• ই-পেপার

গণটিকা কার্যক্রম সফল করতে সবাই টিকা নিন

  • আ ব ম ফারুক

বহুমুখী ফসল : টেকসই কৃষির নতুন দিগন্ত

ড. মুহাম্মাদ আব্দুল হামিদ মিয়া

বহুমুখী ফসল : টেকসই কৃষির নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা বহুমুখী সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের সম্মিলিত একটি ক্ষেত্র, যেখানে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদের সঠিক ব্যবহারের বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে জমির সীমাবদ্ধতা, পানির সংকট, লবণাক্ততা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যমান কৃষিপদ্ধতি থেকে প্রত্যাশিত ফলন অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। অথচ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত কিছু চাষাবাদ পদ্ধতি এবং গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা গেলে একই জমি থেকে অধিক উৎপাদন, অতিরিক্ত আয় এবং পতিত জমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।

এই প্রেক্ষাপটে ফসলবিন্যাস, মিশ্রচাষ, বিনা চাষে আবাদ এবং স্থানীয় উদ্ভাবনী কৌশলের সমন্বিত প্রয়োগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পাশাপাশি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, সম্প্রসারণ সংস্থা এবং কৃষকদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয়ের অভাবও অনেক সম্ভাবনাময় প্রযুক্তির বিস্তারকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই কৃষির টেকসই উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এসব সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের অনেক এলাকায় এখনো আমন ধান কাটার পর জমি চাষ করে সরিষা আবাদ করা হয় এবং সরিষা সংগ্রহের পর পুনরায় জমি কর্দমাক্ত করে বোরো ধানের চারা রোপণ করা হয়। এতে আউশ বা পরবর্তী আমন মৌসুমের আগে দুটি ফসল পাওয়া গেলেও বোরো ধানের ফলনের যে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি তৈরি হয়, তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নজরের বাইরে থেকে যায়। মূলত প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবই এই সমস্যার প্রধান কারণ। পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার চলনবিল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই পদ্ধতি প্রচলিত। প্রথম পর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে বোরো ধানের চারার বয়স ৫০ দিনের বেশি হলে প্রতি হেক্টরে প্রতিদিন প্রায় ৬০ কেজি করে ফলন কমে। সেই হিসাবে পুরো এলাকায় মোট উৎপাদনের ক্ষতির পরিমাণ সহজেই অনুমান করা যায়।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্তপ্রবণ জেলাগুলোতে বিনা চাষে গম, মুগ ও সরিষা উৎপাদনের সম্ভাবনা সম্পর্কে অনেকেই অবগত নন। অস্ট্রেলিয়ার এসিআইএআরের অর্থায়নে এবং ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার তত্ত্বাবধানে ড. নিয়োগীর নেতৃত্বে বাগেরহাট জেলায় সাম্প্রতিক এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, আমন ধানের জমিতে রিলে পদ্ধতিতে বিনা চাষে সরিষা আবাদ লাভজনক।

এই গবেষণায় আরো দেখা গেছে, জমিতে ফসল থাকলে গাছের ছায়ার কারণে মাটির পানি বাষ্পীভবনের হার কমে। ফলে অনাবাদি জমির তুলনায় মাটির লবণাক্ততা প্রায় ৪ ডিএস/মিটার পর্যন্ত কম থাকে। লবণাক্ত জমিতে বিনা চাষে ফসল উৎপাদনের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এর অর্থ হলো, রবি মৌসুমে ধান ছাড়া অন্যান্য দানাদার ফসল ও বিশেষ করে পত্রবহুল সবজি বিনা চাষেই উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বোরো ধান আবাদ প্রসঙ্গে আরো দেখা যায়, বোরো ধান কাটার পর অনেক জমি রোপা আমনের জন্য দীর্ঘ সময় পতিত থাকে। কিছু এলাকায় সীমিত পরিসরে রোপা আউশ চাষ হলেও তা খুবই কম। এই অবস্থায় আগাম বোরো ধান চাষ করে তা কাটার পর আগের মতো বৃষ্টিনির্ভর আউশ ও আমন একসঙ্গে বোনা যেতে পারে। এতে আউশ আগে পরিপক্ব হবে এবং তা কেটে নেওয়ার পর আমনগাছ রেখে দেওয়া যাবে, যা পরে পূর্ণাঙ্গ ফসলে পরিণত হবে। ফলে জমি পতিত থাকবে না। উফশী ধান প্রবর্তনের আগে এই পদ্ধতিই প্রচলিত ছিল। ভবিষ্যতে সেচনির্ভর বোরো চাষ ব্যাহত হলে এই পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, অর্থাৎ বোরো মৌসুমে বিকল্প ফসল চাষের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আখ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হলেও এটি সাধারণত এককভাবে চাষ করা হয়। যদিও আখের সঙ্গে সাথি ফসল চাষের প্রযুক্তি অনেক আগেই উদ্ভাবিত হয়েছে, তবু দীর্ঘ সময় জমি দখল করে রাখার কারণে এবং ধানের মতো প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদিত না হওয়ায় কৃষকরা একক আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে আখের আবাদ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ সুগারক্রপ রিসার্চ ইনস্টিটিউট আখের জমিতে বোরো ও আউশ ধানকে সাথি ফসল হিসেবে চাষের একটি কার্যকর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এতে আখের ফলন কমেনি, বরং একই জমি থেকে ধান উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় কৃষকের খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়েছে। সাধারণত আখের জমিতে সেচ দেওয়া হয় না, কিন্তু বোরো ধানের জন্য এডব্লিউডি পদ্ধতিতে সেচ দেওয়ায় আখের ফলনও স্বাভাবিকের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এই প্রযুক্তি আখ চাষিদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

একইভাবে তুঁতগাছের জমিতে অন্য ফসল চাষের সম্ভাবনা নিয়েও আগে তেমন ধারণা ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ সেরিকালচার রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, তুঁতগাছের সারির দূরত্ব সমন্বয় করে ফাঁকা জায়গায় পেঁয়াজ, রসুন, আলু, ডাল, তৈলবীজ, মিষ্টিকুমড়া ও অন্যান্য সবজি চাষ করে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব।

বাংলাদেশে কৃষি গবেষণার একটি প্রচলিত ধারা হলো, নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণের আগে ফসল কর্তন ও পর্যালোচনা সভায় বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে বাস্তবে সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তাদের পক্ষে পুরো সময় উপস্থিত থাকা সম্ভব হয় না। ফলে গবেষণার ফলাফল মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বা অঙ্গীকার অনেক সময়ই পাওয়া যায় না। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সক্রিয় ও ধারাবাহিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। গবেষণার শুরু থেকেই প্রতিটি ধাপে তৈলবীজ, ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খামার ও সংস্থাগুলোকে, বিশেষ করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এতে তাঁরা প্রযুক্তি সম্পর্কে বাস্তব ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করবেন এবং মাঠ পর্যায়ে তা প্রয়োগে আগ্রহী হবেন।

সব শেষে বলা যায়, বাংলাদেশের কৃষিতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে উৎপাদন বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে তা উন্নত প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে রূপান্তর করা অপরিহার্য। একই জমিতে বহুমুখী ফসল উৎপাদন, বিনা চাষে আবাদ, মিশ্রচাষ ও সাথি ফসলের সমন্বিত প্রয়োগ শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, বরং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার, খরচ হ্রাস এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পাশাপাশি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ এবং কৃষকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও জ্ঞান বিনিময় নিশ্চিত করা না গেলে এসব সম্ভাবনাময় প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব নয়। তাই মাঠ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সময়োপযোগী প্রযুক্তি বিস্তার এবং স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণই হতে পারে কৃষির টেকসই অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। এর মাধ্যমে পতিত জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনা, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ কৃষিকে আরো সহনশীল ও লাভজনক করে তোলা সম্ভব।

লেখক : ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস

সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

বুড়িগঙ্গার কান্না, সুমিদার হাসি : দুই নদীর দুই বাস্তবতা

মো. রায়হান

বুড়িগঙ্গার কান্না, সুমিদার হাসি : দুই নদীর দুই বাস্তবতা

সূর্য ওঠার আগেই জাপানের টোকিওর অনেক ফুটপাত এলাকার লোকজন ঝাড়ু দেয় স্বেচ্ছায়, বিনা পারিশ্রমিকে। বাড়ির বর্জ্য নির্দিষ্ট রঙের ব্যাগে আলাদা করে রাখা এখানে সামাজিক শিষ্টাচারের অংশ। নদীতে ময়লা ফেলা তো দূরের কথা, রাস্তায় থুতু ফেলাটাও এখানে চরম লজ্জার। জাপানে অধ্যয়নরত একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে এই দৃশ্যগুলো প্রতিদিন আমাকে এক গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়, আমাদের দেশে কেন এটি সম্ভব হচ্ছে না?

বিশ্বে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের গ্রাউন্ডসওয়েল প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে এক কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা আমাদের কৃষি জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস করে দিতে পারে। তাপপ্রবাহ, অসময়ের বন্যা, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ এবং ঘূর্ণিঝড়ের ক্রমবর্ধমান তীব্রতা এখন আর কোনো ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি আজকের রূঢ় বাস্তবতা। অথচ এই সংকট মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?

জাপান ১৯৯৭ সালে কিয়েটো প্রটোকলের সূতিকাগার হয়েছিল। কারণ দেশটি পরিবেশ সংকটকে রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে জাপান সরকার গ্রিন ট্রান্সফরমেশন পলিসির মাধ্যমে হাইড্রোজেন জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে বিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ করছে।

তবে জাপানের সাফল্যের মূল রহস্য সরকারের চেয়েও বেশি নাগরিকের মানসিকতায়। মোত্তাইনাই অর্থাৎ অপচয় না করার দর্শন, যা জাপানি সংস্কৃতির শিরায় মিশে আছে। টোকিওর সুমিদা নদী একসময় মারাত্মক দূষিত ছিল। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে নীতিগত দৃঢ়তা ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে আজ তা স্বচ্ছ ও প্রাণময়।

বিপরীতে, ঢাকার বায়ুমান সূচক বিশ্বের মধ্যে প্রায়ই শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় থাকে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালুসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলো আজ প্লাস্টিক ও শিল্প বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ হলেও তা এখনো আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে পরিবেশগত প্রভাব যাচাইয়ের (ইআইএ) চেয়ে অর্থনৈতিক মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নাগরিক সচেতনতার অভাবে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিগুলোও মুখ থুবড়ে পড়ছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকারে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে। বাজেটে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রায় দুই হাজার ২৪০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ।

এ ছাড়া বাজেটে পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে ইলেকট্রিক গাড়ির (ইভি) ওপর করভার কমানো হয়েছে। ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইভি আমদানিতে মোট শুল্ক ৯৩ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব অত্যন্ত সময়োপযোগী। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত আয়কর ছাড় এবং লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবটি প্রশংসনীয়।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং অন্যান্য গবেষণা সংস্থার মতে, আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বরাদ্দের প্রায় ৭৯ শতাংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি বা কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের দখলে, যেখানে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ। বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করা। কিন্তু আইইইএফের হিসাব অনুযায়ী, এই লক্ষ্য পূরণে বার্ষিক যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, বর্তমান বাজেটে তার প্রতিফলন সামান্যই।

জাপানি মডেল থেকে শিক্ষা : ১. শিক্ষা ও আচরণগত পরিবর্তন : জাপানে যেমন শৈশব থেকে পরিবেশসচেতনতা শেখানো হয়, বাংলাদেশেও প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বর্জ্য পৃথককরণ এবং প্রকৃতি রক্ষার ব্যাবহারিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা দরকার।

২. জ্বালানিনীতির আমূল পরিবর্তন : জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি কমিয়ে সেই অর্থ সরাসরি সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামের ওপর থেকে সব ধরনের অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা জরুরি।

৩. আইনের কঠোর প্রয়োগ ও কার্বন ট্যাক্স : শুধু বাজেট বরাদ্দ দিলেই হবে না, নদী-খাল দখলকারী এবং দূষণকারী ব্যক্তি-শিল্পের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে। জাপানের মতো বাংলাদেশেও পলিউটার পেজ নীতি কার্যকর করে দূষণকারীদের ওপর উচ্চহারে জরিমানা করতে হবে।

৪. জলবায়ু বাজেটের স্বচ্ছতা : প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকার জলবায়ু সংবেদনশীল বরাদ্দের কথা বলা হলেও সেই অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, তার সঠিক ট্যাগিং ও জনসমক্ষে নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করা প্রয়োজন।

৫. নগর পরিকল্পনায় পরিবেশকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে খাল, জলাশয়, উন্মুক্ত স্থান এবং সবুজ অঞ্চল সংরক্ষণকে উন্নয়ন পরিকল্পনার বাধ্যতামূলক অংশ করতে হবে।

টোকিওর সুমিদা নদীর পারে বসে যখন স্বচ্ছ জলে চেরি ফুলের প্রতিচ্ছবি দেখি, তখন বুড়িগঙ্গার কথা মনে পড়ে। যে নদী কয়েক শতক ধরে ঢাকার প্রাণ ছিল, আজ তা মৃতপ্রায়। দুটি দেশ, দুটি বাস্তবতা। পার্থক্যটা শুধু সম্পদের নয়, বরং শৃঙ্খলা, মানসিকতা ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের।

জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জন্য অস্তিত্বের লড়াই। জাপান তার পরিবেশ ঠিক করতে কয়েক দশক সময় পেয়েছে; আমাদের হাতে সেই বিলাসিতার সময় নেই। আমাদের বদ্বীপকে বাঁচাতে হলে আজই আমাদের জাপানিজ ডিসিপ্লিন আর বাংলাদেশি দেশপ্রেমের সমন্বয় ঘটাতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন স্নাতকোত্তর স্কুল

সুজুকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

সব্যসাচী ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আবদুস সাদেক

ইকরামউজ্জমান

সব্যসাচী ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আবদুস সাদেক

দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সব্যসাচী ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আবদুস সাদেক আলো-ছায়ার পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন গত ২০ জুন ৮০ বছর বছর বয়সে। কিংবদন্তি এই ক্রীড়াবিদের বিদায়ের মাধ্যমে দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের একটি বহুল আলোচিত এবং সুবর্ণময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। ক্রীড়াঙ্গন হারিয়েছে এমন এক ব্যক্তিত্বকে, যিনি ছিলেন তাঁর ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে আলোচিত, গ্রহণযোগ্য এবং অসাধারণ একজন মানুষ। তিনি ক্রীড়াঙ্গনে যুগ যুগ ধরে আলোচিত, বিশ্লেষিত হয়েছেন ইতিবাচকভাবে। সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন প্রতিধ্বনি। মানুষ সব সময় ভালোবেসে তাঁর সান্নিধ্য চেয়েছে, তাঁকে সম্মান করেছেতিনি তাঁর মানবিক গুণাবলি, আন্তরিকতা এবং অমায়িক ব্যবহারের মাধ্যমে সবাইকে নিয়ে চলতে চেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন তাঁর নিজের তুলনা।

সব্যসাচী ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আবদুস সাদেকদীর্ঘ ক্রীড়াঙ্গনের জীবনে খেলোয়াড়, কোচ, সংগঠক হিসেবে আবদুস সাদেকের বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের বিকাশে, ক্লাবের ক্রীড়াচর্চা, হকি ও ফুটবলে অসামান্য অবদান নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। তিনি নিজেই তাঁর তুলনা। একজন মানুষ ক্রীড়াঙ্গনকে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কিভাবে উপভোগ করতে পারেন খুব কাছে থেকে না দেখলে, না জানলে এটি লিখে বোঝানো মুশকিল। রেকর্ড বইয়ের সব নিছক পরিসংখ্যান থেকে মানুষ আবদুস সাদেক ছিলেন অনেক বড়। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে আবদুস সাদেক ছিলেন ক্রীড়াঙ্গনে সুস্থ জীবনবোধ, ন্যায়নীতি ও আদর্শের প্রতীক। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অনেক উঁচু একটি স্তম্ভ! দেশের ক্রীড়াঙ্গনের গৌরব। এই মানুষটি সারা জীবন ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে ভেবেছেন। ভেবেছেন ক্রীড়াচর্চার বিষয়টি।

১৯৭০ সালে আবদুস সাদেক, ইব্রাহীম সাবের, সাব্বির ইউসুফ প্রমুখ খেলোয়াড় তখন ইস্পাহানি ক্লাবের হয়ে খেলেন। এই সময়ে আউটার স্টেডিয়ামের ঘাসের মাঠে হকি লীগ ও বিভিন্ন টুর্নামেন্টের খেলা অনুষ্ঠিত হতো। এক বিকেলে খেলার পর আবদুস সাদেক ভাইয়ের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তখন ন্যাশনাল ব্যাংকের কৃতী খেলোয়াড় সাবের আলী ভাই। মনে আছে, তখন আরো উপস্থিত ছিলেন খেলোয়াড় ও কোচ আবদুস সালাম ভাই। সেই সম্পর্কে কখনো ভাটা পড়েনি। বিভিন্ন সময়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে সাদেক ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। অনেক অনুষ্ঠানে আমরা দুজন একসঙ্গে উপস্থিত থেকেছি। কথা বলতে হয়েছে অনেক সময়। সাদেক ভাইয়ের সান্নিধ্য সব সময় উপভোগ করেছি। কালের কণ্ঠের ১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ২০২৬-এর বিশেষ সংখ্যায় প্রত্যাশার পথরেখায় আমরা দুজন ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে এক পৃষ্ঠায় আমাদের মতামত ব্যক্ত করেছি। সাদেক ভাই হকি, ক্রীড়া পৃষ্ঠপোষকতা ও ক্রীড়া প্রশাসন নিয়ে মূল্যবান সুপারিশ দিয়েছেন। সম্ভবত এটি ছিল তাঁর জীবনে মিডিয়ায় দেওয়া শেষ সুপারিশ। তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। তার পরও কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক শাহজাহান কবিরের সঙ্গে কথা বলেছেন।

আমি অনেক সময় না পেরে ভালোবাসার দাবির ওপর ভিত্তি করে অনেক কথা বলেছি তাঁকে। জানি না, কখনো কখনো এই বিষয়গুলো তাঁকে ধাক্কা দিয়েছে কি না। লিখতে বসে আমি এখন অনুতপ্ত। তবে আমি নিশ্চিত তিনি বুঝেছেন আমার মন খারাপ করার কারণ। তিনি চাইলে অনেক কিছু করতে পারতেন, কিন্তু করেননি। ক্রীড়া রাজনীতির শিকার হয়ে নীরবে হকি ফেডারেশন থেকে চলে এসেছেন। ক্ষতি হয়েছে সাংগঠনিক ক্ষেত্রে হকির, বিশেষ করে মাঠের খেলার চর্চার! আবাহনী ক্লাবকে মাঠে নামানোর জন্য, (ফুটবল ও হকিতে) এই মানুষটি একসময়ে কী না করেছেন। দেখা গেল, একসময় পরিচালক হতে হলে তাঁকে মোটা অঙ্কের অনুদান দিতে হবে। আত্মমর্যাদাশীল ভদ্রলোক সেই পথে পা মাড়াননি। নীরবে সহ্য করেছেন। আমার কলামে এই বিষয়ে লিখেছিলাম। দুপুরে মোবাইলে বললেন, ইকরাম, আপনার লেখাটি পড়েছি। আপনি তো জানেন সবার পক্ষে সবকিছু সম্ভব নয়। মাঝেমধ্যে সাদেক ভাইকে ফোন করতাম তাঁর বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী। তাঁর সঙ্গে অনেক কিছুই শেয়ার করেছি। সাদেক ভাই ছিলেন আমার অভিভাবকতুল্য। তাঁকে সব সময় মিস করব। এই মানুষটি ভোলার নয়।

ছাত্রাবস্থায় সাংবাদিকতা করেছেন বাংলাদেশ অবজারভার এবং পরে বাংলাদেশ টাইমসে। টাইমসে সেই সত্তরের দশকে তাঁর স্পোর্টস রিপোর্টিং সচেতন ক্রীড়ামোদী মহলের নজর কেড়েছে।

ক্রীড়াপ্রেমী পরিবারের সন্তান আবদুস সাদেক। তাঁর ছোট ভাই বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান স্কুল ও কলেজে (আরমানিটোলা স্কুল) নিয়মিত খেলতেন। পূর্ব পাকিস্তান যুবদলের (হকি) অধিনায়কত্ব করেছেন। আহমেদ আকবর সোবহান রাইট হাফে খেলতেন। তিনি বাংলাদেশের ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে কুমিল্লার হয়ে খেলেছেন। আহমেদ আকবর সোবহানের গোলে কুমিল্লা জেলা ১৯৭৪ সালে প্রথম জাতীয় হকিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বাবা আলহাজ আবদুস সোবহান খেলাধুলা পছন্দ করতেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। খুব ভালো সাঁতারু ছিলেন। ভালো ব্যাডমিন্টনও খেলতেন। বাবা ছিলেন আইনজীবী।

আবদুস সাদেকের শুরু আরমানিটোলা স্কুল থেকে। ফুটবল, হকি, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিকসসব জায়গায় ছিল তাঁর বিচরণ। তবে হকি ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। হকিতে প্রথম বড় ক্লাব আজাদ স্পোর্টিং। সাদেক ভাই ও তাঁর বন্ধুরা মিলে মধ্যষাটের দশকের আগে কম্বাইন্ড স্পোর্টিং নামে একটি দল গঠন করেছিলেনএই দলটি ঢাকার হকি লীগে অনেক বছর শিরোপা জিতেছে।

সাদেক ভাইয়ের যে বিষয়টি উল্লেখ করার মতো, সেটি হলো হকি ও ফুটবলে ক্লাবের হয়ে কৃতিত্ব প্রদর্শন ছাড়াও কোচ হিসেবেও ক্লাবকে শিরোপা জয়ের স্বাদ দিয়েছেন একাধিকবার। চুটিয়ে হকি খেলেছেন পাকিস্তানের পক্ষে আন্তর্জাতিক হকি। খেলেছেন আন্তর্জাতিক যুব হকি। স্বাধীন বাংলাদেশে আবাহনী ক্লাবের প্রথম ফুটবল এবং হকি অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে ভারতের নয়াদিল্লিতে প্রথমবার দল খেলতে গেছে। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম এশিয়ান গেমসে অংশ নেয়সেই দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন আবদুস সাদেক। সংগঠক হিসেবে প্রথমবার ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮২ সালে এশিয়ান কাপ হকিতে (পাকিস্তান) এবং ১৯৮৬ সালে সিউলে দশম এশিয়ান গেমসে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ ছিলেন। একসময় বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

ফুটবল খেলেছেন প্রিয় দল আবাহনী ছাড়াও ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ও দিলকুশা স্পোর্টিংয়ে। তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তিনি নীতির প্রশ্নে কখনো আপস করেননি।

১৯৬৭ সালে পেয়েছেন ব্লু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির সেরা ফুটবলার এবং ১৯৭৭ সালে বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ হয়েছেন। ১৯৯৬ সালে পেয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার।

আমরা আবদুস সাদেক ভাইয়ের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে তিনি সব সময় অমর হয়ে থাকবেন।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া

অবকাঠামো চাকচিক্যের চেয়ে মানবদক্ষতা জরুরি

অজেয় রোহিতাশ্ব আল্-কাযী

অবকাঠামো চাকচিক্যের চেয়ে মানবদক্ষতা জরুরি

বাংলাদেশ কি শুধু মেট্রো রেলে চড়ে, পদ্মা সেতু পেরিয়ে আর বাইরের আলোতে ঝলমল করা উন্নয়নের তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে থাকবে, নাকি এমন এক সমাজ গড়বে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের দক্ষতা ও জীবনমান সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের হবে? আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটিই। আমাদের সমস্যা আদৌ জটিল নয়, এটি আমাদের আত্মসন্তুষ্টি, অসংখ্য বিচ্ছিন্ন ও অদূরদর্শী পরিকল্পনা এবং সনদপত্রের প্রতি অন্ধবিশ্বাসের বিষাক্ত ফসল। দক্ষতার চেয়ে সার্টিফিকেটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার এই মানসিকতা না বদলালে আমরা চিরকাল এক অভিশপ্ত মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে থাকব, যেখানে প্রবৃদ্ধির সংখ্যা হয়তো বা চোখ ধাঁধাবে, কিন্তু মানুষের জীবন বদলাবে না।

দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক চুং-হি মডেলের দিকে যদি তাকাই, পার্ক শুধু কারখানা বানাননি। তিনি বুঝেছিলেন, শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো শিল্পোপযোগী মানুষ। তাই কোরিয়ার রূপান্তরের মূলে ছিল প্রযুক্তিগত শিক্ষা, পলিটেকনিকের বিস্তার এবং শিল্প-শিক্ষার লৌহ-দৃঢ় সংযোগ। তাদের লক্ষ্য ছিল ডিগ্রির ফুলঝুরি নয়, বাস্তব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কফোর্স তৈরি করা। ফলে তাদের শ্রমশক্তি নিম্নমূল্যের উৎপাদন থেকে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণ ঘটিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, সীমিত শিল্পভিত্তি ও বিশাল জনসংখ্যা দ্রুত কর্মসংস্থানের দাবি করেছিল। জিয়াউর রহমানের যুগে বাজারমুখী নীতি, বেসরকারি উদ্যোগ, গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রবাসী রেমিট্যান্সের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিলসেই সময়ের জন্য যা যৌক্তিক ছিল। কিন্তু সেই কর্মসংস্থানকে উচ্চ দক্ষতায় রূপান্তরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কখনোই তৈরি করা হয়নি। ঠিক এখানেই কোরিয়া ও বাংলাদেশের পথ আলাদা হয়ে গেছে। কোরিয়া কর্মসংস্থানকে দক্ষতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি করেছিল, আমরা শুধু সংখ্যা বাড়িয়েছি, দক্ষতা তৈরি করিনি।

এ কারণে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাতে বিপুল সস্তা অর্ডার পায়চোখ-ধাঁধানো সংখ্যা, কিন্তু তা স্বল্পমূল্যের, সীমিত লাভের। জনশক্তি রপ্তানিতেও আমরা অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ শ্রমিক পাঠাই। গড় রেমিট্যান্স প্রতি মাসে প্রতি কর্মীর জন্য মাত্র ২০৩ ডলার, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি লজ্জাজনক ব্যর্থতা।

তথ্যগত বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের জিডিপির অর্ধেকের বেশি আসে সার্ভিস খাত থেকে; শিল্পের অবদান প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং কৃষির অবদান প্রায় ১১-১২ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন শিল্প ও সেবা খাত। জিডিপির প্রায় ৮৩ শতাংশ শিল্প ও সেবা এই দুটি খাত থেকে এলেও ওই দুটি খাতের প্রতিটি উপখাতের মূল পরিচালন বিভাগগুলোর জন্য স্পষ্ট, ইন্ডাস্ট্রি-ডিফাইন্ড সেট স্কিল আছে?

সরকার গঠিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে পরিচালিত এনএসডিসি এই উপখাতগুলোর উন্নয়নে রত হলেও এখনো এই ইন্ডাস্ট্রি-স্পেসিফিক স্কিল আর্কিটেকচারের কার্যকর উত্তর দিতে পারেনি। এই উত্তরহীনতা বাংলাদেশের জন্য আদৌ সুসংবাদ নয়। কেননা ওষুধশিল্পের মার্কেটিং ও চামড়াশিল্পের মার্কেটিং একই ধরনের নয়। ব্যাংকের এইচআরম্যানেজারের কাজ আইটিসার্ভিস প্রতিষ্ঠানের এইচআরের কাজ মেলে না। কিন্তু আমাদের কারিকুলাম প্রায়ই একই ছাঁচে ফেলে দেয় : জেনারেল বিজনেস/ম্যানেজমেন্ট এবং প্রত্যাশা করে এক সার্টিফিকেট দিয়েই সব কাজ হবে।

মানবসম্পদ তখনই মূল্যবান, যখন দক্ষতায় রূপান্তরিত হয়, দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাশিল্প সংযুক্তি এই বাস্তবতাই প্রমাণ করে। আর সেই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই ইন্ডাস্ট্রি-পেশাজীবী-একাডেমিয়া এবং সরকারের সমন্বয়ে ন্যাশনাল স্কিল আইডেন্টিফিকেশন কমিটি (এনএসআইসি) গঠন করতে হবে, যা আমলাকেন্দ্রিক হবে না, বরং উদ্যোক্তা-পেশাজীবী-একাডেমিয়া নির্ভর হবে এবং দায়বদ্ধ থাকবে সরকারপ্রধানের কাছে।

উদ্যোক্তা-পেশাজীবী-একাডেমিয়া সমন্বয়ে ন্যাশনাল স্কিল আইডেন্টিফিকেশন কমিটি (এনএসআইসি) তৈরি  করে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে প্রথমে ১০টি উপখাতের মূল পরিচালন বিভাগগুলোর কম্পিটেন্সি ম্যাপ (গার্মেন্টস, ফার্মা, লেদার, ফুড, ব্যাংকিং, আইটি, হেলথ, এডুকেশন, কনস্ট্রাকশন, এনার্জি) তৈরি করা হবে। সেই কম্পিটেন্সি ম্যাপ অনুযায়ী একাডেমিয়া নিজের কারিকুলাম তৈরি করবে, যা মনিটর ও বাস্তবায়ন করবে ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট ব্যুরো (এনএসডিবি), যা উদ্যোক্তা-পেশাজীবী সমন্বয়ে গঠিত ব্যুরো।

আগের ব্যর্থতার কথা মাথায় রেখে এনএসডিসিকে বাংলাদেশের স্বার্থেই শুধু সমন্বয়কের ভূমিকায় রাখতে হবে। এনএসডিসি শুধু নীতি সহায়তা দেবে, কিন্তু এনএসডিবির হাতে থাকবে বাস্তবায়নের ক্ষমতা, বাজেট ব্যয়ের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহি সরকারপ্রধানের কাছে। এই ভারসাম্য না এলে আমাদের দক্ষতা উন্নয়ন চিরকাল অন্ধকারেই থেকে যাবে। বাস্তবায়নকারী হিসেবে এনএসডিবিকে আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম ও সার্টিফিকেট সুনিশ্চিত করতে হবে, যা বিদেশে গিয়ে ছাত্রদের অথই জলে ফেলবে না। তাহলেই রেমিট্যান্স টেকসইভাবে বাড়বে। এ জন্য ত্রিস্তরীয় কর্মকৌশল জরুরি।

স্বল্পমেয়াদি (১-৩ বছর) : দ্রুত রিটার্ন ও প্রবাস আয় বৃদ্ধি। মোট বাজেট জিডিপির ১ শতাংশ। ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ে ০.৭ শতাংশ১০০টি নতুন পলিটেকনিক, শর্ট কোর্সে ৫০-১০০ হাজার প্রবাসী-যোগ্য কর্মী। ইন্ডাস্ট্রি-লেড স্কিল ম্যাপিং পাইলট। ন্যাশনাল স্কিল আইডেন্টিফিকেশন কমিটি গঠন। প্রবাসী প্রস্তুতিতে ০.৩০ শতাংশ। পদ্মা ব্যারাজ, তিস্তা প্রকল্পের পাশাপাশি চীন সরকারের সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নে অংশীদারি শুরু করতে হবে।

চীন সরকারকে নিয়ে আমরা একটি নতুন যাত্রা শুরু করতে পারি। ১০টি নতুন প্রশিক্ষণকেন্দ্র, যেখানে কর্মীরা শিখবে অগ্রসরমাণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার, ডিজিটাল দক্ষতা ও স্মার্ট শিল্পায়ন। সেখানে চীনাদের করপোরেট অ্যাপ্রেনটিসশিপ মডেল চালু হবে, হাতে-কলমে কাজ শিখবে, কাজে লাগাবে। আর চীনের তিন বছরের ডিজিটাল কর্মী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৫০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী প্রশিক্ষণ পাবেতাদের সার্টিফিকেট হবে আন্তর্জাতিক, চাকরি হবে দেশে আর বিদেশে।

মধ্যমেয়াদি (৩-৭ বছর) : কাঠামোগত রূপান্তর। শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত। টেকনিক্যাল অংশ ১.১৫ শতাংশ। সরকার প্রথম দুই বছরের সিড ফান্ড দেবে; পরে ইন্ডাস্ট্রি ফিস + সিএসআর + পাবলিক গ্র্যান্টস দ্বারা টেকসই রাখবে। ৩০০ পলিটেকনিক, এক লাখ অ্যাপ্রেনটিসশিপ স্লট। আরঅ্যান্ডডি ম্যাচিং ফান্ড ০.১০ শতাংশ।

দীর্ঘমেয়াদি (৭-১৫ বছর) : উচ্চমূল্যের অর্থনীতি। শিক্ষা ব্যয় ৫ শতাংশ, আরঅ্যান্ডডি ১ শতাংশ। ইনোভেশন হাব, রিজিওনাল ইন্ডাস্ট্রি-এডুকেশন ক্লাস্টার। ফিন্যান্সিংয়ের উৎস সিএসআর, ডেভেলপমেন্ট বন্ড ও প্রবাসী বন্ড। কিন্তু সবকিছুর মূলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। স্পষ্ট তিন বছরের কর্মপরিকল্পনা, বার্ষিক মনিটরিং ও ক্ল-ব্যাক ব্যবস্থা ছাড়া কিছুই হবে না। বর্তমান শিক্ষিত বেকারত্বের সংকট রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্রের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতা ও অদূরদর্শিতার ফল। গ্র্যাজুয়েট বেকারত্ব ১৩ শতাংশের ওপরেএটি অত্যন্ত পীড়াদায়ক বাস্তবতা।

এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে  রাজনৈতিক নেতৃত্বকেসফলতা কি পরীক্ষা পাসের শতাংশ কিংবা সেতু-মেট্রো রেলের সংখ্যা দিয়ে মাপা হবে, নাকি মানুষের দক্ষতাকে প্রধান পাথেয় করে টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটবে বাংলাদেশ? মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের আগামী উন্নয়ন প্রতিযোগিতা কিন্তু অবকাঠামোতে নয়, বরং সক্ষম জনগোষ্ঠী দ্বারাই নির্ধারিত হবে।

 লেখক : প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তক

গণটিকা কার্যক্রম সফল করতে সবাই টিকা নিন | কালের কণ্ঠ