kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

করোনাকালীন শিক্ষা ভাবনা

মেহেদী হাসান বাবু

১০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনাকালীন শিক্ষা ভাবনা

করোনা মহামারি বদলে দিয়েছে বৈশ্বিক জীবনব্যবস্থার চালচিত্র। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতসহ প্রায় সব খাতে বিশাল ছাপ রেখেছে করোনা মহামারি। এ সংকটে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোই রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জটা আরো বড়। বিগত এক দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনেকাংশে এগিয়ে গেলেও করোনার কারণে অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হয়েছে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা। বিপুল জনসংখ্যার কারণে সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও চ্যালেঞ্জ দিন দিন বড় হচ্ছে। শিক্ষা খাতের অবস্থা সবচেয়ে বেশি এলোমেলো। এখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতির মাত্রা ও পরিমাণ অনেক। ইউনিসেফের তথ্য মতে, বাংলাদেশ ছাড়া আরো ১৩টি দেশে ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই একমাত্র, যেখানে অব্যাহতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক বছরের বেশি বন্ধ রয়েছে। ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে প্রায় ১৪ মাস ধরে লাগাতার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। আর এ ব্যাপারটিই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি করেছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা। অভিভাবকরা ভুগছেন সংকটে। বহু কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন বহু শিক্ষক। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এসএসসি ও এইচএসসিতে তৈরি হয়েছে পরীক্ষাজট এবং উচ্চশিক্ষায় সৃষ্টি হয়েছে সেশনজট। এ ছাড়া নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের বিভিন্ন ক্লাসে অটো প্রমোশন দেওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে সরকার অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করলেও তাতে সবার অংশগ্রহণ লক্ষণীয় নয়। বেশির ভাগ পরিবারে সন্তানদের অনলাইন ক্লাস উপযোগী স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা প্রয়োজনীয় ডিভাইস কিনে দেওয়ার সামর্থ্য নেই। এ ছাড়া ইন্টারনেটের ধীরগতি এবং উচ্চমূল্য এই কার্যক্রম ব্যর্থ হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ। এ ছাড়া আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষকও এ ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত নন। ফলে উন্নত বিশ্বের মতো অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম আমাদের এখানে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করতে পারছে না।

করোনাকালে শিক্ষা খাত নিয়ে সরকার পড়েছে উভয়সংকটে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী রয়েছে প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আর শিক্ষা খাতকে সচল রাখার জন্য কয়েকবারই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর আবার করোনার বিস্তার এবং শিক্ষার্থীদের জীবনের সুরক্ষার কথা ভেবে সরকারকে পিছিয়ে আসতে হয়েছে। ফলে ১৪ মাস ধরে লাগাতার বন্ধ রয়েছে সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম। আর এই বিষয়টি সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। গত ২৬ মে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি আগামী ১২ জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। ১৩ জুন থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে। আমাদের সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নতুন করে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি না হলে সেদিন থেকে শিক্ষার্থীদের সশরীরে উপস্থিতিতে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করা হবে।’ শিক্ষামন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, ১৩ জুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলে ২০২১ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী ব্যাচকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তাদের সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাসে আসতে হবে। ২০২২ সালে যারা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাদেরও হয়তো একই সময়ে ক্লাসে নিয়ে আসা হবে। অন্যান্য ক্লাসের ব্যাপারে হয়তো সপ্তাহে এক দিন ক্লাস নেওয়া হবে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার ব্যাপারে মন্ত্রীর ভাষ্য, আবাসিক শিক্ষার্থীদের আগে করোনা টিকার আওতায় আনার চেষ্টা করছে সরকার। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা না খোলা গোটা ব্যাপারটিই নির্ভর করছে দেশের সার্বিক করোনা পরিস্থিতির ওপর। তাই এই নিউ নরমালের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্যই বরং চেষ্টা চালানো উচিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। করোনা পরিস্থিতিতে সরকার শুরু থেকেই অনলাইন ক্লাস ও রাষ্ট্রীয় টিভিতে পাঠদানের মতো সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কিন্তু অনলাইন ক্লাসকে কার্যকর ও ফলদায়ক করার জন্য সবার আগে অবকাঠামোগত সুবিধা বিনির্মাণ করতে হবে। অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করার জন্য যে উপযোগী স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ও ডিভাইসের প্রয়োজন—সব শিক্ষার্থীর তা নেই। যদিও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য মতে, ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীর অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করার উপযোগী মোবাইল ফোন রয়েছে—এই বিষয়টি বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আবার ডিভাইস থাকলেই হবে না, অনলাইনে ভিডিও স্ট্রিমিং ক্লাস করার মতো উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সেবা সহজলভ্য করা অত্যাবশ্যক। প্রয়োজনীয় ওয়াই-ফাই ও ব্রডব্যান্ড সুবিধা সম্পন্ন প্রযুক্তিগত সংযোগ ছাড়া এ ধরনের সেবা চালিয়ে নেওয়া সত্যি কঠিন। আর মোবাইল ইন্টারনেটের মূল্য এর সঙ্গে অনলাইন ক্লাসের জন্য ব্যবহৃত ডাটার পরিমাণের সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ সেটাও ভেবে দেখা দরকার। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৬২ শতাংশ মোবাইল ডাটা, ৩৬ শতাংশ ওয়াই-ফাই বা ব্রডব্যান্ড ও ২ শতাংশ পোর্টেবল মডেমের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা গ্রহণ করে থাকে। অথচ মোবাইল ডাটার মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ পেতে শিক্ষার্থীদের বেশ বেগ পেতে হয়। অন্যদিকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে মোবাইল ডাটা ছাড়া ইন্টারনেট সেবা পাওয়া দুরূহ। এ ছাড়া শহরের বাইরে ইন্টারনেটের গতি বেশ ধীর, ক্ষেত্র বিশেষে অডিও সংযোগ পেলেও ভিডিওতে সংযোগ পাওয়া দুষ্কর। সেই সঙ্গে লোড শেডিংবিহীন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার অভাব আছে। তাই ইন্টারনেট সংযোগে বিচ্ছিন্নতা অনলাইন ক্লাসের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিষয়গুলো সামনে রেখে সরকারের উচিত করোনা কিংবা মহামারিকালীন শিক্ষাব্যবস্থার একটি রূপরেখা প্রণয়ন করা। যে রূপরেখাটি করোনাকালীন ১৪ মাসে সরকারের এই অভিজ্ঞতার ওপর নিরূপিত হবে। এতে আপৎকালে শিক্ষাব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম বিশেষ ব্যবস্থায় চালু রাখা সম্ভব।

পাশাপাশি করোনা-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও এখন থেকেই পরিকল্পনা করা উচিত। করোনার দিন একদিন না একদিন শেষ হবেই। ভ্যাকসিনের প্রয়োগে বিশ্বের অনেক দেশই স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য ফিরিয়ে এনেছে। বাংলাদেশ ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন দিয়ে শুরু করেছিল ভ্যাকসিন যাত্রা। পরে ভারতে অবস্থা ভয়ংকর আকার ধারণের পর দ্বিতীয় লটের টিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এরপর সরকার চীন থেকে টিকা কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। শিগগিরই সেই টিকা পৌঁছে যাবে দেশে। পাশাপাশি জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে ফাইজারের টিকাও। ফলে উন্নত দেশের মতো আমরাও টিকায় সাফল্য পাব। আমাদের বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবার প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীমুখর হয়ে উঠবে প্রতিটি ক্যাম্পাস।

এখানে একটা বিষয় আলোচনার অবকাশ রাখে। করোনাকালের অভিজ্ঞতার নিরিখে কেমন হবে করোনা-পরবর্তী আগামীর শিক্ষাব্যবস্থা? বাস্তবমুখী, কর্মমুখী আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করতে হবে শিক্ষা কারিকুলাম। দক্ষতাভিত্তিক কারিকুলামের পাশাপাশি বাস্তবমুখী নানা কার্যক্রমও কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। অনলাইনে আয় কিংবা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কোর্সগুলো কারিকুলামের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বই আরো যুগোপযোগী ও বিস্তৃত করে তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য শিক্ষার্থীদের একুশ শতকের দক্ষতায় দক্ষ করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে আরো সুদৃঢ় ও আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার জন্য মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে সরকার নিঃসন্দেহে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজ যাত্রা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয় আর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ে এর দায়িত্ব কে নিত? তাই আসুন, তর্ক কিংবা দ্বিধা না রেখে শিক্ষার্থীদের জন্য যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা ও আগামীর বাংলাদেশ গড়তে সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট