kalerkantho

বুধবার । ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৮ জুলাই ২০২১। ১৭ জিলহজ ১৪৪২

অনলাইনে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন

ড. মো. আনিসুজ্জামান

১৬ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অনলাইনে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অভিঘাতে ইউরোপ-আমেরিকার চিরায়ত চিন্তা-চেতনায় এবং জীবনমানে পরিবর্তন এসেছে। এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে পরিবর্তন হচ্ছে। বদলে যাচ্ছে চিন্তা-চেতনা এবং চিরায়ত ধ্যান-ধারণা। একজন তামিমা-নাসির সুপারস্টার হওয়ায় গল্পটি মানুষের সামনে এসেছে। মিডিয়ার কাভারেজের বাইরে রয়েছে অসংখ্য তামিমা-নাসিরের রসায়ন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে আমাদের চিরায়ত সমাজব্যবস্থা লিকুইড সমাজে পরিণত হচ্ছে। মানুষে মানুষে সহমর্মিতা, শ্রদ্ধাবোধ, পারিবারিক মূল্যবোধ হ্রাস পাচ্ছে। বিছানায় কোন রঙের চাদর থাকবে—এ নিয়েও স্বামী-স্ত্রী দ্বন্দ্ব থেকে বিচ্ছেদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে ঘরে ঘরে দোকান চালু হয়েছে। ডিজিটাল এবং নন-ডিজিটালের দ্বন্দ্ব, সংঘাত এবং সমন্বয়ে সমাজ-রাষ্ট্র এগিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আউটসোর্সিংয়ের সাহায্যে গ্রামের যেকোনো স্থানে বসেই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক অর্থ উপার্জন করছে তথ্য-প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন তরুণরা। কৃষি-শিল্প সব কিছুতেই বিশ্বায়নের ছোঁয়া লেগেছে। উৎপাদনের সঙ্গে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং বিপণনব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা বিত্তবেসাতে ফুলে-ফেঁপে উঠছে। একদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, অন্যদিকে পাচার হয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। কালো টাকা সাদা করার উপায় থাকলেও সাদার চেয়ে কালোই যেন ভালো, তা সে যতই কালো হোক। পি কে হালদারদের সংখ্যা একেবারে কম নয়।

গত এক দশকে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের ফলে মিডিয়া এখন মানুষের হাতে হাতে। নব্বইয়ের দশকেও রাজশাহীতে এক দিন পর খবরের কাগজ আসত। দৈনিক জনকণ্ঠ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাতীয় পর্যায়ের খবরের কাগজ উত্তরবঙ্গের মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে সকালে। ফলে অন্য কাগজগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থায় দ্রুত মানুষের ঘরে পৌঁছে দেয়। বর্তমানে কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা পৃথিবীর যে প্রান্তেই ঘটুক না কেন, দ্রুত বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে দূরের মানুষ কাছে এসেছে, বিপরীতে কাছের মানুষ চলে গেছে দূরে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অনলাইন ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দ্রুত ঘটছে। আলিবাবা, অ্যামাজন, দারাজ দ্রুত পণ্য মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে। ঘরে বসেই অল্প সময়ে পৃথিবীর যেকোনো পণ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে। দেশের তথ্য-প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন তরুণরা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। অনেকে শিক্ষাজীবনের সঙ্গে অনলাইনে ব্যবসাও করছে। ফেসবুক খোলার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য পণ্যের বিজ্ঞাপন আপনি না চাইলেও দেখতে পাবেন। দৈনন্দিন জীবনের কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে প্রসাধনী, টিভি, ফ্রিজ—সবই কিনতে পারবেন অনলাইনে। শার্ট-প্যান্ট, বাচ্চাদের কাপড়, শাড়ি-গয়না কোনো কিছুই বাকি নেই। বিরিয়ানি-কাচ্চি কি না পাওয়া যায়। ফুড পান্ডা আরো কত কি। অর্ডার প্লেস করলেই খাবার চলে আসবে ঘরে। অনলাইনে রাজশাহীর আম চলে যাচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আমার এক শিক্ষার্থী করোনার সময় অনলাইনে আমের ব্যবসা করছে। এবারই সে নতুন ব্যবসায়ী। এরই মধ্যে তার ১০০ মণের ওপর আম বিক্রি হয়েছে।

অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যের এখনো কোনো নীতিমালা নেই। নীতিমালা না থাকায় ভোক্তা প্রতারিত হলে ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো উপায় থাকে না। যে কেউ ইচ্ছা করলেই ফেসবুকে একটি পেজ খুলে বাহারি বিজ্ঞাপন দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে। বিশ্বাসই এই ব্যবসার মূলধন। বিশ্বাসের ওপর আস্থা রেখে অনেকে প্রতারিত হয়েছে। এক শ্রেণির প্রতারক সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে প্রতিনিয়তই প্রতারণা করছে। মোবাইল ফোনের অর্ডার দিয়ে পেয়েছে পেঁয়াজ, এমন ঘটনাও ঘটেছে। আমি ব্ল্যাক টির অর্ডার দিয়ে পেয়েছি গ্রিন টি। কেউ যদি টি-শার্টের অর্ডার দিয়ে কলাগাছের পাতা পেয়ে থাকে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যেকোনো ধরনের ব্যবসা পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্সের প্রয়োজন। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার বাইরে থাকা মোটেই উচিত নয়। সরকার অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যে নজরদারি বাড়ালে ভোক্ত অধিকার সংরক্ষিত হবে। সত্যিকারের ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। অনলাইনে পণ্য ক্রয়ে ভোক্তাদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।

অনলাইন ব্যবসায় বাংলাদেশে প্রতিদিন কত টাকার কেনাকাটা হয় তার কোনো হিসাব নেই। অনলাইনভিত্তিক পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয় না। ফেসবুকে পেজ খুলে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো লাইসেন্স নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা যায় না। ট্রান্সকম ডিজিটাল, সনি র্যাংগস, সিঙ্গার, ওয়ালটন অথবা অন্য যেকোনো দোকান থেকে টিভি-ফ্রিজসহ যেকোনো পণ্য ক্রয় করলে ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। ফলে পণ্যের বিক্রয়মূল্য বৃদ্ধি পায়। অনলাইনে কোনো পণ্য ক্রয় করলে ভ্যাট-ট্যাক্সের কিছুই দিতে হয় না। ফলে পণ্যের মূল্য অনেক কমে যায়। পণ্যের কোনো ওয়ারেন্টি নেই। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যে বিক্রেতা সব সময় লাভবান হন, ভোক্তা কখনো লাভবান, আবার কখনো প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু সরকার সব সময় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

বাংলাদেশে অনলাইন নিউজ পোর্টাল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কিন্তু অনেক অনলাইন নিউজ পোর্টালের নিউজের গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হয়। বাংলাদেশকে ডিজিটাল দেশে পরিণত করার জন্য মানুষের কাছে সঠিক তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অনলাইনে বিজ্ঞাপন প্রচারে নীতিমালা ও নজরদারি প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে সামাজিক অনাচার কম বৃদ্ধি পায়নি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন ঘরে বসেই মানুষ পাচ্ছে, পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য সহজলভ্য হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নীতিমালা না থাকায় যে কেউ ইচ্ছা করলে যেকোনো অডিও-ভিডিও ফেসবুকে ও ইউটিউবে দিয়ে দিতে পারে। টিকটকের মতো অশ্লীল ভিডিও প্রচারের মাধ্যমে সামাজিক অনাচার বৃদ্ধি পায়। ইউটিউবভিত্তিক চ্যানেল পরিচালনায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। শুধু নীতিমালা করে বসে থাকলেই চলবে না, সরকারের নজরদারি বৃদ্ধি করা উচিত।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়