kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

সুন্দরবনে চোরাশিকার বাঘের প্রধান হুমকি

ড. এম এ আজিজ   

২৯ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




সুন্দরবনে চোরাশিকার বাঘের প্রধান হুমকি

আজ বিশ্ব বাঘ দিবস। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে ২০১০ সালের ২১ নভেম্বর ব্যতিক্রম একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বব্যাংকের আহ্বানে ওই সম্মেলনে যোগ দেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ছাড়াও আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, নেপালের প্রেসিডেন্টসহ ১৩টি দেশের সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি। বন্য পরিবেশ থেকে ক্রমাগতভাবে বাঘের বিলুপ্তি কিভাবে মোকাবেলা করা যায় সে আলোচনা করতেই ওই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। কোনো একটি বন্য প্রাণী সংরক্ষণের জন্য বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে এটিই ছিল প্রথম সম্মেলন। ওই সম্মেলনে প্রতিবছর ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে হিসাবে আজ ১৩তম বিশ্ব বাঘ দিবস।

যেসব দেশে বুনো পরিবেশে বাঘ আছে, সেসব দেশে মূলত এই দিনটি পালিত হয়। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নানা সংরক্ষণ সংস্থাও এই দিনে নানা কার্যক্রম গ্রহণ করে। সভা, সেমিনার, শোভাযাত্রা ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ এই দিনটি বিশেষভাবে পালন করে আসছে। প্রাকৃতিক পরিবেশে বাঘ টিকিয়ে রাখতে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাঘ সংরক্ষণে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ে এই দিবসটি ভূমিকা রাখছে।

একটি প্রাণী রক্ষায় একটি বিশেষ দিন আলাদা করে পালন করার নিশ্চয় কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে বন্য পরিবেশে বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। বর্তমানে এর মাত্র ৩ শতাংশ বাঘ বেঁচে আছে। অন্যদিকে বাঘের পূর্বপুরুষের বসতভিটার ৯৫ শতাংশ এলাকা আজ মানুষের দখলে। একসময় ৩৩টি দেশে বাঘ থাকলেও বর্তমানে মাত্র আটটি দেশে বুনো বাঘ আছে। চীন, মিয়ানমার ও লাওসের বনাঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু বাঘ বেঁচে থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে টেকার মতো কোনো পপুলেশন নেই। কম্বোডিয়া এরই মধ্যে তার সর্বশেষ বাঘটি হারিয়েছে ২০১৬ সালে। অন্যদিকে ১৯৯৭ সালের পর ভিয়েতনামের বনে আর কোনো বাঘের দেখা মেলেনি। ফলে কাগজে-কলমে ১৩টি দেশে বাঘ থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে বাঘ আছে মাত্র আটটি দেশের বনাঞ্চলে।

২০১০ সালের বিশ্ব বাঘ সম্মেলনে পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশে বাঘের সংখ্যা ২০২২ সালের মধ্যে দ্বিগুণ করার অঙ্গীকার করা হয়। এমন প্রতিজ্ঞা কিছুটা উচ্চাভিলাষী ছিল বটে, তবে নেপাল এই মাইলফলকটি প্রায় স্পর্শ করে ফেলেছে। ২০১০ সালে নেপালে বাঘের সংখ্যা ছিল ১২০টি, ২০১৮ সালের জরিপে ২৩৫টি বাঘ পাওয়া যায়। ভারতও দ্বিগুণের লক্ষ্য প্রায় ছুঁই ছুঁই করছে। ২০১০ সালে ভারতে বাঘের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৭০৬টি, ২০১৯ সালের জরিপে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৯৬৭টি। বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণে—আমরা কোথায় আছি। ২০১০ সালের দিকে আমাদের সুন্দরবনে বাঘের কোনো জরিপ হয়নি। তবে ২০০৯ সালের একটি গবেষণায় সুন্দরবনে ৩০০ থেকে ৫০০ বাঘ থাকার নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে। আর ২০১৯ সালে করা আমাদের সর্বশেষ জরিপ বলছে, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১১৪টি। যদিও ২০১৫ সালের জরিপে সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘের সংখ্যা পাওয়া যায়।

চোরাশিকার বাঘের প্রধান হুমকি। বন্য প্রাণীর অবৈধ ব্যবসাসংক্রান্ত গবেষণা সংস্থা ‘ট্রাফিকের’ ২০১৮ সালের একটি জরিপ মতে, ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে চোরাশিকারিরা আমাদের সুন্দরবনে ৩৩টি বাঘ হত্যা করেছে। করোনাকালে আরো তিনটি বাঘের অপমৃত্যু ঘটেছে। এ বছরের মে মাসে শরণখোলায় বাঘের একটি চামড়াসহ হাবিব তালুকদার নামের এক বাঘ চোরাশিকারি ধরা পড়ে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ৫০ বছর বয়সী এই দুর্ধষ শিকারি গত ২০ বছরে নাকি সুন্দরবন থেকে ৭০টি বাঘ শিকার করেছে! এই তালুকদার তো একসময়কার বিখ্যাত বাঘশিকারি পচাব্দি গাজীকেও হার মানিয়েছে। এ রকম হাবিব তালুকদারের সংখ্যা সুন্দরবন এলাকায় নেহাত কম নয়।

খাদ্য ও বাসস্থান যেমন আমাদের মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম, তেমনি বাঘেরও কিছু মৌলিক চাহিদা রয়েছে। বাঘের প্রধান দুটি মৌলিক চাহিদা হলো খাদ্য ও বাসস্থান। পৃথিবীর বেশির ভাগ বাঘের আবাসে ১০-১২ প্রজাতির খাদ্য প্রাণী থাকলেও আমাদের সুন্দরবনে রয়েছে প্রধানত চিত্রা হরিণ ও বুনো শুয়োর। সুন্দরবনে বাঘের প্রায় ৭০ শতাংশ খাদ্য আসে চিত্রা হরিণ শিকারের মাধ্যমে। অর্থাৎ বাঘকে টিকিয়ে রাখতে হলে পর্যাপ্ত পরিমাণে বনে হরিণ থাকতে হবে। কিন্তু মুশকিল হলো প্রতিবছর সুন্দরবন থেকে অসংখ্য হরিণ চোরাশিকারির হাতে মারা পড়ছে। এ যেন আমাদের এক আদিম নেশা। গরু-ছাগল কিংবা হাঁস-মুরগিতে এখন আর আমরা তৃপ্তি পাই না। বুনো হরিণের মাংস চাই-ই চাই। শুধু সুন্দরবনের আশপাশের মানুষই নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সুন্দরবনের চিত্রা হরিণের মাংস নানা কায়দায় পাচার হয়। করোনাকালে প্রাণ-প্রকৃতি কিছুটা প্রাণ ফিরে পেলেও সুন্দরবনের হরিণ শিকারের খবর নিয়মিতই গণমাধ্যমে আসছে। এটি সত্যিই পীড়াদায়ক এবং বাঘের জন্য একটি বড় হুমকি।

সুন্দরবনে বাঘের বাসস্থানের দিকে নজর দিলে আমরা কী দেখি। সুন্দরবন পৃথিবীর পাঁচটি বৃহৎ বাঘের আবাসের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু এই আবাসও আজ নানাভাবে বিপর্যয়ের পথে। এর মধ্যে অন্যতম আমাদের অদূরদর্শী কিছু ‘উন্নয়ন’ কর্মকাণ্ড। সুন্দরবনের লাইফলাইন হলো পশুর নদ। বর্তমানে আমাদের সুন্দরবন যেটুকু মিষ্টি পানি পেয়ে থাকে তার বেশির ভাগ আসে পশুর নদের মাধ্যমে। দুর্ভাগ্যজনক হলো, পরিবেশবিধি অনুযায়ী ‘লাল তালিকাভুক্ত’ অসংখ্য কলকারখানা সুন্দরবনের উজানে এই পশুর নদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এর ফলে ক্রমাগতভাবে সুন্দরবনের মাটি, পানি, বাতাস—সবই চরম দূষণের কবলে পড়ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব দূষণ ধীরে ধীরে সুন্দরবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। এই হুমকির সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমুুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধি। তার সঙ্গে বাড়ছে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস। যেমন—সম্প্রতি বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ অব্যবহিত পড়ে সুন্দরবনে বনতল দীর্ঘ মেয়াদে তলিয়ে থাকার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব কারণে আমাদের বাঘের একমাত্র আবাস সুন্দরবনও আজ বড় হুমকির সম্মুখীন।  

সুন্দরবন ও সুন্দরবনে বাঘ রক্ষায় আমরা ব্যর্থ হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনোই আমাদের ক্ষমা করবে না।

 লেখক : বাঘ গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক

 



সাতদিনের সেরা