kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

আশা পূরণের বাধা দূর করতে হবে

আবদুল বায়েস

২৮ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আশা পূরণের বাধা দূর করতে হবে

হুমায়ূন আহমেদের বহুল প্রচারিত একটি নাটকের নাম ‘বহুব্রীহি’। এই নাটকে বাড়ির কাজের ছেলে, যে আবার সৈয়দ বংশের দাবিদার—একটি পাওয়ারলেস চশমা পরে সবার সামনে এসে হাজির হয়। ব্যাপারটি ওই পরিবারের চায়ের কাপে রীতিমতো ঝড় তোলে। তির্যক চাহনি, টিপ্পনী কিংবা কারো মুচকি হাসি উপেক্ষা করে আকর্ণবিস্তৃত এক হাসিতে ছেলেটি জানতে চায়, ‘গরিব বইলা কি আমাগো শখ-আহ্লাদ থাকতে নাই?’

সনাতনি ধারণা হচ্ছে, গরিবের ওসব থাকতে নেই।  ভাবটা এমন—গরিবের আবার ঘোড়ারোগ কেন? গরিব বেশি খায়, এমনকি যা পায় তা খায়—এটাই গরিবের বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে বেশি খায় বলে কারো বিদায়ঘণ্টা যে বেজে ওঠে এমন ঘটনা বিরল নয়। অতিরিক্ত আয়ের প্রায় পুরোটাই তারা খরচ করে খাদ্য ক্রয়ে; সবার উপরে খাওয়া সত্য তাহার উপরে নাই। অবশ্য তা না করে যে উপায়ও নেই, যেখানে স্বয়ং কবি সুকান্ত বলেছেন,

‘কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়

পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’

দুই.

অধুনা মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা অবশ্য অন্য কথা বলতে চায়। বিশেষত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি ও এস্থার ডাফলোর ‘পুওর ইকোনমিকস’ বইটি বের হওয়ার পর থেকে এই তত্ত্বটি সামনে হাজির হয় যে গরিব মানুষ শুধু খাদ্যের পেছনে ছোটে না, খাদ্য ছাড়াও তাদের সুখ নিহিত থাকে বিভিন্ন শখসংশ্লিষ্ট চাহিদায়। অর্থাৎ ধনীদের মতোই তারা শখ-আহ্লাদ শুধু লালন করে ক্ষান্ত হয় না, সুযোগ পেলে তা লুফে নেয় বৈকি।

এটি আজ সুবিদিত যে উন্নয়নশীল দেশের গরিব জনগণ, ইচ্ছা করে হোক কিংবা মুখ রক্ষা করার  মানসে  হোক, বাধ্য হয়ে একটি বড় অঙ্ক ব্যয় করে বিভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনে। যেমন—বিয়ে, যৌতুক কিংবা নানা অনুষ্ঠান পালনের প্রয়াসে। বাংলাদেশে গরিব খানার অনেক বিয়ে বা উৎসব উদযাপিত হয় ধারদেনা করে। ভারতে বিয়ের খরচ এমনিতেই বেশি, তার পরও পরিবারগুলো ব্যয়বহুল পার্টি দিতে বাধ্য হয়।

কোথাও আবার খাদ্যের বাইরে খরচ করতে হয় সামাজিক অনুশাসন মানতে গিয়ে। যেমন—দক্ষিণ আফ্রিকায় মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফন ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য ব্যয় কত হবে, তা সামাজিক নিয়ম দ্বারা নির্ধারিত থাকে, যদিও বেশির ভাগ মৃত্যু ঘটে বৃদ্ধ অথবা শৈশবকালে। নিয়মটি এই যে শিশুদের বেলায় প্রায় বিনা খরচে ও সাধারণভাবে সৎকার হবে; কিন্তু বয়স্কদের বেলায় সৎকার কার্যক্রম হতে হবে বিস্তারিত। এবং এই খরচ আসবে মৃতের পুঞ্জীভূত সম্পদ কিংবা সঞ্চিত আয় থেকে। যারা নিঃস্ব, যেমন—এইডস রোগে মৃত, তাদের ব্যয় বহন করবে আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুবান্ধব। পুরো সৎকার কার্যক্রম সাধনে গড়পড়তা খরচ হয় ৮২৫ ডলার (পিপিপি), যা একটি খানার মাথাপিছু বার্ষিক আয়ের ৪০ শতাংশ। স্বভাবতই এমনতর ব্যয়বহুল সৎকার কার্যক্রম শেষে খাদ্যসংকট উঁকি দেয়, শিশুরা স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয় এবং বয়স্করা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েন।

 তিন.

অভিজিৎ ব্যানার্জি, তাঁর সহকর্মী এবং মরক্কোর সুদূর গ্রামের এক গরিব লোকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সংলাপটি ছিল এ রকম—

প্রশ্ন : আপনাকে যদি কিছু অর্থ দেওয়া হয়, তা দিয়ে আপনি কী করবেন?

উত্তর : আমি পরিবারের জন্য খাবার কিনব।

প্রশ্ন : যদি আবারও অর্থ দেওয়া হয়?

উত্তর : একটু বেশি মজার খাবার কিনব।

প্রশ্ন : ঘরে খাবার নেই অথচ টেলিভিশন, ডিশ এন্টেনা এবং ডিভিডি প্লেয়ার কিনেছেন কেন?

উত্তর : খাদ্যের চেয়ে টেলিভিশন যে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।

লক্ষণীয় যে মরক্কোর ওই গ্রামে বিনোদনমূলক ব্যবস্থাদির একান্ত অভাব ছিল বলে বিকল্প হিসেবে টেলিভিশন বেছে নিয়েছেন উত্তরদাতা। যেখানে রেডিও-টেলিভিশন নেই, সেখানে উপস্থিত হয় কোনো না কোনো উৎসব, যেমন—ভারতের উদয়পুর। ওখানে কারোরই রেডিও বা টিভি নেই অথচ একটি চরম গরিব খানাও বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় করে উৎসব উদযাপনে। তাহলে এটি পরিষ্কার যে গরিবের কাছেও অগ্রাধিকার পায় ওই সব জিনিস, যা জীবনকে কম একঘেয়েমি করে তুলতে সাহায্য করে; হতে পারে একটি টেলিভিশন, একটু ভালো খাওয়া অথবা চিনি মাখানো এক কাপ চায়ের সঙ্গে সিগারেটে সুখটান। 

মোটকথা, মৌলিক মানবিক প্রয়োজন হচ্ছে একটি আনন্দময় জীবন। আর এ কারণেই ভারতে, এমনকি বাংলাদেশে, খাদ্য ব্যয় হ্রাস পাচ্ছে।

চার.

রংপুরের রহিমার পেশা গৃহসেবা তথা কাজের বুয়া। তাঁর স্বামী একজন রিকশাচালক। অনেক স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় আসা এই দম্পতি এখন বসুন্ধরায় এক বস্তিতে বাস করেন; বস্তির খুপরিতে ঠাসাঠাসি একটি চৌকি পাতা আর যৎসামান্য তৈজসপত্র। দুজনের হাড়ভাঙা খাটুনির এক ভাগ পাঠাতে হয় বাড়িতে, যেখানে শ্বশুর-শাশুড়ি স্কুলপড়ুয়া দুই সন্তান আগলে রেখেছেন অতি আদরে।

ঢাকায় এসে আয়-উপার্জন দিয়ে সুখী হতে চেয়েছিলেন তাঁরা এবং সব কিছু মোটামুটি ভালোই চলছিল। কিন্তু পর পর দুই ধাক্কায় ধরাশায়ী হলো  সব স্বপ্ন, রহিমা করেছিলেন বপন। মান্না দের গানটি যেন সত্যি হয়ে ধরা দিল ‘সবার কপালে নাকি সুখ সয় না...।’ প্রথমত, তাঁর বর বিদেশে পাঠানোর নামে মানুষের টাকা দালালদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। টাকা মেরেছে দালাল আর মার খাবে আলাল—এটাই নিয়তি নয় কি? অগত্যা  কিস্তিতে নেওয়া ধার সুদে-আসলে শোধ করতে হচ্ছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। দ্বিতীয়ত, একদিন  বেশি উপার্জনের আশায় কিস্তিতে ধার নিয়ে কেনা ব্যাটারিচালিত রিকশাটি চুরি হয়ে যায়। পরে অবশ্য চোরের দাবি অনুযায়ী ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে পুনরুদ্ধার করতে হয় রিকশাটি।

পাঁচ.

তবে ধাক্কা দুটির দুর্ভাগ্য যে রহিমা ভাঙবেন, তবু মচকাবেন না। দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনা যখন চূড়ায়, তিনি ভাবলেন কিস্তিতে ধার করে কিনবেন একটি রঙিন টেলিভিশন। আশপাশে বস্তিতে সব ঘরে টিভি আছে, তাঁর ঘরে থাকবে না? দিন শেষে বাড়ি ফিরে একটু বিনোদন অনেকটাই টনিকের মতো কাজ করে—‘হাওয়া হাওয়া এ হাওয়া খুশবু লুটা দে’, ‘মেরে আঙিনা মে তেরা কেয়া কাম হেয়।’ এবং কিস্তিতে কিনলেন একখান টিভি।

আপাতত ধারদেনায় জর্জরিত থাকলেও রহিমার আশা আগামী মাসে ১২ সিএফটির একটি ফ্রিজ কিনবেন—‘এক দিন রানমু, তিন দিন খামু। তবে নগদ টাকায়, দরকার হলে কম খামু। পরের মাসে কিনমু ছেলের জন্য স্মার্টফোন, যাতে সে অনলাইনে ক্লাস করতে পারে।’

ছয়.

ভারত, বাংলাদেশ, মেক্সিকো এবং অন্যান্য দেশের গ্রামগুলোতে মোবাইল ফোন কিংবা টিভি আজকাল  আর চমক দেয় না। অর্থনীতির বিলাসদ্রব্যের বন্ধনীতেও এগুলো নেই। এখন নিতান্তই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য যেন। গ্রামের ভেতর ছোট দোকানে থাকে ফ্রিজ, টিভি, প্রসাধনী দ্রব্য, চকোলেট, চানাচুর, চিরুনি, সিগারেট, খেলনা, শ্যাম্পু ইত্যাদি, যার ক্রেতা মূলত গ্রামের গরিব মানুষ।

আয়েশ এখন আর শুধু ধনীর খায়েশ নয়, গরিবেরও খায়েশ হয়। আমাদের উচিত হবে ওদের আশা পূরণের বাধা দূর করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ঋণের সুবিধা, পরিপূর্ণ এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার, আইনের শাসন ইত্যাদি।

 

লেখক : সাবেক উপাচার্য

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা