kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

বাংলাদেশ কি আসলেই গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী?

ড. মো. খাইরুল আলম

২৫ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাংলাদেশ কি আসলেই গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী?

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের বিভিন্ন উৎস থেকে ‘রহস্যময়’ মিথেন (CH4) গ্যাসের বিশাল কুণ্ডলী বায়ুমণ্ডলে নির্গত হচ্ছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিশাল এই মিথেন গ্যাস নিঃসরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ১২তম বৃহত্তম মিথেন গ্যাসের উৎস পরিণত হয়েছে। অন্য উৎসগুলোর মধ্যে এই মিথেনের একটি বড় অংশ মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল বা ময়লার ভাগাড় থেকে আসছে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ইএসএ) স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ধানক্ষেত, সুয়েজ নিষ্কাশন ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইনে ফাটল বা গর্ত বাংলাদেশে মিথেন নির্গমনের প্রধান কারণ হতে পারে।

মন্ট্রিয়লভিত্তিক সংস্থা জিএইচজিস্যাটের (১৮ এপ্রিল ২০২১) হুগো উপগ্রহের চিত্রানুসারে ল্যান্ডফিল সাইট থেকে মিথেন নিঃসরণের পরিমাণ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় চার হাজার কেজি, যা এক লাখ ৯০ হাজার যানবাহন প্রতি ঘণ্টা চলাচলের ফলে সৃষ্ট বায়ুদূষণের সমান। আমি অবশ্যই এই মতের বিপক্ষে মতামত দেব এই বলে যে এই মিথেন নির্গমনের একাধিক উৎস থাকতে পারে। বাংলাদেশ আকারে খুব ছোট একটি দেশ, তাই বিভিন্ন জলবায়ুগত উপাদানের কারণে এই মিথেন গ্যাস অন্যান্য দেশ থেকে এ দেশের পরিবেশে প্রবেশ করতে পারে। এই যুক্তির পেছনে একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে এবং বিভিন্ন স্টাডি দেখিয়েছে যে রেডক্স সম্ভাবনা নেতিবাচক বা দুই শর চেয়ে কম হলে তবেই মিথেন গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়। চোখের অনুমানে মনে হচ্ছে না যে মাতুয়াইল ভাগাড়ের জন্য অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে। তবে এ নিয়ে আরো গবেষণার দরকার রয়েছে। নিঃসরণের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ এবং উৎস শনাক্ত না করে বাংলাদেশকে সরাসরি দোষ দেওয়া ঠিক হবে না। এমনকি কেউ এটি করলেও এটিকে দুরভিসন্ধিমূলক বলা যেতে পারে।

এখন মিথেনের আরেকটি উৎস ধানক্ষেত নিয়ে আলোচনা করা যাক। বাংলাদেশে প্রায় ৩১৩টি শস্য পর্যায়ে প্রায় ৫০ ধরনের ফসল জন্মানো হয়। যদিও এগুলোর বেশির ভাগ ধানভিত্তিক, তবু এই শস্য পর্যায়ের অর্ধেক ফসলই শাক-সবজি/অধান ফসল। এক বছরে একই জমিতে ধান ও উঁচু জমির ফসল জলাবদ্ধ এবং উঁচু জমিতে পর্যায়ক্রমে চাষ করা হয়। দুইফসলি বা তিনফসলি ফসল ক্রমের প্রত্যেক ফসলের জন্য আলাদা পরিচর্যা, সার, বালাইনাশক, সেচ ইত্যাদি প্রয়োজন হয়। ফলে উঁচু জমির ফসল ধানের জমি থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ওপর বিশাল প্রভাব বিস্তার করে। যদিও অনেক ধানক্ষেতে জলাবদ্ধ করে সেচ দেওয়া হয়, তবে মাঝ মৌসুমে শুকিয়ে যাওয়া এবং ভেজা আবার শুকিয়ে যাওয়ার যে প্রক্রিয়া তার ফলস্বরূপ মিথেন নির্গমন হ্রাস পায়। ভেজা ও শুকানোর পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি (AWD) অনুসরণ করে মিথেন নির্গমনের বিষয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে এবং উচ্চতর রেডক্স পটেনশিয়াল বজায় থাকার কারণে খুব কম মিথেন নির্গমনের হার প্রমাণিত হয়েছে। ব্রি, বারি, বিএইউ এবং অন্যান্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ধানক্ষেত থেকে জিএইচজি (বিশেষত মিথেন) নির্গমন সম্পর্কে আরো কিছু গবেষণা সম্পন্ন করেছে। রাজশাহী অঞ্চলে জমিতে সরিষা-বোরো ধান-আমন ধানের ফসল ক্রমে জিএইচজি নির্গমন পরিমাপ করা হয়েছে। ধানক্ষেত থেকে মিথেন নির্গমন মোট জিএইচজি নির্গমনের ৬০-৭০ শতাংশ (লাইফ সাইকেলভিত্তিক), তারপর খামার যন্ত্রপাতি ব্যবহার ১৩-১৬ শতাংশ ও মৃত্তিকা থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ৯-১০ শতাংশ।

বাংলাদেশের অনুরূপ আবহাওয়া এবং মৃত্তিকা পরিস্থিতিতে পরিচালিত গবেষণা অনুসারে চীনে ধান, ভুট্টা ও গম প্রতি টন উৎপাদনে জিএইচজি নির্গমন হয়েছে ৫.৯, ১.৭৬ এবং ২.৭৫ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড ইকুইভেলেন্ট। উঁচু ভূমি ফসল বা ধান উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণা সেখানে পেয়েছে ১-১.৩ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড ইকুইভেলেন্ট, যা চীন বা অন্যান্য দেশে পাওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইড ইকুইভেলেন্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের চেয়ে কম। তবে চূড়ান্ত উপসংহার টানতে এই তথ্য-উপাত্ত পর্যাপ্ত নয়। চীন বিশ্বের উন্নত দেশের চেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রেডিয়াম গ্রুপ দ্বারা পরিচালিত একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে ২০১২ সালে চীন বিশ্বের গ্রিনহাউস গ্যাসের ২৬ শতাংশ নির্গমনের জন্য দায়ী ছিল (বিবিসি)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রেডিয়ামের মতে, যুক্তরাষ্ট্র হলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী বিশ্বের বৃহত্তম দেশ। দেশটি মোট গ্রিনহাউস গ্যাস ১১ শতাংশ নির্গত করে। মোট ৭.৮ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে বৈশ্বিক তালিকায় ভারত তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।

দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশের আবর্জনার ভাগাড় (ল্যান্ডফিল), ধানের ক্ষেত এবং অন্যান্য উৎস থেকে মিথেন নির্গমন বৈশ্বিক উষ্ণায়নে কেমন ভূমিকা রাখে তা মূল্যায়নের পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তবে মিথেনসহ অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে এই উৎসর ভূমিকা জানার জন্য এদের সংশ্লেষণ এবং নির্গমনের আসল তথ্য জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের যদি নিজস্ব তথ্য-উপাত্ত থাকে, তবে আমাদের ওপর আরোপিত দায় এড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য অভিযোগের যথাযথ উত্তর আমরা দিতে পারব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো ক্ষতিপূরণের জন্য দৃঢ়ভাবে দাবি জানাতে সক্ষম হব।

২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশ কোপেনহেগেন চুক্তির স্বাক্ষরকারী হয়েছে। অর্থনীতি ও শিল্পের ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি ও উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করার জন্য বাংলাদেশের আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও আর্থিক, প্রযুক্তিগত এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির সমর্থনে বিশ্বকে তাদের দায়িত্ববোধ প্রদর্শনের জন্য গ্রিনহাউস গ্যাস প্রশমনমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষিতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস করার পদক্ষেপ গ্রহণে অর্থনীতিতে তার ভূমিকা বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশে ২০০৫ থেকে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ সময়কালে দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষির অবদান ৯০ শতাংশেরও বেশি। দেশের মোট শ্রমবাজারের প্রায় ৫০ শতাংশ এবং গ্রামীণ জনপদের প্রায় ৭৫ শতাংশ কৃষিক্ষেত্রে নিযুক্ত রয়েছে, যখন প্রায় ৮৭ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার তাদের আয়ের ন্যূনতম একটা অংশের জন্য হলেও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ধান ছাড়াও অন্যান্য উঁচু ভূমির শস্যের জন্য সার, কীটনাশক ইত্যাদি জোগান অধিক পরিমাণে প্রয়োজন হয়, যা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী। ফসল ধারায় ফসল উৎপাদনে লাইফ সাইকেলভিত্তিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন নিরূপণ করলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হটস্পট এবং শস্য উৎপাদনের পর্যায় শনাক্ত করা যায়, যা নীতিনির্ধারক ও কৃষকদের গ্রিনহাউস গ্যাস এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন সম্ভাবনা (GWP) প্রশমন করতে বা সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিকল্প ফসল উৎপাদন পদ্ধতি বাছাই করতে সহায়তা করতে পারে।

WFP প্রাক্কলন করে দেখিয়েছে, ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ধানের উৎপাদন আরো ৪০ শতাংশ বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। ধান উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত গ্রিনহাউস গ্যাস (প্রধান প্রধান তিনটি) নির্গমন, প্রশমন প্রযুক্তি, ক্লাইমেট-স্মার্ট কৃষি পদ্ধতিতে ধান উৎপাদন ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা খুবই গুরুত্ব বহন করে। যদি আমাদের ভাগাড়গুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের উৎস হয়, তবে বর্জ্য ও স্যানিটারি ভাগাড় দুটিই সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, জৈব সার তৈরি, বায়োগ্যাস প্লান্ট নির্মাণ, বায়ো-স্নারি সার তৈরি ইত্যাদি বহুবিধ বিকল্প ব্যবহার। এভাবে সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনা করতে পারলে সারা বিশ্বের কাছে বরং বিকল্প ব্যবহারের দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। যাই হোক, এই উদ্দেশ্যে আমাদের সম্ভাব্য সব সেক্টরের সম্মিলিত তথ্যসহ একটি জাতীয় ডাটাবেইস তৈরি করতে হবে এবং তারপর বিভিন্ন উৎস থেকে নির্গত মোট জিএইচজি নির্গমনে অবদান নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এই তথ্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দ্বারা উল্লিখিত তথ্যের সত্যতা যাচাই করতেও ব্যবহার করা যেতে পারে (যেমন—ব্লুমবার্গ বা আইপিসি)। বাংলাদেশের বিভিন্ন ভাগাড়, ধান উৎপাদন এবং গ্যাস সরবরাহ পাইপলাইন ফাটলের মতো উৎস থেকে মোট এবং প্রকৃত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন, প্রশমন ও পূর্বাভাস আরো পরিমার্জন করার জন্য অসংখ্য স্টাডি পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন করে উৎপাদন বজায় রাখছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে দেশটি অদূর ভবিষ্যতে আরো সাফল্য দেখাবে। সে ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত পরিচর্চাগুলো বাংলাদেশে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন প্রশমন করতে পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে :

মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডসহ নন-কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনকে হ্রাস করে এমন কৃষিপদ্ধতি প্রবর্তন করা;

পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো পদ্ধতি (এডাব্লুইডি), ড্রিপ সেচে ধানের উৎপাদন, নালা চাষ পদ্ধতির এক নালাতে সেচ প্রদান; সেচ সময়সূচি বা পরিমাণ পুনর্নির্ধারণ;

উন্নত কর্ষণ পদ্ধতি (শুকনো অবস্থায় বা ভেজা অবস্থায় সরাসরি বীজ বপন, বিনা কাদাকরণে চাষ, যন্ত্রের মাধ্যমে রোপণ, যন্ত্রের মাধ্যমে সরাসরি ধানের চারা বপন ইত্যাদি); ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে ধরে রাখা;

ফসলের বৈচিত্রায়ণ (শস্যাবর্তন, আন্ত ফসল চাষ, মিশ্র ফসল চাষ);

নাইট্রোজেন সারের দক্ষ ব্যবহার [ইউরিয়া ব্রিকেট, ইউরিয়া-সালফার সার, যৌগিক সার, ইউরিয়া-অ্যামোনিয়াম সালফেট, অ্যাগ্রোটেইন-কোটযুক্ত ইউরিয়া এবং জৈব পলিইউরিথেন কোটযুক্ত ইউরিয়া]।

 লেখক : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মৃত্তিকা ইউনিট বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ঢাকা