kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

আরুণির ধান জাতের সরকারি স্বীকৃতি প্রয়োজন

ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া

৩১ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আরুণির ধান জাতের সরকারি স্বীকৃতি প্রয়োজন

এ দেশে একসময় ধানের হাজার হাজার জাতের আবাদ করা হতো। এমনকি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েও শত হাজার জাতের ধান আবাদ করা হতো এ দেশে। কোনো কোনো ধানবিজ্ঞানীর মতে, এ দেশে ধান জাতের সংখ্যা ছিল ১০ থেকে ১২ হাজার। আমন, আউশ আর বোরো—এই তিন মৌসুমের জন্য আবাদ করা এসব জাতের ধান আমাদের পূর্বপুরুষদেরই যাচাই-বাছাই আর নির্বাচন কর্মকাণ্ডের ফল। এ দেশের প্রতিভাবান কৃষকদের হাত ধরেই উদ্ভাবিত হয়েছে এসব জাতের ধান। এ কারণেই এদের বলা হয় ‘কৃষকের জাত’। এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবেশ-প্রতিবেশে অভিযোজনক্ষম এসব জাতকে বলা হয় স্থানীয় জাতও। বিজ্ঞানীরা এসব ধান জাতের নাম দিয়েছেন ‘ল্যান্ড রেস’। প্রাকৃতিক নিয়মে সৃষ্ট বৈচিত্র্য থেকে কৃষক তার মেধা ও মনন কাজে লাগিয়ে বাছাই করে নিয়েছিল এসব জাত। প্রকৃতির মধ্যে আপন নিয়মে ঘটা সংকরায়ণ আর আকস্মিক জিন মিউটেশন ধানের বৈশিষ্ট্যে যে বৈচিত্র্য নিয়ে আসত তা থেকেই পছন্দমতো ধান বাছাই করে নিত আমাদের মেধাবী কৃষকরা। সেসব ধান মাঠে বুনে বা রুয়ে দিত বছরের পর বছর। আর ধানের মাঠ থেকে কাঙ্ক্ষিত ধরনের ধান আপন মেধা ও দৃষ্টিকে কাজে লাগিয়ে বাছাই করে নিত। এভাবেই একসময় তা কোনো না কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্য অন্য কৃষকদেরও মনোযোগ আকর্ষণ করত। অন্য কৃষকরাও সেসব ধান জাত আবাদ করতে শুরু করত। কৃষকরা এসব ধান জাতের চমৎকার সব নামও দিত। এসব নামেই পরিচিত হয়ে এরা এ দেশে টিকে ছিল শত সহস্র বছর। গত শতাব্দীর ষাট-সত্তরের দশকে আবাদ করতে শুরু করা উচ্চফলনশীল (উফশী) ধান জাতের অধিক ফলনশীলতার কারণে সেসব শত সহস্র ধান জাত মনোযোগ হারিয়েছে কৃষকের। অনুমান করা চলে সে রকম ১০ থেকে ১২ হাজার ধান জাতের মধ্য থেকে কৃষকদের বিশেষ আগ্রহের কারণে এ দেশে এখনো কয়েক শ স্থানীয় জাত আবাদ করছে কৃষক।

সে রকমেরই কয়েকটি প্রায় ভুলতে বসা স্থানীয় জাত নিয়ে কাজ করেছেন আরুণি সরকার। তিনি প্রকৃতির করে দেওয়া সংকরায়ণের ওপর নির্ভর করেননি। নিজে তাঁর পছন্দমতো এক জাতের ধানের ফুল থেকে পরাগরেণু নিয়ে তা ছুঁইয়ে দিয়েছেন অন্য জাতের ধানের ফুলের গর্ভমুণ্ডে। একেই আমরা ‘সংকরায়ণ’ বলি। অদৃশ্য পরাগরেণুর মাধ্যমে বয়ে আনা বাবার শতকরা ৫০ ভাগ জিন এসে অতঃপর যুক্ত হয়েছে মায়ের গর্ভে লুকিয়ে থাকা ডিম্বাণুর ৫০ শতাংশ জিনের সঙ্গে। বাবা ধান জাতের পুংরেণুর সঙ্গে মা ধানের জাতের স্ত্রীরেণু মিশে তৈরি হয়েছে নতুন রকম সংযোগ। এ রকম সংযোগ থেকে অতঃপর একসময় যাচাই-বাছাই আর নির্বাচন করে আরুণি পেয়েছেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত জাতের ধান। আরুণি আমন ধানের পাঁচটি স্থানীয় জাতের সঙ্গে সংকরায়ণ করেছেন অন্য আর পাঁচটি আমন ধানের স্থানীয় জাতের। অতঃপর বিভিন্ন বংশধর ধরে চালিয়ে গেছেন তাঁর নির্বাচনের কাজ। এভাবেই উদ্ভাবন করেছেন ১০ বছরের মেধা ও শ্রমের ফসল হিসেবে ছয়টি আমন ধানের জাত।

