kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

নাগরিকত্ব বিল অগ্রাধিকার পেতে পারে না

জয়ন্ত ঘোষাল

১৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নাগরিকত্ব বিল অগ্রাধিকার পেতে পারে না

কিছুদিন আগে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সঙ্গে এক আলোচনাসভায় অংশ নিয়েছিলাম। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আয়োজিত আড্ডা অনুষ্ঠানে তিনি অতিথি ছিলেন। সেখানে শুধু সাংবাদিক নন, অধ্যাপক, ব্যাংকার, কূটনীতিকসহ সমাজের নানা স্তরের ও পেশার প্রতিনিধি হাজির ছিলেন। বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উত্থাপন হতেই হিমন্ত বিশ্বশর্মা উৎসাহ নিয়ে বলতে শুরু করলেন। জানালেন যে তিনি বাংলাদেশে যেতে ইচ্ছুক এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর কোনো বিষয়েই বিরোধ নেই। এমনকি তিনি শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশ তাঁর প্রিয় দেশ। অতীতে একবার বাংলাদেশে গিয়ে তিনি যে আতিথেয়তা পেয়েছিলেন তা তাঁর কাছে স্মরণীয়। বাণিজ্যের বিষয়েও তিনি ইতিবাচক। চট্টগ্রাম ও মোংলা পোর্টের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ স্থাপন করার ব্যাপারে বাংলাদেশকে যে অনেক বেশি প্রয়োজন সে কথাও তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে জানালেন।

এবার হিমন্ত আসামের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরপরই তাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটা চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে ইতিবাচক পরিস্থিতি তার সুযোগ আসামসহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত গ্রহণ করতে পারে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যৌথভাবে কাজ করলে এই অঞ্চল দ্রুত বিকশিত হতে পারে।

হিমন্তও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি বারবার বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যৌথভাবে উন্নয়ন চান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিখ্যাত উক্তি, ‘লেট ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ মুভ ফরোয়ার্ড টুগেদার’। অর্থাৎ একত্র হয়ে যৌথভাবে এগোনোর যে অঙ্গীকার নরেন্দ্র মোদি নিয়েছেন সেটি হিমন্ত পালন করতে উৎসাহী।

এখন আমরা এক দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে চলেছি। করোনা নামের এক ভয়ংকর ভাইরাস আমাদের সব কিছু তছনছ করে দিয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিষেধক পাঠানোর যে দায়বদ্ধতা তা পালন করতে ভারত ব্যর্থ হচ্ছে। ২০২১ সালের ২১ জানুয়ারি ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রতিষেধক পৌঁছে ছিল। তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর নিজে টুইট করে বাংলাদেশের সঙ্গে এই মৈত্রী ভ্যাকসিনেশনের কথা বলেছিলেন। এই ভ্যাকসিনেশন কূটনীতি দুই দেশের সম্পর্কের জন্য যে কতটা জরুরি সেটা বাংলাদেশ বারবার করে জানাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে যে টাকা দেওয়া সত্ত্বেও তৃতীয় কিস্তির প্রতিষেধক কেন পৌঁছল না, যেটা মার্চ মাসে পৌঁছে যাওয়ার কথা। এখন চলছে জুন মাস। এই ঘটনাটা এমন নয় যে ভারত বিচলিত নয়। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি সাউথ ব্লকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিষেধক পাঠানো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করেরও সবিস্তার আলোচনা হয়েছে। পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা, যিনি একসময় বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন, তিনি নিজে বাংলাদেশের বন্ধু, তিনিও চাইছেন যত দ্রুত সম্ভব এই প্রতিষেধক বাংলাদেশে পাঠানো যায়। এই ঘটনার সঙ্গে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর যে বক্তব্য, এই দুটি আপাতভাবে দুটি পৃথক ঘটনা; কিন্তু কোথাও একটা যোগসূত্র আছে। আসুন, আমরা সেই জটটাই ছাড়ানোর চেষ্টা করি।

কোনো সন্দেহ নেই যে এই পৃথিবীতে এবারের করোনার যে দ্বিতীয় ঝড় এসে আছড়ে পড়েছে তাতে ভারত সরকার বেশ বেসামাল। প্রথমত, এই ভাইরাসের আক্রমণটা যে এত বেশি ভয়াবহ হবে, করোনা-১-এর চেয়ে করোনা-২ যে আরো তীব্র হবে, সেটা নরেন্দ্র মোদি সরকার বুঝতে পারেনি, সে কথা স্বীকার করতেই হবে। এখন দোষারোপের খেলা চলছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন বলছেন, ‘আমি কী করব! আমাকে বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন এটা তেমন বড় কিছু হবে না।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে আমরা তো বিভিন্ন প্রশাসনে আছি। কিন্তু যাঁরা ভাইরোলজিস্ট তাঁরাও কি এ কথা বলতে পেরেছিলেন? আবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর প্রথম থেকেই বলছেন যে প্রতিষেধক নীতি হওয়া উচিত ছিল খুব আক্রমণাত্মক। প্রধানমন্ত্রী এই দোষারোপের প্রক্রিয়াটি দেখে একটু বিরক্ত। প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় এখন গোটা বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করছে। আগের থেকে পরিস্থিতি একটু ভালো সে কথা বোধ হয় বলা যায়। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বেশ কয়েকবার আলাপ-আলোচনা হয়েছে। সাউথ ব্লকের অন্দরমহলের খবর হচ্ছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এখনই কিছু প্রতিষেধক বাংলাদেশে পাঠাতে চাইছেন।

ভারত সবচেয়ে বেশি প্রতিষেধক উৎপাদন করলেও এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছিল যে ভারতের কাছেই প্রতিষেধক ছিল না। অর্থাৎ এটা ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাইয়ের সমস্যা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর আমেরিকায় গিয়েছিলেন এবং সেখানে তিনি সব কেষ্টবিষ্টুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারপর তিনি আমেরিকার কাছ থেকে, বাইডেন প্রশাসনের কাছ থেকে আশ্বাস নিয়ে ফিরেছেন। সেই প্রতিষেধক আসতে শুরু করেছে। আশা করা যাচ্ছে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পক্ষকালের মধ্যে যথেষ্ট প্রতিষেধক ভারতে এসে পৌঁছবে। কিন্তু এখনই বাংলাদেশকে প্রতিষেধক দেওয়া উচিত কি উচিত নয় এটা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের বেশ কয়েকজন মতামত দিয়েছেন যে আমরা বুঝতে পারছি বাংলাদেশকে এখনই প্রতিষেধক দেওয়াটা প্রয়োজন। কিন্তু এটাতে বিজেপি দলের দিক থেকে একটা তীব্র আপত্তি আছে। তার কারণ হচ্ছে, ডমেস্টিকস পলিটিকস। অর্থাৎ যদি এখন এই প্রতিষেধক বাংলাদেশকে দেওয়া হয়, অথচ এই প্রতিষেধক পশ্চিমবঙ্গে না পৌঁছায় অথবা উত্তর প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন আসছে, সেখানে না পৌঁছায়, তাহলে বাংলাদেশে প্রতিষেধক পাঠানো নিয়ে মোদি সরকার একটা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির শিকার হতে পারে। এখন বিরোধী দলের সঙ্গে শাসকদলের যে পারস্পরিক সমঝোতা বা আলোচনার পরিস্থিতি সেটি অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আমি মনে করি, তার জন্য মোদি সরকারও কিঞ্চিৎ দায়ী। কেননা এত বিপুলভাবে ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী দলের সঙ্গে তাঁর যে রাজনৈতিক পরিসর, তাকে মর্যাদা দেওয়া এবং সুসম্পর্ক রক্ষা করা—এটা সব সময়ই প্রয়োজন। তাতে দুঃসময়ে কাজে লাগে। সেটা মোদি সরকার ও মমতা সরকার দুই পক্ষকেই বুঝতে হবে। এখন যে পরিস্থিতি তাতে শেষমেশ যেটা জানতে পেরেছি যে এখন জুন-জুলাই মাস, সেপ্টেম্বর মাসের পরই বাংলাদেশে সব প্রতিষেধক ভারত পাঠাবে—এমনটাই ঢাকাকে জানানো হচ্ছে। এতে কিছুদিন ঢাকার অসুবিধা হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে; কিন্তু ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করা হচ্ছে যে ভারতের এই অভ্যন্তরীণ সমস্যাটিকে তারা যেন একটুখানি মেনে নেয়। আগামী দিনে সবটাই কম্পেনসেট করা হবে এবং প্রয়োজনে বাংলাদেশ প্রতিষেধকের জন্য যে অর্থ দিয়েছে, তার থেকে বেশি প্রতিষেধক দিতে ভারত পিছপা হবে না।

আসলে বৃহৎ প্রেক্ষাপট থেকে বিষয়টা দেখার দরকার আছে। অর্থাৎ চীন বাংলাদেশকে প্রতিষেধক দিতে চাইছে; কিন্তু সেই প্রতিষেধকের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গোটা পৃথিবীতে এখনো প্রশ্ন আছে। রাশিয়া ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা বলছে। রাশিয়ার সেই ভ্যাকসিন ভারতও কিছু নিচ্ছে। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই, সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য ভ্যাকসিন ভারত এই মুহূর্তে নিচ্ছে ও দিচ্ছে। সুতরাং বাংলাদেশের দিক থেকেও একটু অপেক্ষা করলে হয়তো দুই দেশের যে পারস্পরিক সম্পর্ক তার যে দীর্ঘমেয়াদি দিক—দুই পক্ষকেই যে দুই পক্ষের প্রয়োজন, সবটা মাথায় রেখে কাজ করাটা জরুরি।

আবার ফিরে আসি আসামের মুখ্যমন্ত্রীর আলোচনায়। আসামের মুখ্যমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, সেই কথার রেশ ধরে বলছি যে এই মুহূর্তে যেটাকে বলা হতো ‘লুক ইস্ট’ পলিসি, এখন সেটাকে বলা হয় ‘অ্যাক্ট ইস্ট’। সেই পলিসি রূপায়ণ করতে গেলে বাংলাদেশকেও প্রয়োজন। সেই জিওস্ট্র্যাটেজিক পজিশনের নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশকে ভারতের প্রয়োজন। এই মুহূর্তে পাকিস্তান আর চীনের যে ভূমিকা এবং চীন-পাকিস্তান অক্ষ যেভাবে ভারতের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে, সেখানে বাংলাদেশকে ভারতের যে কতটা প্রয়োজন সেটা বারবার বিভিন্ন প্রতিবেদনে লিখেছি। এই পরিস্থিতিতে আসামের মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু সার কথাটি বলে দিয়েছেন। অর্থাৎ নাগরিকত্বের মতো বিষয়, যেটা আসামে খুব সংবেদনশীল বিষয়, যেটা বিজেপির একটা রাজনৈতিক এজেন্ডা, সেই নাগরিকত্ব বিল সম্পর্কে আসামের মুখ্যমন্ত্রী এসেই বলেছেন, আপাতত সেটি কার্যকর হবে না। সেটা রিভিউ করতে পাঠিয়েছেন। কার্যকর কেন হবে না তারও যুক্তিতে সেদিন তিনি বলেছেন যে আপাতত কভিডের জন্য ওটাকে শিকেয় তুলে রাখা হচ্ছে। কভিডের সময় এটা করা ঠিক নয়। আবার এ কথাও বলেছেন, নাগরিকত্ব প্রশ্নে যাঁদের চিহ্নিত করা হয়েছে, তাঁদের অনেকেই আদালতে গেছেন, চ্যালেঞ্জ করেছেন। সুতরাং এটাকে ফাইনাল তালিকা না ভেবে সেই বিষয়গুলো ‘ফেস টু ফেস’ স্টাডি করা দরকার। এটা অনেক মানুষের বিষয়। সুতরাং এটা সাবধানে করতে হবে। এখন বাঘের পিঠে চেপেছে বিজেপি। নাগরিকত্ব বিলকে সম্পূর্ণ বর্জন করা বা সেটাকে প্রত্যাহার করে নেওয়াও সম্ভব নয়। আবার এই ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গেও তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে বা ভোটের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিয়েছেন, তাতে সেখানেও এই বিল কার্যকর করার কথা বলা হচ্ছে না। যেটা অমিত শাহ বারবার বলছেন এবং করার চেষ্টা করছেন, বিজেপি ও আরএসএস যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ ইস্যু থেকে সরে আসছে না, সেটাও কিন্তু উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে দেখাতে হবে। এই পরিস্থিতিতে আসামের মুখ্যমন্ত্রী কী বলছেন সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত দেওয়ার বিষয়টি তাঁরা বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করেই করবেন। এটা নিয়ে তাঁদের বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই এবং তাঁরা কোনো রকম বিরোধ চান না।

তাই আজকে করোনা পরিস্থিতিতে মনে হয় আর যা-ই হোক করোনার থেকে কখনোই নাগরিকত্ব বিল অগ্রাধিকার পেতে পারে না। সেটা নরেন্দ্র মোদি বুঝেছেন, বিজেপিকেও বুঝতে হবে।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র

বিশেষ প্রতিনিধি