kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

আফগানিস্তানে বিপর্যয় এড়ানোর উপায় খুঁজতে হবে

এমা গ্রাহাম-হ্যারিসন

১৭ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নার্গিস ও হাসিনা। ১৫ বছর বয়সী দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে সম্প্রতি কাবুলে আমার দেখা। নার্গিস আমাকে গণিতে ডিগ্রি অর্জনের স্বপ্নের কথা বলেছিল। আর হাসিনা একটি পেইন্টিং উপহার দিয়েছিল, যাতে একটি মেয়ে ভোরের আকাশের আবছা বেগুনি রঙের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল এবং তার মাথার ওপর দিয়ে একটি জ্বলন্ত উল্কা উড়ে যাচ্ছিল। জীবনের শুরুটা সামনে রেখে তাদের মধ্যে কিশোর বয়সের চঞ্চল ও লাজুক উদ্দীপনা দেখা গেছে। কিন্তু চিন্তার বিষয় হচ্ছে, তাদের অনেক আত্মীয়-স্বজনই সাম্প্রতিককালে তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া এলাকায় বসবাস করছে। তাই আমি যখন নার্গিস ও হাসিনার কাছ থেকে চলে আসি, তখন তাদের এক খালা আমাকে চাপা স্বরে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তাহলে আপনি কি মনে করেন, কাবুল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে?’

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জঙ্গিরা পুরো আফগানিস্তানে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা একসময়ের তালেবানবিরোধী দুর্গসহ বিভিন্ন এলাকা দখল করে নিচ্ছে এবং প্রধান প্রধান শহর অবরোধ করছে। তালেবান কমান্ডাররা এরই মধ্যে সেখানকার মেয়েদের স্কুলে যেতে নিষেধ করছে। তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নারীদের ব্যভিচারের জন্য চাবুক মারা হয়। নারী-পুরুষের বিবাহবহির্ভূত সব ধরনের কাজকেই ‘ব্যভিচার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আমি একজন বিশিষ্ট আমেরিকান বিশেষজ্ঞের লেখা পড়ছিলাম, যাতে তালেবানের বিদ্যুদ্গতিতে অগ্রসর হওয়ার মধ্যেই আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারকে আফগানদের দীর্ঘমেয়াদি নিজস্ব স্থিতিশীলতার একটি সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটা পড়তে গিয়ে আমি নার্গিস ও হাসিনার কথা ভাবছিলাম। আমি তখনো তাদের ও আফগান বন্ধুদের কথা ভাবছিলাম, যখন আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ মানবিক বিপর্যয় নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে জো বাইডেন সাংবাদিকদের প্রতি বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন যে তিনি এর চেয়ে মজার কোনো বিষয় নিয়েই কথা বলতে চান। আসলে আফগানিস্তানবিষয়ক আলোচনা এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদাসীনতা কাজ করছে, যা মারাত্মক বিভ্রান্তিকর।

তালেবানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যেই আফগানিস্তান ত্যাগের তাড়াহুড়ায় মানবিক বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে তা দায়িত্বজ্ঞানহীন হিসেবেও প্রমাণিত হতে পারে। মনে রাখতে হবে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পশ্চাদপসরণের পর যে নির্মম গৃহযুদ্ধের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটাই তালেবানের জন্ম দিতে সহায়তা করেছিল।

২০০১ সাল থেকে আফগান যুদ্ধ পরিচালনাকারী অনেক জেনারেল ও রাজনীতিবিদ ইতিহাস পাঠের প্রতি বিস্ময়কর অবহেলা দেখিয়েছেন। দুই দশক আগে দ্রুত পরাজয়ের মুখে তালেবান আলোচনা করতে চেয়েছিল। অথচ মার্কিন বিশেষ বাহিনী তার পুরনো শত্রুদের সঙ্গেই জোট বেঁধে তাদেরকে উত্খাত করেছিল। ফলে যে প্রক্রিয়াজুড়ে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে তা আফগান ও পশ্চিমাদের পকেটে—এককাতারেই দাঁড়িয়ে আছে। সমস্যা হচ্ছে, যেসব যুদ্ধবাজ মূলত তালেবানকে উত্খাত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছিল, পরে তাদেরই ক্ষমতায় শক্তভাবে বসানো হয়েছিল। ফলে যেসব তরুণ কমান্ডারের নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অতীত রেকর্ড ছিল, আমেরিকানরা তাদের ওপরই নির্ভর করে এবং তাদেরই উৎসাহিত করে। কারণ তাদেরই কার্যকর মনে করা হয়েছিল। ফলে মানবাধিকারগোষ্ঠীগুলোর সতর্কবাণী ছিল যে এই সহিংসতা কেবল চক্রাকারে গৃহযুদ্ধকেই উসকে দিয়েছে।

গত দুই দশকে কাবুল ও অন্যান্য প্রধান শহরে অপেক্ষাকৃত শান্তি ও স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে এবং একটি প্রজন্ম বড় হয়েছে, নিজেদের শিক্ষিত করেছে, পরিবার ও ব্যবসা গড়ে তুলেছে এবং উন্নত জীবনের জন্য লড়াই করেছে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আফগান নাগরিকের বয়স ২৫ বছরের কম। তাই তালেবানের চরমপন্থী মতাদর্শ পুরো দেশকে নিয়ন্ত্রণ করত—সেই বছরগুলো তারা কখনো অনুভব করেনি বা মনে করতে পারে না। এখন তালেবান যখন চারদিক ঘিরে ফেলছে, তখন অন্যান্য দেশের আমরা যারা সাধারণ আফগান নারীদের সংগ্রামকে সমর্থন করি, তাদের অবশ্যই আফগান নারীদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এ বিষয়ে তার কূটনৈতিক মূলধন ব্যবহার করার জন্য যথেষ্ট যত্নবান হয়, তাহলে এখনো এর সুযোগ রয়েছে।

লেখিকা : ২০০৯ সাল থেকে আফগানিস্তানে কর্মরত সাংবাদিক

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : আফছার আহমেদ