তিনি তাঁর ধান জাতগুলোর সুন্দর সব নামও দিয়েছেন। আলো ধান, লোকজ ধান, আরুণি ধান, গঙ্গা ধান, মৈত্রী ধান ও লক্ষ্মীভোগ ধান। বলা বাহুল্য, লক্ষ্মীভোগ নামে আমাদের দেশে একটি কৃষকের জাত কিন্তু রয়েছে। ফলে এই নামটি ব্যবহার না করাই যুক্তিযুক্ত হবে। ইমাসকুলেশন এবং পলিনেশন অর্থাৎ সংকরায়ণ করে এই ছয়টি আমন ধান জাত উদ্ভাবন করায় আরুণিকে অভিনন্দন জানাই। নতুন ধানের জন্য অপেক্ষার একটি স্তর তিনি পেরিয়ে এসেছেন। এবার তাঁর দ্বিতীয় স্তর পেরিয়ে যাওয়ার পালাটা শুরু করতে হবে। সেখানে তাঁর এবং তাঁর সঙ্গী কৃষকদের যেমন এগিয়ে আসতে হবে, তেমনি এগিয়ে আসতে হবে প্রকৃত বিজ্ঞান জানা সরকারি ও বেসরকারি গবেষকদেরও। আরুণির ১০ বছরের শ্রম ও মেধার সঙ্গে আমাদের ধান গবেষকদের সহযোগিতার হাত বাড়ানো প্রয়োজন। আমাদের অমনোযোগিতার জন্য আরুণির মেধা আর শ্রমে-ঘামে উদ্ভাবিত জাত যেন অবমূল্যায়িত না হয়। 

যেকোনো গবেষকের উদ্ভাবিত ধান জাত অবমুক্তকরণের জন্য দেশে একটি নিয়ম চালু রয়েছে। সে নিয়মটি পালন করে আরুণির প্রকৃত সফল কোনো জাত যেন রেজিস্ট্রীকৃত ও অবমুক্ত হতে পারে সে জন্যই আমাদের কারো না কারো এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের দেশে ধানের মতো নোটিফায়েড ফসলের নতুন জাত অবমুক্ত করতে হলে কাঠামোবদ্ধ বেশ কিছু পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আরুণি সরকার আমাদের এ তথ্য দিচ্ছেন যে জাতগুলো মাদার-ফাদার থেকেও ফলন বেশি, গাঁথুনি ঘন, শীষ লম্বা এবং এরা দুর্যোগসহিষ্ণু। জাতগুলো সম্পর্কে প্রদত্ত এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত হওয়ার জন্যই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। সেসব যে খুবই জটিল পরীক্ষা, তা কিন্তু নয়। আরুণির ১০টি ফাদার-মাদারের মধ্যে অথবা আমন ধানের স্থানীয় জাতের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম যে জাত রয়েছে (অনুমান করি এই ১০টির মধ্যেই তা রয়েছে) এর সঙ্গে একটি পরীক্ষায় জাতগুলোকে প্রথম অবতীর্ণ এবং উত্তীর্ণ হতে হবে। অনুমান করি, তিনি তা করেছেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ জাত বা জাতগুলো কোনো কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্য স্বতন্ত্র সেসব বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে হবে। নইলে শত শত ধান জাতের মধ্য থেকে এসব জাতকে চেনা যাবে কী করে? অতঃপর টিকে যাওয়া জাতগুলোর প্রতিটির ৫০০ গ্রাম করে বীজ একটি আবেদনপত্র ও নির্ধারিত ফিসহ ‘ডিইউএস’ টেস্ট এবং জাতের আবাদ ও এর ব্যাবহারিক মূল্য যাচাই (ভিসিইউ) করার জন্য জমা দিতে হবে গাজীপুরে অবস্থিত সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি’তে। এ রকম টেস্ট করার জন্য এটি এ দেশে সরকারের একমাত্র প্রতিষ্ঠান। এই দুটি টেস্টের মাধ্যমে চারটি জিনিস জানা সম্ভব হয়—এক. জাতগুলোকে আলাদা করে চিহ্নিত করার জন্য যেসব স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কথা উদ্ভাবক উল্লেখ করেছেন তা সঠিক কি না; দুই. মাঠে প্রতিটি জাত সমরূপ কি না; অর্থাৎ তাদের মধ্যে মিশ্রণ আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া; তিন. এদের ফলনশীলতা দুই বছর একই মৌসুমে একই রকম স্থিতিশীল থাকে কি না এবং চার. এসব জাতের ব্যাবহারিক মূল্য কতটুকু তা জানা। পাশাপাশি এদের রোগ-বালাই আর কীট-পতঙ্গের আক্রমণের অবস্থা কি তা দেখা। আর শেষ ধাপের পরীক্ষার বিষয়বস্তু হলো উদ্ভাবিত জাত সারা দেশের জন্য অভিযোজনক্ষম না কোনো অঞ্চলের জন্য তা পর্যালোচনা করা। সে জন্য দেশের সাত থেকে ১০টি স্থানে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক বা একাধিক জাতকে আবাদ করতে হয় কিছু নিয়ম-কানুন মেনে। সব অঞ্চলের জন্য সফল জাতকে সারা দেশের জন্য অবমুক্ত করা হয় আর কোনো দু-একটি স্থানে একটি জাত সফল হলে সে স্থানের জন্য শুধু একে অবমুক্ত করা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় বীজ বোর্ডের সভায় এসব জাত অবমুক্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

আরুণি সরকারের জাতগুলোকে সরকারের স্বীকৃতি পেতে দেশে বিদ্যমান কাঠামোবদ্ধ ধান জাত পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্তরগুলো পেরোতে হবে। এ কাজে সহযোগিতা করার জন্য সরকারি সংস্থা, যেমন—গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, বিএডিসি কিংবা বেসরকারি বীজ কম্পানিও এগিয়ে আসতে পারে। আর সরকারি স্বীকৃতি না চাইলে জাতের কোনো কোনোটা যদি সফল হয়ে যায়, তবে তা হয়তো চলে যাবে দু-একজন কৃষকের হাত ঘুরে অনেক কৃষকের হাতে। সফলজাত এভাবেও কোনো কোনো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবু একজন প্রাজ্ঞময় কৃষকের জাতও নিয়মমাফিক অবমুক্তি লাভ করুক এবং সফলজাত দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ুক—একজন উদ্ভিদ প্রজননবিদ হিসেবে সেই ইচ্ছা তো থাকেই। নেপালে উদ্ভিদ প্রজননবিদের পাশাপাশি কৃষক যেন জাত উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করতে পারে এর সহজ ব্যবস্থা রয়েছে। নেপালে এ রকম ধান জাত উদ্ভাবনকে ‘গ্রাসরুট ব্রিডিং’ বা ‘তৃণমূল প্রজনন’ বলা হয়। কৃষকের জাত শুধু অবমুক্ত করা নয়, এসব জাত যেন মেধাস্বত্ব লাভ করতে পারে, সে ধারাও আমাদের মেধাস্বত্ব আইন ‘উদ্ভিদ জাত সংরক্ষণ আইন ২০১৯’ আইনে রয়েছে। ফলে কৃষকের উদ্ভাবিত জাতের ছাড়করণে সাহায্যের হাত না বাড়ালে কৃষকরাই বা জাত ছাড়করণ করবে কী করে? কৃষকের অধিকার রক্ষার জন্য এর চেয়ে বড় সহযোগিতা আর কী হতে পারে? ব্যক্তিগতভাবে আমি তাই আরুণির মতো কৃষকদের মেধা ও শ্রমলব্ধ সফলজাত সরকারি স্বীকৃতি পাক সে আশা পোষণ করি। 

লেখক : ভাইস চ্যান্সেলর, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়