kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

কী ছিলেন আর কী হলেন!

মোস্তফা মামুন

১৭ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কী ছিলেন আর কী হলেন!

‘ইনি কে?’

‘উনি সম্মানিত এমপি।’

‘এমপি কী?’

‘এমপি মানে... আরে বুঝতে পারছ না... বিরাট ব্যাপার।’

খুব বিরাট ব্যাপার বলে অবশ্য মনে হলো না। সাদামাটা চেহারার একজন মানুষ। মধ্যবয়সী মধ্যবিত্ত ধরনের মানুষের মুখ যেমন হয় আর কি। তখনকার সময় গোঁফ রাখা ছিল যুবকদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতা, প্রচলিত ধরনের পুরু গোঁফের সঙ্গে একটা টাকও আছে। সাধারণ পায়জামা-পাঞ্জাবি আর বাটার স্যান্ডেল মিলিয়ে বিশেষত্ব নেই বিশেষ। কিন্তু লোকটাকে সবাই খুব মর্যাদা দিচ্ছে। পাশে পুলিশের পোশাক পরা একজন, আর তখন এমপিকে না চেনা বয়সে পুলিশই আমাদের কাছে সবচেয়ে ক্ষমতাধর-ভীতিকর ও গুরুতর মানুষ। এর চেয়েও এই সাধারণ মানুষটাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়াকে খুব বেমানান লাগছিল বলেই প্রশ্নটা করা। সেটা এরশাদ সরকারের আমল। তখন কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এমপিরা এ রকমই ছিলেন। সাদামাটা। সহজলভ্য। আমি একজন এমপিকে সেই সময় সাইকেলের পেছনে ডাবল ক্যারি করে চড়তে দেখেছি। আরেকজনকে এক দিন দেখলাম, রাস্তার মুড়ি-চানাচুর কিনে খাচ্ছেন। তাতে লবণ বা মরিচ কিছু একটা কম দেওয়ায় আবার চেয়ে নিলেন।

এবার আরেকটা কাহিনি। এটা মাত্র কয়েক বছর আগের। মানে তুমুল গণতন্ত্রের যুগের। একটা জেলা শহরে কাজে গিয়েছি। দুপুরবেলা রাস্তায় রিকশার জ্যাম। আর রিকশা ড্রাইভাররা অকথ্য গালাগাল করছে। ‘.... চোর’ ‘.....বদমাশ’। শুনে মানুষটা কে জানতে কৌতূহল হলো। জানা গেল, ইনি এলাকার মাননীয় সংসদ সদস্য। মাসে-দুই মাসে একবার আসেন। এসে এ রকম জ্যাম লাগিয়ে গালাগাল খেয়ে চলেন। নেমে হেঁটে একটু এগিয়ে দেখি বাচ্চাদের লম্বা লাইন। বোঝা গেল, মহোদয়কে স্বাগত জানাতে এদের দাঁড় করানো হয়েছে। বাচ্চারা গালাগাল করতে পারে না, তবু কচি মুখগুলোর বেদনার মধ্যে যে ক্ষোভের ছবি সেটা আমাদের এমপি-মন্ত্রীরা কোনো দিনও বুঝবেন না।  সাংবাদিক হিসেবে গেছি বলে রাতের বেলা তাঁর বাসায় আমন্ত্রণ। গিয়ে মনে হলো, ভুল করে রামগোপাল ভার্মার আন্ডারওয়ার্ল্ড ছবির সেটে এসে পড়লাম নাকি! বাসা তো নয়, যেন বিলাসী প্রাসাদ। আর গেট থেকে শুরু করে সব জায়গায় প্রহরী বা ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে দেখা যাচ্ছে এদের কারো চেহারায়ই স্বাভাবিকতা নেই। তিনি অবশ্য কথাবার্তায় খুব আন্তরিকতা দেখালেন। এই এক ব্যাপার। যত বড় অপকর্মকারী, তাদের কাছে সাংবাদিকদের তত বেশি তোয়াজ। আশপাশ থেকে অবশ্য আওয়াজ ভেসে আসছে, ‘অমুককে খেয়ে দে..., তমুককে ধরে আন...।’

বেরিয়ে আধো অন্ধকার রাস্তায় একটাই কথা মনে হলো। আমাদের এমপিরা কী ছিলেন আর কী হলেন! আগে থাকতেন মানুষের মনে। এখন থাকেন মানুষের যন্ত্রণায়। ছিলেন বিপদের ভরসা। এখন বিপদ ঘটানোর বিভীষিকা।

আর এভাবেই অপরাধের মাত্রা এমন বিস্তৃত হয়েছে যে একজন এখন বিদেশের জেলে। আরেকজন মানুষের ঢিল খেয়ে পালালেন সেদিন। এখনো বিশ্বাস করতে পারি না, কয়েকজন এমপি মিলে বসে নারী ইউএনওদের গার্ড অব অনার দেওয়ার বিরুদ্ধে একমত হয়ে গেছেন।

হঠাৎ করে এই তুলনামূলক স্মৃতিতে যাচ্ছি কেন? দুটো সময়ের দুই ধরনের এমপির তুলনার কারণ সদ্য ঘোষিত আওয়ামী লীগের তিন আসনের প্রার্থীদের নাম। তিনজনের কেউই খুব দাপুটে বা বিরাট পয়সাওয়ালা নন। অপকর্ম আর দাপট দেখানোর কুখ্যাতির বাইরে থেকে মনোনয়ন পাওয়া এমন বিস্ময়কর যে ভালো করে তলিয়ে দেখে তবেই নিশ্চিত হলাম। প্রত্যেকেরই এলাকায় সুনাম আছে। আর ওটা দেখেই আমাদের ফেলে আসা সময়ের এমপিদের চেহারা মনে পড়ল। এই তিনজন হয়তো লঙ্কায় গেলে রাবণই হবেন, অথবা বিরাটসংখ্যক দুষ্কৃতকারীর ভিড়ে তেমন কোনো বদল আনতেই পারবেন না, তবু একটা আশার রেশ দেখা যায়। ত্যাগী, গণমুখী, মানুষঘেঁষা মানুষদের মনোনয়ন দেওয়াও তো এই বাজারে বিরাট খবর। চট্টগ্রামে মেয়র হিসেবে রেজাউল করিমকে দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটা বদলের বাতাস মিলছিল, এবার সেটা একটা প্রবাহে রূপ পেল। আবার বলি, খুব আশার কিছু নেই; কিন্তু রাজনীতিচর্চায় এমন হতাশা যে আগাছার মধ্যে একটা চারাগাছ থাকার সম্ভাবনা থাকলেও আগাছাগুলোকে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করে।

কেন এই অধঃপতন—ইতিহাসে গিয়ে একটু বোঝার চেষ্টা করি। এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালে প্রথম নির্বাচন। আওয়ামী লীগ আন্দোলনে এগিয়ে ছিল, সাংগঠনিক শক্তিতেও এগিয়ে, ফলে ক্ষমতায় যাওয়া ছিল এক রকমের স্বাভাবিক বিশ্বাস। আওয়ামী লীগের নেতার অভাব ছিল না, মনোনয়ন নেওয়ার ছিল লম্বা লাইন। ওদিকে বিএনপিতে অনেক জায়গায় লোকই নেই। সেই শূন্যতা পূরণে তারা নামি ব্যবসায়ী-ক্ষমতাওয়ালা মানুষদের এক রকম ভাড়া করল। লড়াইয়ে প্রথম পক্ষের জেতার কথা কিন্তু আওয়ামী লীগের অতি বিশ্বাস, কিছু অবিশ্বাস্য অপপ্রচার, ছাত্রদলজনিত তারুণ্যের শক্তি মিলিয়ে বিএনপি জিতে গেল। আর আওয়ামী লীগের বিশ্বাসটা টলে গেল। তাদেরও মনে হলো, নির্বাচন জেতাতে ত্যাগী নেতা নয়, দরকার টাকাওয়ালা ব্যবসায়ীর। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, ঢাকা শহরে ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোজাফফর হোসেন পল্টু, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, ড. কামাল, সাজেদা চৌধুরী, সাহারা খাতুনরা, সঙ্গে দুটি আসনে শেখ হাসিনা। ১৯৯৬ সালের প্রার্থী হচ্ছেন এইচ বি এম ইকবাল, সাবের হোসেন চৌধুরী, কামাল মজুমদাররা। মানে আওয়ামী লীগও যাকে দিয়ে সম্ভব জেতার লাইনে। বিএনপি আগে থেকেই সেই লাইনে, আওয়ামী লীগও যোগ দেওয়ায় পরের ২০-২২ বছর এই লাইনেই এগিয়েছে গাড়ি। আর তাতে নীতিহীন ব্যবসায়ী, দাপুটে, মারদাঙ্গারা দিনকে দিন আশকারা পেয়ে পেয়ে আজকের এই এমপিরা। এর মধ্যেও কিছু ভালো মানুষ জিতেছেন; কিন্তু দিন গিয়েছে আর এরা সংখ্যায় কমেছেন। যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন-ওয়ান ইলেভেনের সংস্কার চেষ্টা কিছুতেই কিছু হয়নি। সংসদীয় গণতন্ত্রের এটা একটা অসুবিধার দিক যে সরকারে যেতে হলে বেশি আসন জিততে হবে। কাজেই যে জিততে পারে তারই কদর। এক বড় নেতা ঘরোয়া আলোচনায় দুঃখ করে বলছিলেন, ‘আমরা কি সাধে এদের মনোনয়ন দিই; কিন্তু উপায় নেই। ভালো মানুষরা জেতে না। জেতার জন্য টাকা লাগে-শক্তি লাগে। কাজেই এদেরও লাগে।’ ও, হ্যাঁ, মাঝখান দিয়ে আরেকটা উপদ্রব তৈরি হয়েছিল। উত্তরাধিকার। নেতা মারা গেছেন, তাঁর ছেলে বা স্ত্রী তাঁকে দাও। কান্নাকাটি করে আর বাবার স্মৃতির জোরে জিতে যাবে। জিতে যায়ও।

