kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

করোনা নিয়ন্ত্রণ ও কোরবানির ঈদ

ডা. কামরুল হাসান খান

২০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনা নিয়ন্ত্রণ ও কোরবানির ঈদ

আবার এসেছে মুসলমানদের পবিত্র ঈদুল আজহা। স্বাভাবিকভাবেই ত্যাগের মহিমা পূরণ করতে কোরবানি দিতে চাইবে। ঈদ উদযাপন এ দেশের মানুষ মা-বাবা, পরিজনের সঙ্গে উৎসবমুখর পরিবেশে করে অভ্যস্ত। কিন্তু করোনা সংক্রমণ এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঈদ উদযাপনে আমাদের এবার বাস্তব পরিকল্পনা নিতে হবে কিভাবে প্রিয়জনদের করোনা থেকে নিরাপদ রেখে পালন করা যায়। উৎসব করতে গিয়ে প্রিয়জনদের যেন আমরা মৃত্যুর মুখে ঠেলে না দিই। কোরবানির ঈদ আমাদের ত্যাগের মহিমা শিখিয়েছে। সেই ত্যাগ এবার আমাদের মানুষকে বাঁচানোর জন্য ব্যবহার করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হবে, আমরা ঈদ উদযাপনও করব আবার সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজেকে এবং প্রিয়জনকে নিরাপদ রাখব। সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বগতি এবং মৃত্যুর যে দীর্ঘ মিছিল চলছে, তাতে আমাদের কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। পবিত্র ঈদ পালনে ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে তাদের গোটা দেশের ইমামদের দিয়ে পুরো পরিস্থিতির দায়িত্ব নিতে হবে, নেতৃত্ব দিতে হবে এবং পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সব বিবেচনায় তাদের বাস্তবধর্মীয় নির্দেশনা দিতে হবে। সরকারি-বেসরকারিভাবে অনলাইনে পশু কেনাকাটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় সৌদি সরকার পবিত্র হজ নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য হয়েছে। ঈদ ঘিরে যেন আবার অবাধ যাতায়াত এবং স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে নতুন করে সংক্রমণ বাড়িয়ে না দিই। অবাধ যাতায়াত এবং স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করলে সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়—এটা প্রমাণিত।

এমন মহামারি পৃথিবীতে আর আসেনি, যেখানে ২২২ দেশ-অঞ্চল আক্রান্ত হয়েছে। এখন শিশু-বৃদ্ধ-ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে আক্রান্ত হচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামের পর গ্রাম। অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে করোনার গতিবিধি এবং মানুষের ভবিষ্যৎ। ঈদ উপলক্ষে লকডাউন শিথিল করায় ঢাকা শহরের সড়কে চিরচেনা যানজট। ফুটপাত, অলিগলি থেকে অভিজাত শপিং মল ও পাঁচতারা হোটেল—সর্বত্রই মানুষের সরব উপস্থিতি। ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর পশুর হাটগুলোতেও উপচে পড়া ভিড়। গ্রামমুখী গাড়ির চাপে মহাসড়কে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট। কোথাও সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না। স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে মাস্কও পরছে না বেশির ভাগ মানুষ।

বিপরীতে দেশে করোনা শনাক্তের হার বাড়ছে। প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকা।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার না কমলে সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও আইসিইউ সংকট আরো তীব্র হবে বলে সতর্ক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এভাবে সংক্রমণ বাড়তে থাকলে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য। আবার বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস বেসামাল হয়ে উঠছে। ডেল্টা ভাইরাস ১১১ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ভারতসহ অনেক দেশে। জাপানে চলছে করোনার তৃতীয় ঢেউ, অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ২৩ জুলাইয়ের বিশ্ব অলিম্পিক। করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে অনেকটা ভেঙে পড়েছে গোটা বিশ্বের চিকিৎসাব্যবস্থা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, ‘বিশ্বে করোনার ডেল্টা স্ট্রেন ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে।’ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনার তৃতীয় ঢেউ আগস্ট মাসেই শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতি আমাদের সর্বাত্মক, সম্মিলিত এবং সমন্বিতভাবে মোকাবেলা করতে হবে। জীবন বাঁচাতে আমাদের ত্যাগ-কষ্ট স্বীকার এবং ধৈর্য ধারণ করতে হবে।

এহেন পরিস্থিতিতে নিজেকে, নিজের পরিবারকে, দেশকে করোনাভাইরাসের ভয়ংকর থাবা থেকে মুক্ত রাখতে আমাদের কিছু নিয়ম অবশ্যই মেনে চলতে হবে। শহর থেকে গ্রামে সর্বত্র জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী, স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বত্র স্বাস্থ্যবিধি মানার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে। যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে অনুমতি সাপেক্ষে জরুরি প্রয়োজনে বাড়ি যেতে হলে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এ জন্য ভেঙে ভেঙে যাওয়ার চেয়ে দূরপাল্লার গাড়ি বেশি স্বাস্থ্যবিধিবান্ধব। ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন সারা দেশে ইমাম-আলেমদের সমন্বয়ে ঈদের যাবতীয় রীতিনীতি নির্দিষ্ট নির্দেশনার মাধ্যমে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করবে। তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের সহযোগিতা নেবে। নিজেকে এবং নিজের প্রিয়জনদের নিরাপদ রাখতে আমরা যেন অনলাইনে পশু কেনাকাটার সুযোগটি ব্যবহার করি। বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে সামাজিক নেতৃত্বে পশু কোরবানি এবং মাংস বণ্টনের এক চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। সামাজিক নেতাদের দায়িত্ব দিলে তাঁরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে ঘরে সুষ্ঠুভাবে মাংস পৌঁছে দেবেন। করোনা পরীক্ষার হার বাড়াতে হবে, মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পজিটিভ হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে বিচ্ছিন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে সে সমাজে ছড়াতে না পারে। হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভর্তিযোগ্য রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে নতুন সংকট সৃষ্টি হবে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে হবে, প্রয়োজনে ফিল্ড হাসপাতালের প্রস্তুতি থাকতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বিত্তবান মানুষকে দরিদ্র মানুষের পাশে অর্থ ও খাদ্য সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সাধারণ মানুষকে নিরন্তর সাহস জোগাতে হবে, উদ্বুদ্ধ করতে হবে, করোনা নিয়ন্ত্রণে উৎসাহ দিতে হবে, পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

এই ঈদ ঘিরে যেন বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের উত্তাল ঢেউ না ওঠে সে জন্য আমাদের সবাইকে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। নইলে এক অসহায় ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়