kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

করোনা প্রতিহত হোক, মানুষ বাঁঁচুক

গোলাম কবির

২৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনা প্রতিহত হোক, মানুষ বাঁঁচুক

‘জানার মাঝে অজানারে করেছি সন্ধান’ বলে অভীপ্সা ব্যক্ত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কারণ অজানাকে জানার সন্ধান মানুষের নিরন্তর। কৌতূহলেরও অবধি নেই। তাই ‘অচেনাকে চিনে চিনে’ জীবন ভরে তুলতে চায়। আমরা হয়তো ভাবতে পারি, এসব ভাব-বিলাস! এই যে জানার মাঝে অজানার সন্ধান আপাত বৈপরীত্যের মনে হলেও খালি চোখে দেখা আর দিব্যদৃষ্টিতে দেখা এক নয়। অনেক সময় অধিক আলোর প্লাবনে অন্তর্নিহিত সত্যের আংশিক দেখা যায়, সম্পূর্ণ নয়।

এই যে করোনা বিপর্যয়ে আমরা স্বাস্থ্য আর শিক্ষা নিয়ে, বিশেষ করে শিক্ষা নিয়ে হন্তদন্ত করছি, তার ফলাফল কতটুকু নিশ্চিত! নাকি সবই গোলকধাঁধা! মোসাহেবি, কারসাজি। না, স্বাস্থ্যের ঘরে উঁকি দেব না, সে তো দেবানজানন্তী!

প্রকৃত শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শিক্ষা নিয়ে ভাববেন, এটা স্বতঃসিদ্ধ। তাই বলে সবাই নয়। শিক্ষা বিভাগের বেতনভোগী পেশাদার কর্মকর্তা-কর্মচারী স্বভাবত নিজের উন্নতি নিয়ে এমনি ব্যস্ত থাকেন যে শিক্ষার অন্তর্নিহিত শক্তি উদ্ভাবনে সময় দিতে পারেন না।

পৃথিবীর বয়স যত বাড়ছে, ততই মানুষ ব্যক্তিস্বার্থের মতবাদে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। সম্মিলিত ভাবনা ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে। আবার ফিরে আসি রবীন্দ্রনাথে তিনি জানার মাঝে অজানারে সন্ধান করতে গিয়ে ‘কত অজানারে জানাইলে তুমি’ বলে আশ্বাস পেতে চেয়েছিলেন; কিন্তু সে বিশ্বাস স্থায়ী হয়নি। দৈহিক অন্তর্ধানের ৯ দিন আগে (২৯-৭-১৯৪১) বিকেল বেলায় ‘অন্ধকারে ছলনার ভূমিকা’কে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন (‘শেষ লেখা’ ১৪ সংখ্যক কবিতা)। জানা সত্য ছলনাকারী, মুখোশধারী মোসাহেব।

সব কালেই মোসাহেবরা ক্ষমতাধরদের সত্যভ্রষ্ট করেছে অথবা অবান্তর আলো ফেলে সত্যকে আড়াল করেছে। এতে তোষামোদকারীরা ব্যক্তিগতভাবে ‘সাগরচুরি’ করে আঙুল ফুলে তালগাছ হয় আর জনগণ কাম্যসুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

উপনিবেশ সৃষ্টি করার পর ব্রিটিশরা শোষণ স্থায়ী রাখতে রাজস্ব আহরণের উপযোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী তৈরির জন্য শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলন করলেও শিক্ষার মৌলিক স্তম্ভগুলো নড়বড়ে রাখেনি। তাদের শেষ অঙ্কের ডামাডোলের কালে আমরা যতটুকু জেনেছি। সেই জানার মাঝে অজানাকে সন্ধান করে ফিরলাম, নুড়ি কুড়াতেও পারিনি।

আমরা আবেগের আতিশয্যে বাস্তবতাবর্জিত দেশ গড়ে দেশ ভাঙলাম। গড়ে উঠল এক শ্রেণির নতুন মোসাহেব বাহিনী। তাদের অনেকের বাকপটুতার প্লাবনে ভাসিয়ে দিল মূল সমস্যা। ‘পাকিস্তানের অভাব কি?’ বলে কল্পলোক তৈরি হলো। কারো কপাল খুলল, কারো পথের আলো ঝাপসা হয়ে এলো।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শিক্ষাকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে বাস্তব জীবনোপযোগী শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন সত্যিকারভাবে মানবজাতির সার্বিক উন্নয়নে কাজে লাগে সেদিকে দৃষ্টি দিতে চেয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের সব উল্টো পথে ধাবিত হয়। আবার নতুন করে মোসাহেব শ্রেণি গজিয়ে ওঠে। জ্ঞান বিতরণে এ অঞ্চলের শিক্ষকদের ঐতিহাসিক সুখ্যাতি থাকলেও চোখ-ধাঁধানো নতুনত্বের চমক দেওয়ার জন্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিদেশ সফর করে অর্থের শ্রাদ্ধ হয়েছে। বিদেশি অনুকরণে শ্রেণিকক্ষের সাজসজ্জা আর আসনবিন্যাসে অপচয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষার অধোগমন ঠেকানো যায়নি।

বিশ্বজোড়া করোনা বিভীষিকা মানুষকে বিপর্যস্ত করে চলেছে। পূর্ণ নিরাময়তার দিগন্ত অজ্ঞাত। মানুষ মরছে বেঘোরে। এত দিন কর্মজীবী মানুষের সান্ত্বনার ভাষা ছিল, খেটে খাওয়া মানুষ আক্রান্ত হবে না। আশা নিয়েই মানুষ বাঁচে। তবে কাজ বন্ধ হয়ে গেলে কর্মজীবী মানুষের বাঁচার অবলম্বন কী থাকবে? সুতরাং মূল কাজ করোনা নির্মূল করে মানুষ বাঁচানো।

অস্পৃশ্য করোনা নামের ঘাতক থেকে রক্ষার উপায় হিসেবে ব্যক্তিক দূরত্ব রক্ষার বিকল্প অনলাইনে পাঠদানের অসম্পূর্ণ ব্যবস্থা করা হয়েছে উন্নত দেশে। তাই দেখে দেশীয় কর্তাব্যক্তিরা আমাদের দেশে তা চালু করতে উঠেপড়ে লাগলেন। সুযোগ পাচ্ছে ভাগ্যবানদের সন্তানরা, আবার তারাই বেশির ভাগ বিভ্রান্ত হচ্ছে। পক্ষান্তরে প্রান্তিক জনগণের সন্তানরা বর্ণমালার প্রতীকগুলো এরই মধ্যে খেয়ে ফেলেছে।

বাংলাদেশে ক্যান্টনমেন্টকেন্দ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইন লেখাপড়া জিইয়ে রেখেছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাল মেলাবার চেষ্টা করছে। আর বেসরকারি ব্যবসায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে জোর কদমে অনলাইনের পথে হাঁটছে। এখানকার শিক্ষার্থী বেশির ভাগই সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে। এরা অতি ক্ষুদ্রাংশ। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী আচরণের শিক্ষা এবং আহরণের শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ছে। যারা অনলাইনে পূর্ণ সুযোগ পাচ্ছে তাদের অনেকে বিজ্ঞানের অমৃতটুকু গ্রহণ না করে গরল পান করে নানা ধরনের মাদকতায় আসক্ত হচ্ছে।

সচেতন মানুষ মনে করেন, আপাত নতুনত্ব উদ্ভাবনে গর্ববোধে বুঁদ না হয়ে সবার উচিত বাস্তবে দৃষ্টি দেওয়া। করোনার আওতা বয়স্কদের মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই, শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি কর্মজীবী মানুষের মাঝে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ছে। ‘সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ অভিধাটি বোধ করি দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠবে।

জানার মাঝে অজানারে আমরা অবশ্যই সন্ধান করব, অন্ধকার যতই ছলনার ভূমিকায় অবতীর্ণ হোক না কেন, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হলেও লেখাপড়ার কার্যক্রম চলতে থাকুক। তবে সব কিছুর আগে সর্বশক্তি নিয়োগ করে দেশের সব বয়সের মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে উন্নয়ন বলি, আর শিক্ষা বলি—কোনো কিছুই কাজে আসবে না। মানুষ বাঁচবে। মানুষের জন্যই মাটির পৃথিবী। তাদের সামনে রেখেই আমরা গেয়ে উঠব ‘জয় জয় হে মানব’।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

 



সাতদিনের সেরা