এই ফর্মুলায় যখন সত্যিকারের রাজনীতিকরা পেছন থেকে পেছনে যাচ্ছেন, তখনই এক ঝিলিক আশার আলো। এক বন্ধু অবশ্য শুনে হাসতে হাসতে বলল, ‘এখন তো আর ভোট নেই। যাকে দেবে সে-ই জিতবে। কাজেই ভালো লোক দিতে অসুবিধা কী?’

সত্যি বললে এটাও সত্য। যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হতো তাহলে নিশ্চিতভাবেই অন্য চিন্তা চলত। কিন্তু মোটামুটি যাকে আওয়ামী লীগ মনোয়ন দেবে সে-ই জিতবে—এমন অঙ্ক থেকেই এদের দেওয়া হতো। খুব ভালো কথা নয়। ভুল পথে ঠিক কাজ। তখন আবার মনে হয়, আমাদের সব কিছু এমন ভুল পথে চলছে যে খারাপভাবেও একটা ভালো কাজ হলে মন্দ কী! দুটো বিকল্প, খারাপ পথ-খারাপ কাজ। আরেকটা খারাপ পথ-ভালো কাজ। উপায় কী। আবার কে জানে, যদি এভাবে ভালো মানুষরা নির্বাচিত হতে থাকেন এবং ভালো কাজ করতে থাকেন তাহলে যখন কোনো একদিন সঠিক প্রতিদ্বন্দ্বিতামুখ নির্বাচন হবে, তখন হয়তো ভালোরা আর পরিত্যাজ্য হবেন না। হয়তো এই অন্ধ পথেই ফিরবে সুগন্ধের দিন...

বেশি আশা। থাক এখানেই থামি; বরং একটা রসিকতা শুনি। ছেলে কী হবে জানার খুব কৌতূহল বাবার। এক জ্যোতিষ বলল, ছেলের ঘরে একটা ধর্মগ্রন্থ রাখবেন, পাশে পিস্তল, তার পাশে টাকা, তার পাশে মদের বোতল। যদি সে ধর্মগ্রন্থ হাতে নেয়, তাহলে সৎ পথে চলবে। যদি পিস্তল নেয় তাহলে হবে মাস্তান। টাকা নিলে হবে ব্যবসায়ী আর মদের বোতল নিলে দুশ্চরিত্র। বাবা কথামতো সেসব জিনিস রেখে খুব কৌতূহলে দেখতে থাকলেন ছেলে কী করে? ছেলে ঘরে ঢুকে ধর্মগ্রন্থটা বুকে নিয়ে এক ঢোক মদ খেয়ে পিস্তলটা পকেটে ঢুকিয়ে টাকা গুনতে শুরু করল। বাবা বুঝতে না পেরে গেলেন জ্যোতিষীর কাছে। জ্যোতিষী বললেন, ‘এর মানে হলো আপনার ছেলে হবে রাজনীতিবিদ। নেতা। সব করবে।’

আমাদের এখনকার কোনো কোনো এমপির সঙ্গে মিল পাওয়া যায় না! সব করেন। সব কিছু গিলে ফেলেন।

আরেকটা গল্প। এক পকেটমার নেতার পকেটে হাত দিয়েছে। নেতা ধরে ফেলে চিৎকার করলেন, ‘তোমার লজ্জা করে না একজন নেতার পকেটে হাত দিতে।’

পকেটমার আরো জোরে চিৎকার করে বলে, ‘আর আপনার লজ্জা করে না, এত বড় একজন নেতা হয়ে খালি পকেটে ঘুরে বেড়াতে। একটাও পয়সা নেই। একেবারে ফকির-ফাকড়া নেতা।’

আমাদের এখন এ রকম সাধারণ-দরিদ্র নেতাই দরকার। নিঃস্ব নেতারাই বোধ হয় দূর করতে পারবেন আমাদের রাজনীতির নিঃস্বতা।

 

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

 



সাতদিনের সেরা