kalerkantho

সোমবার । ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২ আগস্ট ২০২১। ২২ জিলহজ ১৪৪২

জি৭ সম্মেলন এবং বিশ্বে টিকার চাহিদা

গর্ডন ব্রাউন

১৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ইতিহাস হচ্ছে একটা মিসড অপরচুনিটির গল্প। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যখন ১৯৩৮ সালে ইভিয়ানে মিলিত হলো তখন নাৎসি বাহিনীর স্পষ্ট অ্যান্টিসেমিটিজম সংক্রান্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ছিল এবং হলোকস্টের আশঙ্কাও ছিল। তখন তারা সত্যের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসেছিল।

১৯৯০ সালে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটল, তখন জার্মানি ফোকাস করল জার্মান পুরেকত্রীকরণের বিষয়ে। ফ্রান্স মনোযোগ দিল ইউরোপিয়ান ইউনিফিকেশনের বিষয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্র ব্যস্ত হলো ন্যাটোকে একসঙ্গে রাখার কাজে—সম্মেলনের পর সম্মেলন গেল, তারা বড় বিষয়গুলোকে দেখতেই পেল না; তারা ব্যস্ত হলো রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক কমিউনিটিতে ইন্টিগ্রেট করতে।

২০০৯ সালের অর্থিক সংকটে একটা সুযোগ এসেছিল—একটা রিসেশনকে ডিপ্রেশনে পরিণত হওয়া থেকে থামানোর; কিন্তু ইকোনমিক ডিসিশন মেকিংয়ের ভঙ্গুর আন্তর্জাতিক কাঠামো পুনর্গঠন করায় ব্যর্থতা সরাসরি আমেরিকা ফার্স্ট, চায়না ফার্স্ট, ইন্ডিয়া ফার্স্ট, রাশিয়া ফার্স্টের সংরক্ষণবাদিতার দিকে নিয়ে গেল।

এখন ২০২১ সালে মনে হচ্ছে, জি৭ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। কারণ আরেকটি টার্নিং পয়েন্ট এসে উপস্থিত, কিন্তু সেখানে ইতিহাস ঘুরে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আয়োজনের (জি৭ সম্মেলন) পরে হ্যান্ডশেক, ফটোকলস, কমিউনিক প্রভৃতি স্মৃতি থেকে বিদূরিত হয়ে যাচ্ছে; এটাকে শুধু স্মরণ করা হবে একটা কারণে—বরিস জনসন সম্মেলনের আগে সারা বিশ্বকে ভ্যাকসিনেটেড করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতিকে সম্মান জানাতে ব্যর্থতার জন্য এটাকে স্মরণ করা হবে। এখন প্রতি তিন মাসে ১০ লাখ জীবনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে কভিড-১৯।

অন্যূন ১১ বিলিয়ন ভ্যাকসিন লাগবে প্রতিটি দেশকে কভিড-১৯ প্রটেকশনের ওয়েস্টের লেভেলে তুলে আনা নিশ্চিত করতে। ওই ধরনের বিশ্বব্যাপী কাভারেজ ছাড়া এই রোগটির বিস্তার অব্যাহত থাকবে, মিউটেশন ঘটবে এবং এটার প্রত্যাবর্তন ঘটবে যারা টিকা নিয়েছে তাদেরও হুমকিগ্রস্ত করতে। এটা অনস্বীকার্য বিষয় যে আমাদের সবাইকে ভীতির মধ্যে বাস করতে হবে যতক্ষণ না আর কেউ ভীতির মধ্যে বাস করে (until no one lives in fear) । কাজেই টিকার জোগান দেওয়া শুধু একটা স্পষ্টীকরণের বিষয় নয়; এটা সেলফ প্রটেকশনের একটা ধরন, হয়তো এটা বিশ্বের বেস্ট ইনস্যুরেন্স পলিসি।

সাব-সাহারান আফ্রিকার ১ শতাংশের কম লোক পুরোপুরি ভ্যাকসিনেটেড হয়েছে। আফ্রিকার জনসংখ্যা ১৩০ কোটি, মোটের ওপর সেখানকার লোকজন চার কোটি ১০ লাখ টিকা (অর্ডার দেওয়া হয়েছিল আড়াই শ কোটি ডোজ টিকা) নিয়েছে। বর্তমানে টিকা গ্রহণের যে হার সেখানে চলছে, ইউনিসেফের মতে, তাতে ২০২৪ সাল লেগে যাবে ওয়েস্টার্ন লেভেলে ভ্যাকসিনেটেড হতে, তা-ও যদি হয়।

ধনী দেশগুলো গরিব দেশগুলোকে ১০০ কোটি ডোজ টিকা দেবে, এটা খবরের শিরোনাম হওয়ার মতো বিষয় এবং স্বাগত জানানোর মতো বিষয়। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হবে না। এর পরও শত শত কোটি ডোজ টিকার ঘাটতি রয়ে যাবে। বরিস জনসন টিকা সমস্যাকে ‘দ্য গ্রেটেস্ট চ্যালেঞ্জ অব দ্য পোস্টওয়ার এরা’ আখ্যায়িত করেছেন; কিন্তু এর ব্যাপারে সঠিক জবাব পাওয়া যায় না টিকা-সরবরাহ-পরিস্থিতি থেকে। আমাদের এই বিশ্বের জন্য তা-ই করতে হবে, যা ব্রিটেন করেছে নিজের জন্য। এর জন্য নিশ্চিতভাবেই জি৭-এর ফান্ডিং লাগবে। প্রকারান্তরে এ তহবিলই বিশ্বের প্রতিটি কোনায় নতুন ম্যানুফ্যাকচারিং ক্যাপাসিটি জেনারেট করবে।

নেতাদের সামনে একটা কমপ্রিহেনসিভ ডেলিভারি প্ল্যান হাজির ছিল। এ প্ল্যান তৈরি করেছিল এসিটি-অ্যাকসেলারেটর; এটি কোভ্যাক্সের মাধ্যমে ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য গড়ে উঠেছে, নরওয়ে ও দক্ষিণ আফ্রিকা কর্তৃক প্রস্তাবিত। এর অধীনে জি৭ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা মোট খরচের দুই-তৃতীয়াংশ বহন করবে।

জি৭ নেতাদের অবহিত করা হয়েছিল যে এ পরিমাণের মাত্র অর্ধেক (৩৩ শ কোটি ডলার) জরুরি ভিত্তিতে দরকার ভ্যাকসিন টেস্টিং এবং ভ্যাকসিনকে সুরক্ষিত রাখার সরঞ্জামের জন্য। এ বছর এ পরিমাণ লাগবে। মোটামুটি প্রায় একই পরিমাণ লাগবে ২০২২ সালে। অথচ তারা ভ্যাকসিন বাবদ মাত্র ৭০০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।

তাত্ক্ষণিক জরুরিত্বের বিষয়টি তারা সমাধান করল না। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১০ শতাংশের ভ্যাকসিনেশনের জন্য আফ্রিকার ২২৫ মিলিয়ন ডোজ টিকা এখনই দরকার। সম্প্রতি আফ্রিকায় সংক্রমণ ২৫ শতাংশ বেড়েছে; কিন্তু ব্রিটেন মাত্র ৫০ লাখ ডোজ দিতে সক্ষম, তা-ও সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ; অর্থাৎ প্রয়োজনীয় ডোজের মাত্র ২ শতাংশ। মার্কিন টিকা পৌঁছাতে সময় লাগবে; এর ফলে সেখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরা অরক্ষিত থেকে যাবে; তারা জীবনের হুমকিতে রয়েছে, অথচ তাদের ওপর অনেক প্রাণ নির্ভরশীল।

১০০ গরিব দেশের টিকার চাহিদার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। তারা টেম্পোরারি ভ্যাকসিন-ওয়েইভার দাবি করেছিল, এর ফলে তাদের হাতে টিকাপ্রযুক্তি পৌঁছাত। আরো একটি বিষয়ে জি৭ সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। সেটা হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে টাকা তোলা বিষয়ক—পরিমাণে তা ১০০ কোটি ডলার; নিম্ন আয়ের দেশগুলোর সহায়তার জন্য। ক্যাম্পেইনাররা এখন দাবি তুলবে, অক্টোবরে জি২০ সম্মেলনে যেন তেমন পদক্ষেপ নেওয়া হয় জুনের সম্মেলনে যে পদক্ষেপ নিতে জি৭ ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের ধনীতম দেশগুলো যদি এবারের মতো একই টেবিলে বসে থাকে, তাহলে তারা বেশি কিছু দিতে পারবে না। ইতিহাস কিন্তু বর্তমান নেতাদের অনেক বেশি কঠোরভাবে বিবেচনা করবে।

 

লেখক : যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান ইউকে

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক



সাতদিনের সেরা