kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

বাঙালির শোকের শ্রাবণ

গোলাম কবির

৬ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাঙালির শোকের শ্রাবণ

মানুষ জীবনসায়াহ্নে পৌঁছার আগে ভাবী জীবনের অসহনীয়তা নিয়ে ভাবিত হন খুব কম। শুধু ভোগমদমত্ততা নিয়ে নয়, বেঁচে থাকার তাগিদে কত বিচিত্র পথে তাকে ধাবিত হতে হয়। যখন সত্যি সত্যি সময় চলে আসে তখন ভেবেও কূল পাওয়া যায় না। যাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন : ‘ছায়ার মতন মিলায় ধরণি,/কূল নাহি পায় আশার তরণী,।’

তাই যাওয়ার আগে ‘পূর্বাচলের পানে’ তাকিয়ে ‘অস্তাচলের ধার’ এসে রচনা করেছিলেন ‘শেষ লেখা’। কাব্যের দ্বিতীয় সংখ্যক কবিতায় এক অমোঘ ঋষিবাক্য উচ্চারণ করেছিলেন : (৭ই মে, ১৯৪০) ‘সবচেয়ে সত্য করে পেয়েছিনু যারে। সবচেয়ে মিথ্যা ছিল তারি মাঝে ছদ্মবেশ ধরি,।’

অলংকারহীন আটপৌরে শব্দ ব্যবহারের সমন্বয়ে যে গূঢ় সত্য কবি রেখে গেছেন, তার গভীরতা উপলব্ধি আমার মতো অকবি বকলমের পক্ষে কঠিন জেনেও ভাবনার দুয়ার উন্মুক্তের জন্য সচেষ্ট।

রবীন্দ্রনাথের ‘শেষ লেখা’ কাব্যের যে পঙিক্ত দুটি উদ্ধৃত হলো, লেখা বাহুল্য, তা তাঁর সায়াহ্ন বেলার অনুভব। অথচ প্রখর যৌবনে শিলাইদহে অবস্থানকালের সীমানায় ‘নৈবেদ্য’-‘স্মরণ’-‘গীতাঞ্জলি’ ইত্যাদি রচনার উপান্তে এসে শান্তিনিকেতনে বসে লিখলেন : ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,’ কিন্তু শিলাইদহের ওই যে পরান জুড়ানো অনুভবের আকুলতা ‘আমি কেমন করিয়া জানাব’ অথবা ‘যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই’ কী অকপটে বলে গেলেন! অথচ এ সময়ে কবির একাধিক আপনজনের বিদায় তাঁকে ক্ষণিক বিমর্ষ করলেও মানবজীবনের বিপরীতমুখী দ্বন্দ্ব তাঁকে জীবনবিমুখ করতে পারেনি। অতি আপনজনের ছদ্মবেশ কবিকে পথ বিচ্যুত করেনি। জীবনের অন্তিমলগ্নে ‘রক্তের অক্ষরে’ ‘আপনার রূপ’ প্রত্যক্ষ করার পর নিজেকে চিনে পারিপার্শ্বিককে বোঝার চেষ্টা করেছেন স্পষ্ট, মানুষের ছদ্মবেশী বিচিত্র রূপ।

আমরা বলছিলাম, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’ কবিতাটির কথা। এর রচনাকাল ২৫ চৈত্র, ১৩২২ বঙ্গাব্দ, শতবর্ষেরও আগে। প্রথমে এটি গান হিসেবে ‘গীতপঞ্চাশিকা’য় স্থান পায়। তারপর গীতবিতানের ‘বিচিত্র’ পর্বের ত্রয়োদশ সংখ্যক গানে। আর সঞ্চয়িতায় ‘চির-আমি’ শিরোনামে। যাই হোক, কবিতাটির জন্মবিষয়ক খতিয়ান ব্যাখ্যা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। জীবনের সংকটপূর্ণ সময় শেষে কবি ভাবনায় যে বোধের প্রত্যয়; ‘তখন কে বলে গো, সেই প্রভাতে নেই আমি?’ বিষয়টি আমরা ফিরে দেখব।

আমরা এখনো ভাবি, পুরনো ভাবনা বাসি হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ আর প্রাসঙ্গিক কতটুকু! এর চেয়ে আত্মপ্রতারণা বেশি হয় না। কোনো ভাব নতুন নয়, আবার পুরনোও হয় না। কালের প্রবাহে নানা রূপ ধরে তা প্রকাশিত হয়। প্রকাশের প্রকরণ প্রক্রিয়ায় পার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু ভাবনা ফেলনা হয় না। রবীন্দ্রনাথ তাই চিরকালই প্রাসঙ্গিক। এই যে ‘শেষ লেখা’র দ্বিতীয় কবিতাটি আমরা উদ্ধৃত করেছি, তা পুরনো হওয়ার অবকাশ কই? আমরা সামনে থেকে যা দেখি, অনুভব করি, তার সবটাই যে অবিমিশ্র, তার প্রমাণ পাওয়া কঠিন। তবু সত্য বলে জেনে জীবন গত করি। ধর্মের নামে, মতবাদের নামে যে তেলেসমাতি করি, তার কতটুকু ধরা পড়ে? রবীন্দ্রনাথ জীবনভর বুঝেও না বোঝার ভান করে কাটিয়ে দিয়েছেন। মাঝে মাঝে কঠোর হননি তা নয়, তবে তা তিক্ততার পর্যায়ে পৌঁছেনি।

আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা, পঁচাত্তরের ঘৃণ্য নৃশংসতা, সম্প্রতি এই যে ক্যাসিনো-করোনা থেকে শুরু করে হেফাজতিদের ছায়ায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের সন্ত্রাস, উন্মাদনা—সব কিছুর মাঝে ঘাপটি মেরে ছিল সব অকল্যাণের পুরোধা বর্ণচোরা ছদ্মবেশ। প্রেমের ক্ষেত্রে ছদ্মবেশ আমরা দেখেছি বিশ্বসাহিত্যের পাতায়, সমাজে তার বহু বিস্তৃত গতিবিধি।

মুক্তিযুদ্ধে আমরা দেখেছি, অতি কাছের ছদ্মবেশী কূটকৌশল রত। বঙ্গবন্ধু মানবমুক্তির ব্রত নিয়ে পথে নামলে সেই কাছের ছদ্মবেশীরাই ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে তখতে বসার আয়োজন করেছে। আজকের দিনের ক্ষমতার পদলেহীরা ভূতের মুখে রাম নামের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নামে স্লোগান দিয়ে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির জন্য ছদ্মবেশ ধারণ করছে। তাদের পদ-পদবি আর ক্ষমতার দাপটে জনগণ বিতৃষ্ণ হয়ে উঠছে। এরা যথাসময়ে চিহ্নিত হয় না। প্রকৃত বঙ্গবন্ধুপ্রেমীরা হা-হুতাশ করে তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার কেউ নেই। সবাই চায় ক্ষমতার স্বাদ।

রবীন্দ্রনাথ এবং বঙ্গবন্ধুর অনন্তযাত্রা এই শ্রাবণে তাঁদের শারীরিক যাত্রা হলেও মানবমুক্তির চেতনা বাঙালিকে স্মরণ করতে বাধ্য করে। রবীন্দ্রনাথ মানবমুক্তির সন্ধানে নেমে সত্যকে খোঁজায় ব্যাপৃত ছিলেন। ‘মানুষের ধর্ম’ রচনায় তিনি বলেছিলেন : ‘যে মানুষ আপনার আত্মার মধ্যে অন্যের আত্মাকে ও অন্যের আত্মার মধ্যে আপনার আত্মাকে জানে, সেই জানে সত্যকে।’ এই সত্যকে সহজে নেওয়ার নিরন্তর সাধনা ছিল রবীন্দ্রনাথের; কিন্তু সে যে কঠিন! সেই কঠিনকে ভালোবেসে তিনি কিছু মানুষের মধ্যে ছদ্মবেশী রূপ দেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধু মানবমুক্তির ব্রতকে সামনে রেখে চলতে গিয়ে ছদ্মবেশীদের চিহ্নিত করার অবকাশ পাননি। তাই তাঁকে অকালে জীবন দিতে হয়েছে। বাংলার দুই মানবশ্রেষ্ঠের প্রয়াণের মাস শ্রাবণ। ‘শ্রাবণের ধারার মত পড়ুক ঝরে’ আমাদের শোকাশ্রু। যেন আমরা আমাদের সব অনবধানতার গ্লানি মুছে ফেলতে পারি এবং ঘুরে দাঁড়াতে পারি মানবমুক্তির কর্মযজ্ঞে।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ



সাতদিনের সেরা