kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

দল হিসেবে ভালো খেলতে হবে

ইকরামউজ্জমান

২০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দল হিসেবে ভালো খেলতে হবে

ক্রিকেট বড় বেশি এলোমেলো হয়ে পড়েছে। ক্রিকেটাররা মাঠে মুখ উঁচু করে দাঁড়াতে পারছেন না। দলীয়ভাবে তাঁদের চেহারা বিবর্ণ। আত্মবিশ্বাসের অভাব, মুখে অবশ্য অন্য সুর। সততার সঙ্গে প্রতারণা। মাঠে প্রয়োগের বিষয়টি বড় বেশি প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিং প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োগে ঘাটতি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার পরও খেলোয়াড়রা বুঝতে পারছেন না তাঁদের দায়িত্ব কী। তাঁদের কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়। ক্রিকেটের কোনো সংস্করণে দেখা মিলছে না দলীয়ভাবে ভালো খেলা। কেউ এক ম্যাচে ভালো ব্যাট করছেন, বল করছেন, তার পরের ম্যাচেই রংহীন। ফিল্ডিংয়ে এত কিছুর পরও উন্নতি নেই। খেলোয়াড়রা পারছেন না দলীয়ভাবে ফিল্ডিংয়ে উন্নতি করার মানসিকতা প্রদর্শন করতে। এতে করে দল সব সময় ভুগছে। ধারাবাহিকতার সঙ্গে ভালো ক্রিকেট খেলার কোনো বিকল্প নেই।

মাঠের ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—দল হিসেবে, টিম হিসেবে বাংলাদেশ দল ভালো খেলতে পারছে না। সবার অংশগ্রহণ এবং অবদান ছাড়া তো দল ভালো করতে পারবে না। খেলা দেশের জন্য, আর সেই খেলাটি সবাই মিলেই খেলতে হবে। মাঠের লড়াইয়ে সবার দায়িত্ব আছে। এখানে সিনিয়র-জুনিয়র কোনো পার্থক্য নেই, সবাই সমান। সবাই তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার মধ্যে আছে আলাদা গৌরব এবং সম্মান। এখানে সঠিক ‘ক্যারেকটারের’ প্রতিফলনই কাম্য। দেশের খেলায় তো চিন্তাহীনতার সুযোগ নেই। টিম বাংলাদেশ মানেই তো এক প্রাণের অধিকারী একটি দল। এখানে তো দুই দল থাকার সুযোগ নেই। সবার এক পরিচয় ক্রিকেটার। তারকাবন্দনা মাঠের বাইরে। নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুযোগ নেই জাতীয় দলে। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যর্থতার স্বাদ আসবে। ভেঙে পড়লে চলবে না। সেই ব্যর্থতা থেকে, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়গুলোকে পরবর্তী সময়ে কাজে লাগাতে হবে। বারবার একই ভুল করা হবে কেন। কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়মিতভাবে খেলার পর টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান যখন বলেন, আমরা শিখছি—এরপর কী বলার আছে। জাতীয় দল নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কারো অধিকার নেই। ইচ্ছা হলো খেললাম। ইচ্ছা হলো খেললাম না। সমস্যা হলো কেউ অপরিহার্য নয়—এটা বলার শক্তি তো এত বছরেও ক্রিকেটে হয়নি।

বাংলাদেশ দল এ পর্যন্ত তিন সংস্করণের খেলায় যত জয়ের স্বাদ উপভোগ করেছে—এর পেছনে আছে দলের খেলোয়াড়দের সম্মিলিত প্রয়াস। দল ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিং ভালো করেছে বলেই জিতেছে। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের গুরুত্ব আছে—এগুলো জোড়া লাগাতে পারলেই তো সাফল্য ধরা দেয়। কেউ কেউ নেই তাতে কী, অন্যদের তো দায়িত্ব আছে।

উটপাখির মতো বালুতে ঠোঁট গুঁজে দিয়ে একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে, এই গত্বাঁধা বুলি দিয়ে আর নিকট-ভবিষ্যতের আরো এলোমেলো দিনগুলোর আশঙ্কা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা যৌক্তিক হবে না।

বিদেশের মাঠে ধারাবাহিকতা নেই। ঘরের মাঠে কি আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হওয়া যাচ্ছে? কয়েক মাস আগে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্টে দেশের মাটিতে কী দেখতে হয়েছে। ২-০-তে পরাজয় কেন, তার মূল্যায়ন তো হয়নি। সময় এবং পরিস্থিতিতে সামাল দেওয়ার জন্য লোক-দেখানো হা-হুতাশ। জয়ের অভ্যাস এবং জয়ের জন্য ক্ষুধা তো অন্য জিনিস। অন্য এক মানসিকতা। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ৩২ ম্যাচ খেলেও জয়ের দেখা পাওয়া যায়নি। রবার্ট ব্রুস ব্যর্থ হয়ে মন খারাপ করেছেন ঠিকই, এরপর কিন্তু অনুপ্রাণিত হয়ে সফল হয়েছেন। শুধু নিজের জন্য খেললে তো টিম বাংলাদেশ হবে না। অনুপ্রাণিত হতে হবে পুরো দলকে।

নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশ দল ভেঙে পড়েছিল। আর এই ভেঙে পড়াটাই ছিল স্বাভাবিক। খেলোয়াড়দের টেম্পারমেন্ট, টেকনিক, ফিটনেস, অভিজ্ঞতা, তাঁদের প্রয়োগক্ষমতা নিয়ে কতটুকু আলোচনা হয়েছে। তারকা খেলোয়াড়দের ‘লাইফ স্টাইল’ নিয়ে মিডিয়া কি ব্যস্ত ছিল না। যখন বলা হয়, অমুক খেলোয়াড়ের ব্যাট কথা বললে দলের সফলতা আসবে, আর তাঁর ব্যাট কার্যকর না হলে মহাবিপদ—তা হলে আর বাকি ১০ জন খেলোয়াড় দলে আছেন কেন? ১১ জনকে নিয়েই তো দলের শক্তি, সবাই তো দলের জন্য ভরসা।

ক্রিকেট চত্বরে ভর করেছে হতাশা। মুমিনুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল এখন দুটি টেস্ট ম্যাচ খেলার জন্য শ্রীলঙ্কায় অবস্থান করছে। দুটি টেস্ট ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে ক্যান্ডির পান্নেকেলে স্টেডিয়ামে যথাক্রমে ২১ থেকে ২৫ এপ্রিল এবং ২৯ এপ্রিল থেকে ৩ মে।

বাংলাদেশ দল ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কায় কলম্বোতে শততম টেস্ট ম্যাচে জয়ী হয়েছিল। এর আগে ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কায় টেস্ট ম্যাচ ড্র করেছে, মুশফিকুর রহীম তখন অধিনায়ক ছিলেন। পান্নেকেলের উইকেটে বাংলাদেশ আগে কখনো টেস্ট ম্যাচ খেলেনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, এই উইকেটে বাউন্স আছে এবং স্পোর্টিং উইকেট।

বাংলাদেশ দল প্রস্তুতি নিয়ে শ্রীলঙ্কা যায়নি। সময় পাওয়া যায়নি। স্কোয়াডে বেশির ভাগই সাদা বলের খেলোয়াড়। যাঁরা কিছুদিন আগে নিউজিল্যান্ডে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি খেলছেন। লাল বলে চার দিনের খেলায় খেলেছেন অধিনায়কসহ মাত্র কয়েকজন খেলোয়াড়। এটাই প্রস্তুতি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে নামার আগে ভালো প্রস্তুতি জরুরি। শ্রীলঙ্কা শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে বাংলাদেশ থেকে দলগত শক্তিতে অনেক এগিয়ে। তারা খেলবে দেশের পরিচিত উইকেটে। শ্রীলঙ্কার এই দল কয়েক মাস ধরে একসঙ্গে খেলছে। বাংলাদেশ দলে নেই সাকিব আল হাসান এবং মোস্তাফিজুর রহমান। তাঁদের ছাড়াই স্কোয়ার্ড গঠন করা হয়েছে। যাঁরা বাংলাদেশ স্কোয়ার্ডে আছেন তাঁদের মধ্যে তিনজন বাদে সবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা আছে। বলা হচ্ছে, তরুণদের ওপর আস্থা। আসলে কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার পর তাঁদের তরুণ বলাটা কতটুকু যুক্তিসংগত হচ্ছে। খেলোয়াড়দের যতটুকু সামর্থ্য আছে সেটা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারলে বাংলাদেশ দল ভালো না করার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশ দলকে ভালো খেলার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। ভালো খেলতে পারলে সবাই মিলে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হলে জয়ের সুখ একটি ম্যাচে হলেও দেখতে পেলে বর্তমানে যে হতাশা বিরাজ করছে সেটা কেটে যাবে।

মুমিনুলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ গত ছয়টি টেস্ট ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে জিতেছে। সবাই মিলে ক্রিকেটের তিন বিভাগে সমানভাবে পারফরম করতে পারলে জয় সম্ভব। এই জয়ের বড় বেশি প্রয়োজন আছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে। বর্তমানে জাতীয় দলের প্রধান কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর জন্য বর্তমান সফরটি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এরই মধ্যে কোচ ডমিঙ্গোর ভূমিকা এবং তাঁর কার্যকারিতা নিয়ে কথা উঠেছে। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। কোচের কাছ থেকে প্রত্যাশা একটি ‘ফল’। কোচের দায়িত্ব হলো খেলোয়াড়দের কাজে লাগিয়ে রেজাল্ট নিশ্চিত করা। কোচ পরিকল্পনা তৈরি করেন তার প্রয়োগের দায়িত্ব কিন্তু খেলোয়াড়দের। মুমিনুলের দলকে চ্যালেঞ্জ নিতেই হবে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য, এটি তিনি বুঝতে পারছেন। তাঁর দরকার সবার কাছ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক