kalerkantho

রবিবার । ২৬ বৈশাখ ১৪২৮। ৯ মে ২০২১। ২৬ রমজান ১৪৪২

টিকা সরবরাহে জি-৭ যে ভূমিকা পালন করতে পারে

গর্ডন ব্রাউন

১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টিকা সরবরাহে জি-৭ যে ভূমিকা পালন করতে পারে

প্রেসিডেন্ট বাইডেন আগামী জুনে ব্রিটেনে আসবেন বিশ্বের ধনী দেশগুলোর শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে, এটা হবে তাঁর প্রথম সম্মেলন। জি-৭-এর সদস্য যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই সম্মেলনে উপস্থিত থাকে। এর নিয়মিত সভা আসে আর যায় এবং দ্রুত এসব মিটিংয়ের কথা ভুলে যাওয়া হয়। কিন্তু এবারের জি-৭ সম্মেলনে একটা সুযোগ রয়েছে, এটাকে বিনষ্ট করতে দেওয়া যাবে না। সম্মেলনের এজেন্ডার মূল বিষয় হওয়া উচিত স্বাস্থ্য প্রসঙ্গ : বিশ্বজুড়ে গণটিকা দান।

সমৃদ্ধ দেশগুলো বিশ্বের জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ ধারণ করে, তারা ৪.৬ বিলিয়ন ডোজ টিকা কিনেছে—কনফার্মড অর্ডারের ৬০ শতাংশ। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৮০ মিলিয়ন টিকা (ভ্যাকসিন) বিতরণ করা হয়েছে, কিন্তু সাব-সাহারান আফ্রিকান জনসংখ্যার ১ শতাংশের কম লোককে টিকা দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে ইমিউনাইজিং চলছে; কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের একটা অংশ এরই মধ্যে ‘ভ্যাকসিন বর্ণবাদ’-এর অভিযোগ তুলেছে। পরিস্থিতি যদি এ-ই হয়, তাহলে এ অবকাশে কভিড-১৯-এর বিস্তৃতি ঘটবে, ভাইরাসটির মিউটেশন ঘটবে আর আমাদের জীবন-জীবিকা আসন্ন দিনগুলোতে হুমকিগ্রস্ত হবে।

বিশ্বজুড়ে স্বল্পতম সময়ে বিপুলসংখ্যক লোকের কাছে পৌঁছতে হলে (টিকার জন্য) জি-৭-কে বৈশ্বিক ফার্মাসিউটিক্যাল ও লজিস্টিক কম্পানিগুলোর দক্ষতা, জাতীয় সেনাবাহিনীগুলোর সক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের এক জায়গায় আনতে হবে।

জি-৭-এর দেশগুলোতে বড় বড় ভ্যাকসিন ডেভেলপাররা থাকে। জি-৭-এর দেশগুলোই নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে টিকা প্রযুক্তি সরবরাহ করার বিষয়ে সম্মত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। রোগীদের বা আক্রান্তদের ‘অধিকার পরিত্যাগ’-এর যে কথা পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তার ফলে আফ্রিকায় তাদের নিজস্ব ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাসিলিটি তৈরি করায় সহায়তা হবে এবং এই কয়েক মাসে যে ‘ভ্যাকসিন ন্যাশনালিজম’ দেখা দিয়েছে তার অবসান হবে।

সামনের দিনে বড় বাধা টিকার ঘাটতির কারণে হবে না, বরং টিকার জন্য যে অর্থ দিতে হবে তার ঘাটতিই সেই বাধা হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের এখন অর্থ ব্যয় করতে হবে জীবন বাঁচানোর জন্য এবং আসন্ন দিনে আমাদের অর্থ ব্যয় করতে হবে প্রতিবছর টিকার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য; যত দিন পর্যন্ত এই ভাইরাস প্রাণনাশের কারণ হয়ে থাকবে, তত দিন পর্যন্ত এ কার্যক্রম চালাতে হবে। এর জন্য বছরে কমপক্ষে ৩০ বিলিয়ন ডলার দরকার, এ অর্থ খরচের ব্যাপারে কাউকে প্রস্তুত মনে হচ্ছে না।

আমরা নিষ্ক্রিয়তাকে গ্রাহ্য করতে পারি না। আমাদের যে তহবিল দরকার সেটা কভিডে যে ট্রিলিয়ন পরিমাণ ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে তার সামান্য অংশ মাত্র। বাইডেনের আমেরিকান রেসকিউ প্ল্যান বাবদ বরাদ্দের পরিমাণ ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার, আর কাঙ্ক্ষিত তহবিল এ বরাদ্দের ২ শতাংশেরও কম। ইউরেশিয়া গ্রুপ বলেছে, জি-৭ যদি জুনে গণটিকাদানের বিষয়ে একমত হতে পারে, তাহলে ২০২৫ সালের মধ্যে তাদের অর্থনীতি বেশ ভালো অবস্থানে থাকবে।

২০১৭ সালে এ রকম গ্লোবাল কো-অর্ডিনেশনের (ভবিষ্যৎ মহামারির সাপেক্ষে) কথা ভেবে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ ‘এসিটি-এক্সেলারেটর’ গঠন করা হয়েছিল জরুরি মেডিক্যাল সরবরাহের জন্য, তহবিল জোগানোর জন্য। এর নেতৃত্বে ছিল নরওয়ে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রস আদানোম গ্রেব্রেয়িসাস। গত বছর এর আওতায় কোভ্যাক্স গঠন করা হয়—উন্নয়নশীল দেশগুলোর ২০ শতাংশ লোককে টিকা দেওয়ার খরচ জোগানোর জন্য। আশা করা হচ্ছে, ২০২১ সাল শেষ হওয়ার আগেই ৯২টি দেশকে ১.৭ বিলিয়ন ডোজ টিকা সরবরাহ করা হবে, এতে ২৬ শতাংশ জনসংখ্যা কাভার হবে। বোধগম্য কারণেই আফ্রিকার নেতারা এখন ৬০ শতাংশ কাভারেজ চাচ্ছেন এবং শেষ নাগাদ ৭০-৮০ শতাংশ কাভারেজ চাচ্ছেন।

এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। অথচ কভিড এবং জাতীয় রাজনীতির কারণে বাইলেটারাল এইড কমিটমেন্ট গত বছর ৩০ শতাংশ কমানো হয়েছে; সহায়তার পরিমাণ ১০৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ৭৯ বিলিয়ন ডলারে নামানো হয়েছে। দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান এই ঘাটতির সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ মেটাতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও মাল্টিলেটারাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকগুলো প্রতিবছর আরো ১০ বিলিয়ন ডলার দিতে পারে। তাতেও টিকার প্রয়োজন মেটাতে সমস্যা হবে।

ফলে ধনী দেশগুলোর ওপরই দায়িত্ব বর্তায় তহবিলের জোগানদাতার ব্যবস্থা করার—যতক্ষণ না কভিড একেবারে নির্মূল হচ্ছে। ইকুইটেবল বার্ডেন-শেয়ারিংয়ের একটা সুবিধা ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু হলে ধনী দেশগুলো পাবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় টিকা-তহবিলের ২৫ শতাংশ জোগান দিতে হবে এবং যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপান প্রত্যেককে ৪-৭ শতাংশ জোগান দিতে হবে, যাতে দরিদ্রতম দেশগুলো এ বিষয়ক খরচের হাত থেকে রেহাই পায়। জি-৭ বলেছে, তার সদস্যদের পূর্ণ জোগান দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া উচিত, যার পরিমাণ মোট তহবিলের ৬০ শতাংশ। তারা সেটা করলে চীন, রাশিয়া ও স্ক্যান্ডিনেভীয় বিভিন্ন দেশ এবং তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো এ বাবদ সহায়তা করতে বাধ্য হবে।

 

লেখক : ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান ইউকে

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : সাইফুর রহমান তারিক



সাতদিনের সেরা