kalerkantho

শুক্রবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৮। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৬ সফর ১৪৪৩

শুক্র গ্রহে আবিষ্কৃত ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপ

ড. এ কে এম খোরশেদ আলম

২ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শুক্র গ্রহে আবিষ্কৃত ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপ

শুক্র গ্রহ পৃথিবী সম্পর্কিত বা টেরেস্ট্রিয়াল চারটি গ্রহের অন্যতম একটি গ্রহ—আয়তন, ভর ও ঘনত্ব বিচারে গ্রহটি পৃথিবীর কাছাকাছি এবং নিকটতম প্রতিবেশী। সূর্য ও চাঁদের পরেই উজ্জ্বলতম হওয়ায় প্রাচীনকালে শুক্রকে সন্ধ্যা ও ভোরের তারা বলা হতো এবং গ্রিক ও রোমানদের কাছে গ্রহটি ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের দেবী হিসেবে অভিহিত হতো। শুক্র গ্রহ গ্যালিলিওর আগে আবিষ্কৃত হলেও তিনি প্রথম এটাকে গ্রহ বলে বুঝতে পারেন। ঘন মেঘ দ্বারা গ্রহটি আচ্ছাদিত, যা সূর্যের আলো তীব্রভাবে প্রতিফলিত করে। এই গ্রহের বায়ুমণ্ডল কার্বন ডাই-অক্সাইড ও সালফিউরিক এসিড দিয়ে গঠিত এবং পৃষ্ঠস্থ তাপমাত্রা ৪৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশি, যা সিসাকে গলিয়ে ফেলতে যথেষ্ট। কিন্তু শুক্র গ্রহে সব সময় এমন প্রতিকূল আবহাওয়া ছিল না। বিজ্ঞানীদের ধারণা, আদিতে শুক্র গ্রহের অবস্থা প্রায় পৃথিবীর মতো ছিল, পরে যা বদলে যায়; কিন্তু কেন? চরম বৈরী পরিবেশের কারণে গ্রহ সম্পর্কীয় অনুসন্ধান মিশন পরিচালনায় বাধা হয়ে দাঁড়ালেও বিজ্ঞানীদের জানার আগ্রহ থেমে নেই। যাই হোক, আগের মহাকাশ মিশনগুলো থেকে এক হাজার ৬০০ বড় মাপের আগ্নেয়গিরি, পর্বত, বড় উঁচু ভূখণ্ড এবং বিস্তৃত লাভা ভূমি অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা গেছে।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যানেটারি বিজ্ঞান বিভাগের পল কে বাইরনে ও তাঁর দলের বিজ্ঞানীরা কয়েক দশকের রাডার ইমেজ ব্যাখ্যা করে সম্প্রতি শুক্র গ্রহের উপরিভাগ ও অভ্যন্তর ভাগের মিথস্ক্রিয়ার প্রমাণ পেয়েছেন। এই ভূতাত্ত্বিক গবেষণার ফলাফল বিস্তারিতভাবে জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমির কার্যবিবরণীতে ২১ জুন ২০২১ প্রকাশিত হয়েছে, সংক্ষেপে এখানে আলোচনা করা হলো। শুক্র গ্রহের ভূত্বক বা ক্রাস্ট অনেক অংশে বিভক্ত, যা বহুলাংশে ভঙ্গুর এবং ধাক্কাধাক্কি করে ও সরে যায়— ভূ-আচ্ছাদন বা ম্যান্টেলের (ভূত্বকের নিচে যার অবস্থান) ধীর মন্থন এ জন্য দায়ী। ভূত্বকের টুকরাগুলো পাশাপাশি সরে যাওয়ার প্রমাণ আছে ভূমিরূপের অনেক বলয়ে।

শুক্র গ্রহের টেকটোনিক ভূমিরূপের অতি প্রাচুর্যতার বিষয়টি প্ল্যানেটারি বিজ্ঞানীদের কাছে অনেক আগে থেকেই জানা। কতকগুলো দীর্ঘ ও সরু যেখানে ভূত্বক (ক্রাস্ট) ধাক্কা দিয়ে উচ্চভূমিরেখা (রিজ) অথবা টেনে নিয়ে খাদ (ট্রাফ) ও খাঁজ (গ্রুভ) তৈরি করে। তবে নতুন এই গবেষণায় উচ্চভূমিরেখা ও খাদের এসব বলয়ে নিচু ও সমতল এলাকার সীমানা চিহ্নিত করার ব্যাপারটি প্রথমবারের মতো জানা গেছে, যদিও নিজের অল্প বিকৃতি বা অস্বাভাবিকতা প্রদর্শন করেছে। শুক্র গ্রহের ভূত্বকের পৃথক টুকরাগুলো সময়ের সঙ্গে স্থানচ্যুত হয়েছে, আবর্তিত হয়েছে ও পিছলে গেছে—হয়তো বা সাম্প্রতিককালে এমনটা ঘটেছে। এর সঙ্গে পৃথিবীর প্লেট টেকটোনিকসের কিছুটা মিল থাকলেও কিন্তু ছোট পরিসরের, তবে সমুদ্রে ভাসমান বৃহদাকার তুষারখণ্ডের সঙ্গে অনেকটা মিলে যায়। গবেষকদের ধারণা, পৃথিবীর ভূ-আচ্ছাদনের বা ম্যান্টেলের মতো শুক্র গ্রহের ভূ-আচ্ছাদন নিচের তাপের কারণে ঘুরপাক খায়। সাম্প্রতিক সময়ে এ গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে এই গ্রহের ভূ-আচ্ছাদন যথেষ্ট শক্তিমান, যা ওপরের ভূত্বককে টুকরা টুকরা করতে সক্ষম।

শুক্র গ্রহ বিষয়ে একটা বড় প্রশ্ন এই যে গ্রহটিতে কী জীবন্ত আগ্নেয়গিরি আছে এবং টেকটোনিক চ্যুতি বা ফল্ট আছে? গ্রহটি মূলত পৃথিবীর সমান আয়তনের—কাজেই ভূতাত্ত্বিকভাবে তা সক্রিয় না থাকার কথা নয়। কিন্তু শুক্র গ্রহে কোনো মিশনই চূড়ান্ত বিচারে এখন পর্যন্ত গ্রহটির সক্রিয়তার কিছু দেখায়নি। টেকটোনিক সক্রিয়তার বিষয়টিও শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে মনে করা হয় যে আগ্নেয়গিরির উদগিরণ ভূতাত্ত্বিকভাবে সাম্প্রতিককালে হয়েছে। গ্রহটির ভূ-আচ্ছাদনের উপাদান, কোথায় ও কিভাবে আগ্নেয়গিরি সক্রিয় হতে পারে এবং কিভাবে ভূত্বক তৈরি হয়েছে, ধ্বংসপ্রাপ্ত ও স্থানচ্যুত হয়েছে ইত্যাদি বিষয় বুঝতে শুক্র গ্রহের ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই গবেষণা বলছে, ধাক্কাগুলোর কতক ঘটেছে ভূতাত্ত্বিকভাবে সম্প্রতি, যা বাস্তবে শুক্র গ্রহের সক্রিয়তা বোঝার ক্ষেত্রে একধাপ এগিয়ে যাওয়া। ভূত্বকের টুকরাগুলো কেমন বিস্তৃত তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এখনো অজানা যে কখন এই ভূত্বকের টুকরাগুলো সৃষ্টি হয়েছে বা কত দিন ধরে তারা নড়ছে। ভূত্বক খণ্ডকরণ ও ধাক্কা কখন হয়েছে তা নির্ণয় অত্যাবশ্যক—বিশেষত যদি প্ল্যানেটারি গবেষকরা এ ঘটনার সঙ্গে গ্রহটির আগ্নেয়গিরির ধারণাকৃত সাম্প্রতিক কার্যকলাপ বুঝতে চান। এসব খুঁজে পাওয়া সম্ভব হলে গ্রহপৃষ্ঠের অবয়ব কিভাবে অভ্যন্তরের ভূতাত্ত্বিক গণ্ডগোলগুলো প্রকাশ করে সে ব্যাপারে বিশেষ প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাবে।

লেখক : গবেষক, ভূতত্ত্ববিদ

[email protected]



সাতদিনের সেরা