kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

ইসরায়েলে নতুন জোট, এখনো নতুন যুগ নয়

অনলাইন থেকে

১০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গত বুধবার মধ্যরাতের ঠিক ৩৮ মিনিট আগে ইসরায়েলের মরিয়া আটটি বিরোধী দল একজোট হয়ে জানায় যে তারা ১২ বছরের তিক্ততাপূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সরিয়ে জোট সরকার গঠন করতে পারবে। এই শেষ মুহূর্তের সাফল্য দুটি জিনিস তুলে ধরে। প্রথমটি হচ্ছে, আটদলীয় জোটটি বামপন্থী মেরেত্জ থেকে শুরু করে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের ক্ষুদ্র ও উগ্র জাতীয়তাবাদী ইয়ামিনা পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এতে একটি আরব ইসলামী দল রাম পার্টির সমর্থনও রয়েছে। এভাবে গড়ে ওঠা একটি জোট আধুনিক ইসরায়েলি মানদণ্ডেও একটি ব্যতিক্রমধর্মী ভঙ্গুর জোট। দ্বিতীয় বার্তাটি হচ্ছে, ইসরায়েলের সফল কভিড ক্যাম্পেইন এবং হামাসের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ের সংঘাতে উদ্ভূত জাতীয় আবেগ ফুটতে থাকা সত্ত্বেও খুবই ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্যের রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অতি দীর্ঘ পরিসরে একত্র হওয়া। এমন একটা পরিস্থিতিতেও তারা বিশ্বাস করে যে দীর্ঘ মেয়াদে শাসন করা নির্মম এক নেতাকে উত্খাত করার জন্য তাদের সবারই সমান আগ্রহ রয়েছে।

এ ঘটনায় অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। নেতানিয়াহু হয়তো এক প্রজন্ম ধরে ইসরায়েলি রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছেন। কিন্তু দেশে-বিদেশে তাঁর যুদ্ধপ্রিয় বিভাজন এবং তাঁর তীব্র ফিলিস্তিনবিরোধী নীতি দেশটিকে একটি অন্ধকার রাজনৈতিক গলিতে নিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয় নেতানিয়াহুকে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সমর্থকহারা করেছে। একই সঙ্গে তিনি বর্তমান দুর্নীতির অভিযোগে বিচারাধীন। নগদ অর্থ দিয়ে রাজনৈতিক সমর্থন কেনাবেচার পৃথক তিনটি মামলার মধ্যে ঘুষ ও জালিয়াতির অভিযোগও তাঁকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। গত চারটি সাধারণ নির্বাচনের প্রতিটিই অচলাবস্থা কিংবা এ ধরনের কিছুর মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনটি হয়েছে খুবই সাম্প্রতিক, ২০২১ সালের মার্চ মাসে। নেতানিয়াহুর আরেকটি ব্যর্থ শাসনামলের জন্য যদি দেশটি আরো কয়েক মাস নষ্ট না করত, তাহলে এক ধরনের রেহাই পেতে পারত। মার্চের নির্বাচন দেশটিকে সেই সুযোগটাই দিয়েছে শুধু।

এই জোটের চুক্তির কলমের কালি তখনই শুকিয়ে গিয়েছিল, যখন নেতানিয়াহু দেখিয়েছিলেন যে তিনি লড়াইয়ে নামতে চান। এই লোকটির রাজনৈতিক জীবন যিনি দেখেছেন, তিনি অবাক হবেন না। যে শর্তে তিনি নিজেকে প্রকাশ করেছেন, একজন লিকুদ নেতা এই মুহূর্তে একই কৌশল অনুসরণ করতেন। তাইতো নেতানিয়াহু তাত্ক্ষণিকভাবে বেনেটের জোটকে একটি বামপন্থী সরকার হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যার অর্থ হচ্ছে এই জোটের বিরুদ্ধে সব ডানপন্থী ইসরায়েলিকে অবশ্যই লড়াই করতে হবে। তারপর তিনি ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে তাঁর সব প্রচার-প্রচারণাকে কেন্দ্রীভূত করেন, বিশেষ করে আরব ইসলামী দল রামকে বেনেটের ছাড় দেওয়ার বিষয়ে আক্রমণ করে। এই তথাকথিত ছাড়ের মধ্যে রয়েছে আরো আরব পুলিশ নিয়োগ, ইসরায়েলি মুসলমানদের জন্য একটি নতুন হাসপাতাল নির্মাণ এবং বিল্ডিং পারমিট বিধিমালায় পরিবর্তনের মতো ইসরায়েলিদের আপাত ক্ষোভের বিষয়গুলো। অথচ এই ছাড় দেওয়া মানে ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি নাগরিকদের বিরুদ্ধে আরোপিত বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা কমিয়ে আনা। এ অবস্থায় নেতানিয়াহুর জাতিগতভাবে বিভাজনমূলক রাজনীতি এখন পর্যন্ত স্পষ্ট হয়নি।

নখ কামড়ানো এই জোটকে নিয়ে আলোচনা ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠিত ভঙ্গুর ও বিদ্বেষপূর্ণ দলীয় ব্যবস্থারই একটি নজির। তবে সামনে অনেক সম্ভাবনাময় মুহূর্তও রয়েছে। জনাব বেনেট, যিনি নেতানিয়াহুর একজন ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী সাবেক চিফ অব স্টাফ ছিলেন এবং যিনি পশ্চিম তীরের স্থায়ী অন্তর্ভুক্তিকে সমর্থন করেন, তাঁকে প্রায় ১০ দিনের মধ্যে পার্লামেন্টারি ভোটে জিততে হবে। নেসেটে ১২০ আসনের মধ্যে তাঁর জোটের ৬১টি আসনের একটি প্রান্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে নেতানিয়াহু তাঁর অস্ত্রভাণ্ডারের প্রতিটি অস্ত্রই ব্যবহার করবেন ভোটের আগে জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ভাঙন ধরাতে। তার উত্খাত, যদি সম্ভব হয় তাহলে সেটা হবে একটি সুযোগের মুহূর্ত। কিন্তু ইসরায়েলি রাজনীতি যত দিন ছুরির আগায় থাকবে, তত দিন সুযোগটি কাজে লাগা কঠিন হবে। অথচ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অথবা যেকোনো প্রধান আঞ্চলিক ইস্যু নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনয়ন করা হবে নেতানিয়াহু পরবর্তী শাসকদের জন্য একটা ছোট্ট অনুপ্রেরণা, যে ইস্যুগুলো নিয়েই সাবেক নেতা ধ্বংসাত্মকভাবে উন্নতি করেছিলেন। এখন জোট হতে পারে একটি পুরনো যুগের সমাপ্তি। তবে এখনই এটা নতুন যুগের শুরু নয়।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