kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় থাকুক

বিধান চন্দ্র দাস

২৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় থাকুক

বিশ্বব্যাপী ম্যানগ্রোভ অরণ্য উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা করে চলেছে। জলনালিকাভরা তরঙ্গসংকুল কর্দমাক্ত এ অরণ্য সমুদ্র ও স্থলভূমির মধ্যে নির্মাণ করে অপূর্ব সংযোগ। সৃষ্টি হয় প্রাকৃতিক ব্যূহ। অনেকটা রুখে দেয় ঝড়ঝঞ্ঝা-জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। রুখে দেয় উপকূলীয় ভূমিক্ষয়। শোষণ করে কার্বন। অম্লত্ব কমায় সমুদ্রের পানির। এখানেই গড়ে ওঠে জীববৈচিত্র্যের অপূর্ব এক জগৎ। সময়ের ব্যবধানে ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে কেন্দ্র করে বর্ধিত হয় দেশের সীমানা।

ম্যানগ্রোভ অরণ্যের বাস্তুতান্ত্রিক সেবায় আমরা ধন্য হই। পৃথিবীর এক কোটি ৮১ লাখ হেক্টর ম্যানগ্রোভ অরণ্য সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল থেকে প্রায় আড়াই কোটি টন কার্বন শোষণ করে চলেছে। সেই কারণে এ অরণ্যের উপকারভোগী পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ। ইউনেসকোর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক লেখায় ম্যানগ্রোভ অরণ্য বিশ্বশান্তির জন্যও সহায়ক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ এই অরণ্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অন্যান্য অরণ্য থেকে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার বিষয় গভীরভাবে জড়িত।

পৃথিবীতে ১২৩টি দেশে ম্যানগ্রোভ অরণ্য আছে। বিষুবরেখার ৩০ ডিগ্রি উত্তর ও দক্ষিণে এই দেশগুলো অবস্থিত। পৃথিবীর মোট ম্যানগ্রোভ অরণ্যের প্রায় ৪২ শতাংশ আছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। এর পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৭৫ হাজার বর্গকিলোমিটার। ইন্দোনেশিয়ায় সবচেয়ে বেশি পরিমাণ (৪০ হাজার বর্গকিলোমিটার) ম্যানগ্রোভ অরণ্য দেখতে পাওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো পৃথিবীতে ম্যানগ্রোভ অরণ্য গভীরভাবে হুমকিগ্রস্ত। এর জন্য প্রথমত মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড ও দ্বিতীয়ত প্রাকৃতিক কিছু কারণ দায়ী। পৃথিবীর নানা জায়গায় মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড, যেমন—ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধ্বংস করে কৃষি ও মৎস্য চাষ, অতি আহরণ, লবণ চাষ, মিঠা পানির প্রবাহ পরিবর্তন, বসতি স্থাপন, সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, দূষণ, বর্জ্যস্থান তৈরি ইত্যাদির জন্য ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র চরমভাবে হুমকিগ্রস্ত। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, যা মূলত মানুষেরই সৃষ্টি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, লবণাক্ততা ও ঘন ঘন ঝড়ঝঞ্ঝা-জলোচ্ছ্বাস বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা হচ্ছে। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের জন্য এগুলো চরম হুমকি সৃষ্টি করে চলেছে। প্রাকৃতিক কারণের মধ্যে প্রধানত ম্যানগ্রোভ অরণ্যমুখী নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও এই অরণ্যভূমিসংলগ্ন সমুদ্রস্রোত পাল্টে যাওয়াকে দায়ী করা হয়। আগ্রাসী জীবসহ ম্যানগ্রোভ অরণ্যে রোগ-বালাইও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইউনেসকোর মতে, ম্যানগ্রোভ অরণ্য অন্য যেকোনো অরণ্যের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি দ্রুতগতিতে নষ্ট হচ্ছে। এই অরণ্যের অপার প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক এই সংস্থা প্রতিবছর ২৬ জুলাই আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। উদ্দেশ্য এই অরণ্য সংরক্ষণের ব্যাপারে পৃথিবীব্যাপী জনসচেতনতা তৈরি করা।

একক বন হিসেবে সুন্দরবনই পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে এর মোট আয়তন ১০ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশ সুন্দরবনের আয়তন ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। তবে এই বন একসময় অনেক বিস্তৃত ছিল। বিশেষজ্ঞরা প্রাচীন ভারতের ১৩টি মহা অরণ্যের অন্যতম আঙ্গিরীয়, প্রাচ্য ও কালেসা মহা অরণ্যের সঙ্গে সুন্দরবন সৃষ্টির সম্পর্ক নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন। সেই হিসাবে সুন্দরবন একসময় অবিভক্ত বাংলার এক বিশাল অংশজুড়েই বিস্তৃত ছিল।

১৯৯৭ সালে ইউনেসকো বাংলাদেশ সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের (প্রাকৃতিক) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। সাধারণত কোনো প্রাকৃতিক স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হলে ইউনেসকোর ১০টি শর্তের মধ্যে যেকোনো একটি শর্ত পূরণ করতে হয়। কিন্তু সুন্দরবন একটির জায়গায় দুটি শর্ত (৯ ও ১০) পূরণ করায় অপরূপ অথচ প্রয়োজনীয় এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে বিশ্ব ঐতিহ্যের (প্রাকৃতিক) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে অসুবিধা হয়নি। তবে এই অন্তর্ভুক্তি চিরস্থায়ী নয়। যে বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্য সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, তা নষ্ট হয়ে গেলে তালিকা থেকে এই বনকে বাদ দেওয়া হতে পারে।

সব থেকে বড় বিষয় হচ্ছে, এই অরণ্য ধ্বংস হলে তা বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ বয়ে আনবে। উপকূলীয় কয়েকটি জেলার অসংখ্য মানুষের জীবনে নেমে আসবে চরম দুর্ভোগ। উত্তর বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের স্থলভূমিতে ত্রিকোণাকৃতি ধারণ করায় ও মহীসোপান (স্থলভাগ সন্নিহিত সমুদ্রতলের অংশ) অগভীর হওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায়ই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হয়ে থাকে। সুন্দরবন এসবের বিরুদ্ধে জৈবঢাল হিসেবে কাজ করে। ম্যানগ্রোভ অরণ্যসংলগ্ন সমুদ্রছোঁয়া স্থলভূমির ভাঙনও রক্ষা করে এই বন। সুন্দরবন আছে বলে এই অঞ্চলের জলবায়ু এখনো অতিমাত্রায় বিপজ্জনক দিকে মোড় নিতে পারেনি। এ ছাড়া এই অরণ্যকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তো আছেই। কাজেই সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ অরণ্য থাকা না থাকার ওপর বাংলাদেশের কল্যাণ অনেকটাই নির্ভর করছে।

পৃথিবীর অন্যান্য ম্যানগ্রোভ অরণ্যের মতো সুন্দরবনের ওপরও হুমকি তৈরি হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে কিছু হুমকি কমে এলেও এখনো কিছু হুমকি সুন্দরবনের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে আছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দূষণ, অতি আহরণ, চোরাশিকার, রোগ-বালাই বৃদ্ধি, আগ্রাসী প্রজাতি ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন। এ ছাড়া পরিবর্তনশীল স্রোত ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনও এই বনের জন্য হুমকি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত, বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধি, বাতাস ও পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস এই বনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এসব কারণে সুন্দরবনের খণ্ডায়ন ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সুন্দরবনের ওপর হুমকিগুলো মোকাবেলা করতে হলে মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডগুলো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা প্রয়োজন। এ ছাড়া ম্যানগ্রোভ অরণ্য রক্ষায় সার্বক্ষণিক গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের অনেক সদস্যকে গভীরভাবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করলে এই বনে ঘটতে যাওয়া অনেক পরিবর্তন সম্পর্কে আগাম পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব। ২০১৯ সালে স্পিংগার থেকে প্রকাশিত একটি গ্রন্থে সুন্দরবনের এসব পরিবর্তনের বিষয়গুলো সেখানকার কিছু অমেরুদণ্ডী সদস্যকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আগাম পাওয়া সম্ভব বলে অনেক প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। ম্যানগ্রোভ অরণ্য সংরক্ষণে এ ধরনের আগাম তথ্য খুবই জরুরি।

কিন্তু এ ধরনের কাজ নিয়মিতভাবে করার জন্য আমাদের দেশে বিশেষজ্ঞ নেই। প্রকল্প করে এ কাজ করা সম্ভব নয়। সুন্দরবনের হুমকিসমূহ মোকাবেলার জন্য প্রয়োজন সুন্দরবনবিষয়ক পৃথক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান। নানা বিষয়ের বিশেষজ্ঞ দিয়ে নিয়মিতভাবে জরিপ, পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় চিরায়ত জ্ঞান সংগ্রহ এবং সেই মোতাবেক কৌশল নির্ধারণ ছাড়া হুমকিগুলো সুস্থায়ীভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। সুন্দরবন ম্যানগ্রোভকে রক্ষা করতে চাইলে এর বিশালত্ব, বৈচিত্র্য, ক্রিয়াময় গতি ও পরিবর্তনশীলতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। বৃত্তাবদ্ধ ধ্যান-ধারণা থেকে বের হয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন। আমরা চাই, সুন্দরবন বিশ্বের অন্যান্য ম্যানগ্রোভ অরণ্যের মধ্যে তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখুক।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 



সাতদিনের সেরা