের ধর্ষণ করার অধিকার জন্মায় না। যারা এ রকম মনে করে তাদের এ বিশ্বাস ও প্রবণতা পরিবর্তনের জন্য রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তি—সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, নারীর প্রতি সংঘটিত অপরাধের দায় কেউই এড়াতে পারে না।

 লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা

 



সাতদিনের সেরা