kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১০ আষাঢ় ১৪২৮। ২৪ জুন ২০২১। ১২ জিলকদ ১৪৪২

স্মরণ

আনিসুজ্জামানের জীবনের আলো

সৌমিত্র শেখর

১১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আনিসুজ্জামানের জীবনের আলো

আনিসুজ্জামান নামটি আমি প্রথম দেখেছি বাবার বইয়ের তাকে থাকা একটি বইয়ে, যেটি এখন আমার প্রযত্নে। ভারতভাগ-উত্তর দাঙ্গা, মুক্তিযুদ্ধকালে লুট—এসব নানা কারণে ঘরবাড়িসহ অনেক কিছু জলাঞ্জলি দেওয়ার পরও বাবা যে সম্পদগুলো শেষ অবধি উদ্ধার করতে পেরেছিলেন, সেখানে ছিল ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’ (১৭৫৭-১৯১৮) গ্রন্থটি। ছোটবেলায় বাবার অনুপস্থিতিতে লুকিয়ে লুকিয়ে যখন ‘পাঠ্য’ বইয়ের বাইরে তাঁর বইগুলোর পাতা ওল্টাতাম, তখন এ বইটার প্রতি আমার মোটেও আগ্রহ সৃষ্টি হয়নি। বিধি বোধ হয় মুচকি হেসেছিল : আজ সেই বইটিই আমি বিশেষ যত্ন করি। কারণ বাংলাদেশের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণা গ্রন্থের প্রথম মুদ্রণ এটি। এর প্রকাশক মুনীর চৌধুরী, আর প্রকাশকাল অক্টোবর, ১৯৬৪। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিযুক্ত নির্বাচিত গ্রন্থ-প্রকাশ সংস্থা লেখক সংঘ প্রকাশনী (বর্ধমান হাউস) থেকে বইটি বের হয়েছিল। এটি আনিসুজ্জামানের পিএইচডি অভিসন্দর্ভের গ্রন্থরূপ। অবশ্য তিনি গবেষণা করেছিলেন ‘ইংরেজ আমলে বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারা (১৭৫৭-১৯১৮)’ শিরোনামে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের তত্ত্বাবধানে। এর মধ্যে আনিসুজ্জামান দেশবরেণ্য অধ্যাপক থেকে বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয় ১৯৯৬ সালে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যখন আমি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের সেই সময়ের ডিন অধ্যাপক মনিরুজ্জামান বাংলা বিভাগের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমাকে দেখে প্রায় চিৎকার করে বললেন, ‘স্যার আপনাকে খুঁজছেন, আপনি কোথায় ছিলেন?’ দেখি, সঙ্গে অধ্যাপক অনিসুজ্জামানসহ আরো শিক্ষক। ব্যাপারটি আর কিছু নয়। বাংলা বিভাগে নতুন শিক্ষক যোগদান করেছে শুনে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন বিভাগীয় অফিসে। সেই সূত্রে আমরা সবাই বসলাম নিচে শিক্ষক লাউঞ্জে। সেই প্রথম আলাপ। আমি পরে লক্ষ করেছি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মধ্যে আনিসুজ্জামানের প্রায় দেবতুল্য প্রভাব। বাংলা বিভাগেও তা ছিল। বাংলা বিভাগে পরস্পর চরম শত্রুভাবাপন্ন সহকর্মী থেকেও অভিন্নভাবে আনিসুজ্জামানভক্ত, এমনটাও দেখেছি। আনিসুজ্জামান দুই পক্ষকেই ধারণ করে গেছেন শেষ দিন পর্যন্ত, স্নেহের কমতি তাঁর ছিল না। তিনি মিতবাক ছিলেন, ছিলেন অকপট। ব্যক্তিত্বে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৯৮ সালে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ সফলভাবে বাংলা বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব শেষ করার পর আনিসুজ্জামান সেই দায়িত্ব নেবেন। আমরা উপস্থিত। আনিসুজ্জামান সেই আয়োজনে