kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৮। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৩ সফর ১৪৪৩

করোনাভাইরাসের যে রূপগুলো বিশ্ব কাঁপাচ্ছে

সাব্বির খান

২৪ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনাভাইরাসের যে রূপগুলো বিশ্ব কাঁপাচ্ছে

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) এবং ইউরোপীয় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ইসিডিসি) কভিড-১৯ পেনডামিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসের বিভিন্ন রূপ শনাক্ত করেছে, যা বর্তমানে উদ্বেগজনক এবং সেগুলোকে কড়া নজরে রাখা দরকার বলে মত দিয়েছে। ডাব্লিউএইচও ও ইসিডিসি করোনাভাইরাসের রূপগুলোকে মোট তিনটি বিভাগে ভাগ করেছে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক রূপগুলোর নাম দিয়েছে ভিওসি (Variants Of Concern), গবেষকদের বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করেছে যে রূপগুলো সেগুলোর নাম দিয়েছে ভিওআই (Variants Of Interest) এবং যে রূপগুলোকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে, সেগুলোকে ভিওএম (Variants Of Monitoring) নামে শ্রেণিবিভক্ত করেছে তারা। ভেরিয়েন্ট বা রূপগুলোর ভিন্ন ভিন্ন বিভাগ নির্ধারণ করতে তিনটি কারণ তারা উল্লেখ করেছে। প্রথমত রূপগুলোর সংক্রমণক্ষমতা কতটা তীব্র, দ্বিতীয়ত সংক্রমণের পর রূপগুলো রোগীকে গুরুতর অসুস্থতার দিকে ঠেলে দেয় কি না এবং তৃতীয়ত টিকা দেওয়ার পর দেহে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তা এড়াতে বা ডজ দেওয়ার ক্ষমতা রূপগুলোতে রয়েছে কি না।

ভিওসিভুক্ত যে চারটি রূপ বা ভেরিয়েন্ট গবেষকদের মনে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে সেগুলো হলো—আলফা, বিটা, গামা ও ডেল্টা। ভিওসিভুক্ত রূপগুলো গবেষকদের গবেষণায় পাওয়া ডাটা বা ফলাফলগুলো, যাতে সুস্পষ্ট ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবং মহামারিবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে যাকে সরাসরি ‘ভয়াবহ’ বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নর্ম অনুযায়ী একটি বিষয়কে প্রমাণ করার জন্য যে যে পরিমাণে ডাটার দরকার হয়, ভিওসিভুক্ত রূপগুলোতে তা পাওয়ার কারণেই গবেষকরা এই রূপগুলোর ব্যাপারে বিশ্বকে বিশেষভাবে সতর্ক করতে সচেষ্ট হয়েছেন। যেহেতু ভিওসিভুক্ত রূপগুলো মারাত্মকভাবে সংক্রামক, তাই তারা মানবদেহে গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে এবং ভ্যাকসিন দেওয়ার পর শরীরে তৈরি অ্যান্টিবডিগুলোকেও ডজ দিয়ে বা বাইপাস করে দেহে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

যে রূপগুলো সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের সৃষ্টি করছে—

আলফা (Alfa) : উৎপত্তিস্থল মূলত ব্রিটেন। এই ভেরিয়েন্টের সংক্রমণক্ষমতা অত্যন্ত বেশি এবং ব্রিটিশ গবেষকদের মতে, আলফা ভেরিয়েন্টে আক্রান্ত হলে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তবে ভ্যাকসিন গ্রহণ করার পর এই ভেরিয়েন্টটি অধিকতর সংক্রমণ করতে পারে না। অদ্যাবধি করোনাভাইরাসের আলফা রূপটি ব্রিটেনেই সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে এবং সবচেয়ে বেশি মানুষকে সংক্রমিত করে মৃতের সংখ্যা বাড়িয়েছে।

বিটা (Beta) : উৎপত্তিস্থল দক্ষিণ আফ্রিকায়। এই ভেরিয়েন্টে সংক্রমণের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি এবং সংক্রমণের পর রোগীকে অতি দ্রুত মারাত্মক অসুস্থতার দিকে ধাবিত করে। এই ভেরিয়েন্ট ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ গ্রহণের পর তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডিকে দুর্বল করতে সক্ষম হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ গ্রহণের পর গুরুতর অসুস্থতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এই ভেরিয়েন্টটি ইউরোপের প্রায় সব দেশেই মারাত্মকভাবে ছড়িয়েছে।

গামা (Gama) : উৎপত্তিস্থল ব্রাজিল। সংক্রমণের দিক দিয়ে এই ভেরিয়েন্টটি অত্যন্ত মারাত্মক। তবে গবেষণায় দেখা যায়, ভ্যাকসিন গ্রহণের পর গুরুতর অসুস্থ রোগীর দেহে যথেষ্ট ভালো সুরক্ষা প্রদান করতে সক্ষম হচ্ছে। এই ভেরিয়েন্টটিও ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে অন্যান্য ভেরিয়েন্টের পাশাপাশি সমানতালে ছড়িয়েছে।

ডেল্টা (Delta) :  উৎপত্তিস্থল ভারত। এই ভেরিয়েন্টের সংক্রমণক্ষমতা অন্য যেকোনো ভেরিয়েন্ট থেকে অনেক বেশি এবং গবেষণায় দেখা যায়, ডেল্টা ভেরিয়েন্টে আক্রান্ত হলে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। প্রথম ডোজে ভ্যাকসিনের প্রভাব দুর্বল হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণের পর গুরুতর অসুস্থতার বিরুদ্ধে বেশ ভালো সুরক্ষা প্রদান করতে সক্ষম হয়। এই ভেরিয়েন্টটি বর্তমানে ইউরোপের প্রায় সব দেশেই মারাত্মকভাবে ছড়াচ্ছে এবং তাদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম অঞ্চলের সাপ্তাহিক প্রতিবেদনে জানা যায়, গত এক সপ্তাহে ডেল্টা ভেরিয়েন্টে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

যে রূপগুলোর দিকে এখন সার্বক্ষণিক নজর রাখতে হচ্ছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক।

এটা (Eta) : উৎপত্তিস্থল নাইজেরিয়া। এই ভেরিয়েন্টের দ্বারা সংক্রমণের ঝুঁকির পরিমাণ কেমন এবং সংক্রমণের পর রোগীর অসুস্থতা ঝুঁকি বৃদ্ধির ব্যাপারেও গবেষকরা নিশ্চিত নন। তবে সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভ্যাকসিন গ্রহণের পর গুরুতর অসুস্থতা থেকে রক্ষা পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এই ভেরিয়েন্টটিও ইউরোপে যথেষ্ট পরিমাণে ছড়িয়েছে বলে জানা যায়।

এপসিলন (Epsilon) : উৎপত্তিস্থল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি এবং গুরুতর ঝুঁকির ব্যাপারে গবেষকরা নিশ্চিত নন। তবে ভ্যাকসিন গ্রহণের পর গুরুতর অসুস্থ রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। ইউরোপ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণকারীরাই এই ভেরিয়েন্টে বেশি সংক্রমিত হয়েছে বলে জানা যায়।

থেটা (Theta) : উৎপত্তিস্থল ফিলিপাইন। এই ভেরিয়েন্টে সংক্রমণের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। তবে সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থতা বৃদ্ধির ব্যাপারে গবেষকরা নিশ্চিত নন। ভ্যাকসিন গ্রহণে অসুস্থতা থেকে রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন গবেষকরা। ইউরোপে এই ভেরিয়েন্ট মূলত তারা বেশি ছড়িয়েছে, যারা ফিলিপাইনে ভ্রমণ করেছে। তবে ফ্রান্সে ছড়িয়েছে সবচেয়ে বেশি।

কপ্পা (Kappa) : উৎপত্তিস্থল ভারত। এই ভেরিয়েন্টটি যথেষ্ট সংক্রামক হলেও এর দ্বারা অসুস্থতার ঝুঁকির ব্যাপারটি স্পষ্ট নয়। তবে ভ্যাকসিন গ্রহণের পর এই ভেরিয়েন্ট থেকে রক্ষা পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। খুব বেশি না ছড়ালেও ইউরোপের কিছু জায়গায় এই ভেরিয়েন্টের নজির দেখা গেছে। কিছু ভেরিয়েন্টের ওপর আরো অধিক গবেষণা প্রয়োজন। ভিওএম হচ্ছে সেই রূপগুলো, যেগুলোর প্রাথমিক গবেষণা এবং ভেরিয়েন্টের জিন-সিকোয়েন্সগুলো সংক্রামকতা বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করে। এ ছাড়া ভ্যাকসিন গ্রহণের পর তৈরি দেহের অ্যান্টিবডি থেকে বাঁচার সক্ষমতা এই ভেরিয়েন্টগুলোর রয়েছে কি না তা-ও গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে। তবে অদ্যাবধি পাওয়া গবেষণার ফলগুলো অনিশ্চিত। ডাব্লিউএইচও ও ইসিডিসির বক্তব্য অনুসারে এই রূপগুলোকে অবহেলা না করে অবশ্যই নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত বলে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।

ভিওএম ক্যাটাগরিতে এখন পর্যন্ত পাওয়া মোট ২২টি রূপ রয়েছে, যার মধ্যে তিনটির নাম যথাক্রমে ডাব্লিউএইচওর তালিকা অনুসারে করা হয়েছে লাম্বডা (Lambda), যার উৎপত্তিস্থল পেরুতে; আইওতার (Iota) উৎপত্তিস্থল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং জেটার (Zeta) উৎপত্তিস্থল ব্রাজিলে। প্রাথমিক গবেষণা অনুসারে, এই ভাইরাসগুলোর ১৭টির মধ্যে ভ্যাকসিনেশন থেকে তৈরি দেহের অ্যান্টিবডিকে এড়িয়ে যাওয়ার নির্দিষ্ট ক্ষমতা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 লেখক : কালের কণ্ঠ’র স্ক্যান্ডিনেভিয়া প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা