kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটিতে শিক্ষার্থীরা কেমন আছে

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

১৯ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটিতে শিক্ষার্থীরা কেমন আছে

করোনার প্রভাবে দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগামী ২৯ মে পর্যন্ত ছুটি রয়েছে। করোনার বর্তমান যে অবস্থা তাতে আগামী ৩০ মে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যাবে কি না তা নিয়ে এরই মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আর সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের বিষয়ে জটিলতা। গত বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ‘অটোপাস’কেন্দ্রিক যে সমালোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল এবার সেটি এড়িয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরাসরি পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে ভাবছে। গত ১ মে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ‘মহাসংকটে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্বনির্ধারিত তারিখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা না গেলে আগামী আগস্ট-সেপ্টেম্বরের আগে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে না।

তা ছাড়া সরবরাহসংক্রান্ত স্বল্পতার কারণে বর্তমানে টিকা কার্যক্রম কিছুটা থমকে যাওয়ায় এ বিষয়ে যথেষ্ট শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কর্তৃপক্ষ পূর্বনির্ধারিত তারিখে হল খোলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। এমনকি শিক্ষার্থীদের টিকা কার্যক্রমের প্রথম ডোজ শেষ হওয়ার ৪০ দিন পর হল খোলার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে। এতে ধরেই নেওয়া হচ্ছে যে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকা কার্যক্রম শুরু না হলে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বেশ অসুবিধায় থাকবে। তবে আমার জানামতে, সর্বস্তরের শিক্ষকদের প্রথম ডোজের টিকাই এখনো নিশ্চিত হয়নি। বিশেষ করে আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কথা বলতে পারি, যাঁদের বয়স ৪০ বছরের নিচে তাঁরা এখনো কেউই টিকা পাননি। সম্প্রতি রাবি কর্তৃপক্ষ ৪০ বছরের নিচে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানোর পর টিকা নিবন্ধন কার্যক্রম চালু হলেও এখনো কেউ টিকা পাননি। আমি নিজেও ৪০ বছরের কম বয়সী শিক্ষক হওয়ায় আমার প্রথম ডোজ টিকা এখনো নিশ্চিত হয়নি। আর দুঃখের বিষয়, রাবিতে শিক্ষার্থীদের টিকা প্রদানের লক্ষ্যে কোনো ধরনের নিবন্ধন প্রক্রিয়া এখনো চালু হয়নি। তবে ঢাবি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, তাদের ৩০ হাজার শিক্ষার্থী এরই মধ্যে ওয়েবসাইটে নিবন্ধন শেষ করেছেন।

এসব বিষয় নিয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা বিষয়ে যথেষ্ট হতাশা কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মতামত দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায়, তাদের একটি বড় অংশ মানসিকভাবে কতটা বিপর্যস্ত রয়েছে! তারা যেকোনো মূল্যে দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা পেতে চায়। কিন্তু সে লক্ষ্যে বর্তমান পরিস্থিতিতে যে ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত সেগুলো মোটেও গ্রহণ করা হচ্ছে না। করোনা পরিস্থিতির দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্য এরই মধ্যে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা লক্ষ করা যাচ্ছে।

শিশু শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশেষ আচরণগত পরিবর্তন হতে শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে অনেক শিশুর মধ্যে প্রচণ্ড জেদ, ইমোশনাল রিঅ্যাকশন, ইন্টারনেট ও মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হচ্ছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে বাসায় আবদ্ধ থেকে তাদের জীবনে ভালো সময়টি চলে যাচ্ছে নানা রকম অলসতা এবং উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। খুব নিশ্চিত করেই বলা যায়, পরবর্তী পরস্থিতি সামাল দিয়ে তাদের নিজেদের খাপ খাওয়াতে যে বেশ বেগ পেতে হবে, তা নিশ্চিত অনুমান করা যাচ্ছে।

এ ছাড়া নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুসন্তানরা আরো বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। কভিড-১৯ মহামারির সঙ্গে সম্পর্কিত বিচ্ছিন্নতা ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারা তাদের জন্য অধিক কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষায় যুক্ত করা হয়েছে; কিন্তু সবাই এর সুফল পাচ্ছে না। আর এটি একমুখী শিক্ষাদান প্রক্রিয়া হওয়ায় সেখানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভিন্ন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তারা দীর্ঘদিন পাঠ কার্যক্রমের বাইরে থেকে বাসায় বন্দি জীবনে ক্রমেই অসহায় হয়ে উঠেছে। তাদের ছন্দোময় জীবনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে এবং তাদের স্বপ্নগুলো মলিন হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম আরো কত দিন বন্ধ থাকবে সেটি নিয়ে তাদের শঙ্কা বেড়েই চলেছে।

তা ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক বেকার; কিন্তু প্রাইভেট টিউশনে নিয়োজিতদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে আছে বললেই চলে। কোনোভাবেই তাঁরা উপার্জন করতে পারছেন না। এমনকি দেশের এই পরিস্থিতিতে চরম কষ্ট আর হতাশা নিয়ে সময় পার করছেন ওই সব শিক্ষিত বেকার। শিক্ষাজীবন শেষ করে তাঁদের টিউশনি বা পার্টটাইম চাকরি করে কোনোমতে জীবন চালালেও এখন তা বন্ধ হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় সারা দেশে প্রায় লাখ লাখ বেকার দিশাহীন হয়ে পড়েছেন। দিন পার করছেন অর্ধাহারে কিংবা অনাহারে। অনেক শিক্ষিত বেকার যাঁরা টিউশনি করে বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবা, পরিবার-পরিজনের খরচ জোগাতেন, তাঁরা এখন অসহায়। এককথায় বলা যায়, এই মুহূর্তে এসে তাঁদের জীবন থমকে গেছে।

এই মুহূর্তে চিন্তা কিংবা শঙ্কার কারণ হয়েছে এ জন্য যে দেশে বিদ্যমান এই অতিমারিতে জাতীয়ভাবে যে ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে তাতে কর্মসংস্থানের সংকট সৃষ্টি হলে এর প্রভাবও তাদের ওপরেই পড়বে। ফলে বেকারদের আগামী দিনের জীবন অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে দীর্ঘ সময়ের জন্য। যেসব শিক্ষার্থী করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন তাঁদের সামনে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

কাজেই সার্বিকভাবে বলা যায়, বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরাই এখন সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। শিশু থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে বর্তমান অন্ধকার পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে বিদ্যমান করোনা বিপর্যয় রোধ করে কতটা দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যায় সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দাঁড় করানোর বিষয়টি এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্টদের টিকা কার্যক্রম যথাযথভাবে শুরু করা এবং তা সম্পন্ন করার বিষয়টি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত। যাতে দ্রুততম সময়ে শিক্ষার্থীরা তাদের স্বাভাবিক জীবনে প্রবেশ করতে পারে। তা না হলে শিক্ষার্থীদের অপূরণীয় ক্ষতি কোনোভাবেই লাঘব করা সম্ভব হবে না।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]