ঘোষণা করলেন, তিনি বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব নেবেন না। ফলে জ্যেষ্ঠতায় তাঁর পরে থাকা সাইদ-উর রহমান সভাপতির দায়িত্ব নেন। হুমায়ুন আজাদ বললেন : আপনি দায়িত্ব না নিন, কিন্তু আমার আনা উপহারটি গ্রহণ করুন। আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করে এটাতে আমি লিখে এনেছি। আমরা দেখলাম, তাঁর সম্পাদিত ‘বাঙলা ভাষা’ নামের বই হুমায়ুন আজাদ তুলে দিলেন আনিসুজ্জামানের হাতে। আনিসুজ্জামান সেটা নিলেন। আনিসুজ্জামানের এই আচরণকে বিভাগের একজন কথিত প্রভাবশালী সহকর্মী প্রকাশ্যে ‘নাটক’ বলে অভিহিত করেন। এটি শুনে আনিসুজ্জামান তাঁর ব্যক্তিত্ব দিয়ে যেন দেবশাপ বর্ষণ করেছিলেন এবং তাতে সেই কথিত প্রভাবশালী সহকর্মীকে ভস্ম হয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে শিক্ষক লাউঞ্জে চলে যেতে দেখেন সবাই!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে হুমায়ুন আজাদের পড়ানোর যে সুনাম শুনেছি, আনিসুজ্জামানের সেটা শুনিনি। কিন্তু আনিসুজ্জামানকে ‘শিক্ষক’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বর্তে যেতে দেখেছি অনেককে; যারা তাঁর শ্রেণিপাঠ কখনো গ্রহণ করেনি অথবা গ্রহণ করার সুযোগ থাকলেও সেই সুযোগ সময়মতো নেয়নি—তাদেরও। এর কারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পরম অহিংস আর অকপট ছিলেন আনিসুজ্জামান। কারো ক্ষতি করার কথা তিনি ভাবতেই পারতেন না। তাই তাঁর ছাত্রত্বের পরিচয়ে স্নেহসিক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল অনেকের। তাঁর ‘রবশ্রুত’ ছাত্রের সংখ্যাই বেশি—এটা জানতেন তিনি নিজেও। এটা জেনেও সবার কল্যাণ কামনাই করেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় পরিমণ্ডলের বাইরে নানা ধরনের আড্ডা আর বৈঠকে তাঁর সঙ্গে বহুবার আমি বসেছি। তখন পরিচয় পেয়েছি তাঁর সংস্কারমুক্ত আধুনিক মনের। আচরণে প্রগলভতা তিনি দেখাননি, পেয়েছি তাঁর মধ্যে আন্তরিকতার সুস্নিগ্ধ সুরস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের আমি পরিচালক হওয়ার পর তিনি আর অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম আমাকে সমানভাবে সহায়তা করেছেন। তিনি কেন্দ্রের প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। অনেকেই মনে করতেন, তিনি শুধু রবীন্দ্রনাথ নিয়েই ভাবিত। কিন্তু নজরুল সাহিত্য, বিশেষ করে বাঙালি সমাজে নজরুলের উপযোগিতা সম্পর্কে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন গভীরভাবে আস্থাশীল। নিয়ম ও সময়ানুবর্তিতার চলমান দেবতা ছিলেন তিনি, ছিলেন লেখা ও বলায় গভীরভাবে সংযমী। বড় বড় লেখা তিনি লিখতেন না; বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রচুর বলতেনও না। কিন্তু তাঁর ছোট লেখায়ও থাকত অনুসন্ধান আর সিদ্ধান্তের আলো, স্বল্পকথার বক্তব্য শেষ হলে শ্রোতার মূলকথাটা জানা হয়ে যেত। এভাবেই অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর রচন, বচন ও আচরণে যে জীবনদর্শন রেখে গেছেন তা বাঙালি সমাজে আলো ছাড়াবে বহুদিন।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা