kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ বৈশাখ ১৪২৮। ১০ মে ২০২১। ২৭ রমজান ১৪৪২

মহামারির সময় কেউই এককভাবে চলতে পারবে না

অনলাইন থেকে

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিশ্বজুড়ে মহামারি কোটি কোটি জীবন বদলে দিলেও একটি অভিন্ন অভিজ্ঞতা সবাইকে দিতে পারেনি। বরং এই দুর্যোগ আমাদের বিভাজনগুলোকে দূর করার পরিবর্তে আরো স্পষ্ট ও গভীর করেছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করে দিয়েছে, বিশ্বের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্দেশীয় বৈষম্য শুধু বজায়ই থাকবে না, বরং চলতি বছর আরো বৃদ্ধি পাবে। সংস্থাটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, সফল টিকাদান কর্মসূচি এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি ও ঋণ গ্রহণের সক্ষমতার কারণে ধনী পশ্চিমা দেশগুলো প্রত্যাশার চেয়েও অনেক দ্রুত সংকট থেকে বের হয়ে আসবে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ভুগতে হবে। কারণ গত বছর মহামারি-পূর্ব অনুমানের চেয়ে প্রায় সাড়ে ৯ কোটির বেশি মানুষকে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকতে দেখা গেছে।

একই সময়ে আরো এমন কিছু জায়গায় বিভাজন প্রকাশ পাচ্ছে, যা এক ধরনের নতুন স্বাভাবিক (নিউ নরমাল) বলে মনে হচ্ছে। এর মধ্যে চীনের কথা বলা যায়, যেখানে ভাইরাসটি প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল এবং তারা একসময় বিপর্যয়ের গভীরে ডুবে ছিল। এখন নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া একটি ট্রান্স-তাসমান ‘ট্রাভেল বাবল’ (কোয়ারেন্টিনমুক্ত ভ্রমণ করিডর) উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। তাইওয়ান সম্ভবত সবচেয়ে বড় সাফল্যের গল্প, যেখানে ভিড়কে স্বস্তির সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে। ইসরায়েলে অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যাকে পুরোপুরি টিকা দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশটিতে এখন দৈনন্দিন জীবনের অনেকটাই প্রাক-মহামারি সময়ের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। অথচ পশ্চিম তীর এবং গাজার ফিলিস্তিনিরা ঠিকই তুলনামূলকভাবে উচ্চ সংক্রমণের হার নিয়ে কঠোর নিয়মের মধ্যে দিন যাপন করছে। ইসরায়েলি সরকার তার সামরিক নিয়ন্ত্রণে থাকা এসব লাখ লাখ মানুষকে টিকা না দিয়ে নিন্দার মুখে পড়েছে (দেশটি অবশ্য তার দেশে বা অধিকৃত অঞ্চলে কাজ করা এক লাখ মানুষকে টিকা দিয়েছে)।

এর মধ্যেই গত সপ্তাহে ভারত এক দিনে সর্বোচ্চ এক লাখের বেশি সংক্রমণের নতুন রেকর্ড নথিভুক্ত করেছে। ইউরোপ ভুগছে তৃতীয় ঢেউয়ে। লাতিন আমেরিকায়ও একই অবস্থা। এরই মধ্যে মাথাপিছু টিকাদানের জন্য বিশ্বে তৃতীয় স্থানে থাকার পরও চিলিতে ভাইরাসটির নতুন ঢেউ মারাত্মকভাবে আঘাত হানছে। গত সপ্তাহেও দৈনিক সংক্রমণ বৃদ্ধির টানা দুটি রেকর্ড হয়ে যাওয়ার পর দেশটি তার সীমানা বন্ধ করে দিয়েছে।

এসব পরিস্থিতিতে ব্রিটেনকে একটি শীতল বার্তা দিচ্ছে। কারণ (ব্যাপক টিকাদানের পর) দেশটি ধীরে ধীরে বিধি-নিষেধ শিথিল করছে। অথচ আমরা জানতাম, স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি কিছু একটা পর্যায়ে ফিরতে একটি দীর্ঘ যাত্রার প্রয়োজন হবে। লোকজন এখন আনন্দ-উচ্ছ্বাস নিয়ে বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনে অংশ নিচ্ছে। অথচ ইংল্যান্ডের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ক্রিস হুইটি সতর্ক করে দিয়েছেন, কভিডের আরেকটি ঢেউ অনিবার্য। ব্রিটেনের সায়েন্টিফিক অ্যাডভাইজরি গ্রুপ ফর ইমার্জেন্সির (এসএজিই) প্রকাশ করা নথিপত্রও পূর্বাভাস দিচ্ছে যে গ্রীষ্মের শেষের দিকে সংক্রমণের আরেকটি চূড়া দেখা যাবে। ব্রিটেনে সব কডিভ মৃত্যুর অর্ধেকটা যেমন শুধু জানুয়ারিতে ঘটেছিল, আসন্ন গ্রীষ্মের শেষের পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ দৃশ্য নিয়ে হাজির হবে।

শুধু ভ্যাকসিনের ওপর নির্ভর করার বিপদ চিলি দেখিয়েছে। সম্ভবত তাদের মধ্যে একটি মিথ্যা নিরাপত্তা বোধও তৈরি করেছিল। এখন ব্রিটেনে টোরি দল থেকে বিধি-নিষেধ শিথিল অব্যাহত রাখতে যে চাপ দেওয়া হচ্ছে, তাতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক থাকতে হবে। ভ্যাকসিন কতটা সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে তা এখনো স্পষ্ট নয়। আবার যুক্তরাজ্য স্পষ্টভাবে টিকাদানে ধীরগতির মুখে পড়েছে। সুতরাং বাধা-নিষেধ শিথিল করার গতি অবশ্যই টিকাদানের গতিকে অতিক্রম করে গেলে হবে না। বরং বাধা-নিষেধ শিথিল করতে হবে সংক্রমণের মাত্রার ওপর নির্ভর করে। আরেকটা ঝুঁকি হালা ভাইরাসের ধরনগুলোর (ভেরিয়েন্ট) আমদানি, যা দ্রুত ছড়ায় এবং বিদেশ ভ্রমণের সম্ভাবনা বাড়ানো হলে এই ভেরিয়েন্টগুলোও বিদ্যমান ভ্যাকসিনের প্রতিরোধী বলে প্রমাণিত হতে পারে।

ভাইরাস এবং এর ধরনগুলো দেখিয়েছে যে অন্যান্য দেশের পাশাপাশি আমাদের সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে আমরা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। অধিক ধনী দেশগুলো এখন পর্যন্ত যা সংগ্রহ করেছে, তার চেয়ে তাদের উচিত ভ্যাকসিনের একটি ন্যায্যতার অংশ নিশ্চিত করা এবং তা অবশ্যই আরো সময়োপযোগী পদ্ধতিতে হবে। আর নতুন ধরন সৃষ্টির জন্য সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে এই ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বনেতারা মহামারির আসন্ন অবনতি ঠেকাতে তাঁদের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলছেন, তবু তাঁরা এর মোকাবেলায় একসঙ্গে কাজ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কিছু দেশকে অন্তত সাময়িকভাবে কভিডের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে; কিন্তু কেউই একলা চলার ওপর নির্ভর করতে পারে না।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা