kalerkantho

বুধবার । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৯ মে ২০২১। ৬ শাওয়াল ১৪৪

‘প্রাচীন রজনী নাশো নূতন উষালোকে’

রামেন্দু মজুমদার

১৪ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘প্রাচীন রজনী নাশো নূতন উষালোকে’

বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব সম্ভবত বাংলা নববর্ষ—পহেলা বৈশাখ। নাগরিক জীবনে আমরা এই উৎসবের উত্তাপ থেকে অনেক দিন দূরে ছিলাম। কিন্তু বাঙালির আত্মপরিচয়ের অভিযাত্রা যখন থেকে এ দেশে বেগবান হয়েছে, তখন থেকেই আমরা দৃষ্টি ফেরাতে আরম্ভ করি আমাদের লোকায়ত জীবনের দিকে, আমাদের ঐতিহ্যের দিকে। সেই চেতনাই আমাদের স্বাধিকারের আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে—যে আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয় স্বাধীনতাসংগ্রামে। আর বাঙালির এই দীর্ঘ পথপরিক্রমার নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি আমাদের জাতির পিতা।

নববর্ষের কথা মনে হলেই আমার স্মৃতির পথ বেয়ে আমি চলে যাই আমার শৈশবের দিনগুলোতে, আমার জন্মভূমি লক্ষ্মীপুরে। এখন জেলা শহরের তকমা পেলেও আমাদের শৈশব-কৈশোরে লক্ষ্মীপুর ছিল একটা থানা শহর, শহর না বলে বর্ধিষ্ণু গ্রাম বলাটাই সংগত। একটাই পাকা রাস্তা, বিদ্যুতের আলো আমরা দেখেছি পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে। তবে একটা আদালত ছিল, যাকে কেন্দ্র করে একটা শিক্ষিত সমাজ গড়ে উঠেছিল, ছিল একটা হাই স্কুল, যা স্থানীয় আইনজীবীদের উদ্যোগে ১৮৮৭ সালে  প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

পহেলা বৈশাখ প্রধানত আমাদের জন্য দুটি কারণে বিশেষ আগ্রহের উৎসব ছিল। প্রথমত, এ উপলক্ষে নতুন জামাকাপড় পাওয়া যেত। আমাদের ছোটবেলায় আমরা দুর্গাপূজা আর নববর্ষেই নতুন জামা পেতাম। সচ্ছল পরিবার হলেও, বছরের যেকোনো সময়ে ইচ্ছা হলেই জামাকাপড় কেনার রেওয়াজ ছিল না আমাদের। তার জন্য অবশ্য আমাদের কোনো আক্ষেপও ছিল না। দ্বিতীয় কারণ ছিল, বড়দের প্রণাম করে কিছু নগদ অর্থপ্রাপ্তি হতো। সেটা নিয়ে মেলায় যাওয়া।

চৈত্রসংক্রান্তিতে সবাই ঘরদোর, বিশেষ করে রান্নাঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করত। গ্রামে মাটির ভিটাগুলোতে নতুন করে প্রলেপ দেওয়া হতো। ওই দিন দুপুরে কেউ ভাত খেত না; চিড়া-মুড়ি-খই, নারকেল, সন্দেশ, ফল ইত্যাদি ছিল দুপুরের খাবার। পরে এর কারণটা বুঝতে পারলাম। রান্নাঘর পরিষ্কার করতে হতো বলে রান্না করার সুযোগ হতো না। সব আচারেরই একটা কার্যকারণ থাকে।

চৈত্রসংক্রান্তির আরো অনেক অনুষ্ঠান হতো। চড়কপূজা, গাজন মেলা ইত্যাদি আনন্দ অনুষ্ঠানে শুধু ছোটরা নয়, বড়রাও সমান আনন্দ পেতেন। বেশির ভাগ জায়গায়ই মেলা শুরু হতো, যা নববর্ষের দিন পেরিয়েও কয়েক দিন চলত।

আমি ও আমার চার বছরের ছোট বোন রত্না লক্ষ্মীপুরে একসঙ্গেই বড় হয়েছি। পহেলা বৈশাখে বাবা সকাল থেকেই তাঁর বৈঠকখানায় বসতেন। তিনি আইনজীবী ছিলেন বলে অনেক মক্কেল এই শুভ দিনে এসে ওকালতনামা সই করাতেন। আমার আর রত্নার কাজ ছিল—ওকালতনামার উল্টো পিঠে কী যেন একটা সিল দেওয়া, তারপর বাবা সই করতেন। আর মক্কেলরা ফিস দিতেন। তখন বড় উকিলরাও ওকালতনামায় শুধু সই করার জন্য দুই টাকা নিতেন। সে সময়ে এক টাকার কয়েন খুব চালু ছিল। আমি আর রত্না সে টাকাগুলো থরে থরে সাজিয়ে রাখতাম। আর কিছু লোক আসত খাজনা দিতে। বড় হয়ে জানতে পারি, আমাদের একটা ছোট জমিদারির এরা নাকি প্রজা। বছরের শুরুতে তাই খাজনা দেওয়া। পাছে আমাদের মাঝে কোনো গরিমা তৈরি হয়, সে কারণেই বোধ হয় মা-বাবা আমাদের এ নিয়ে কিছু বলতেন না।

বিকেলের দিকে বাবা আমাদের ওই সাজানো টাকা থেকে কয়েক টাকা দিতেন মেলায় যাওয়ার জন্য। আমাদের বাড়ি থেকে আধামাইল দূরে ভবানীগঞ্জ যাওয়ার পথে একটা বড় বটগাছকে কেন্দ্র করে নববর্ষের মেলা বসত। আমরা বলতাম ‘গলইয়া’। টাকা পেয়েই সোজা দৌড়াতাম মেলার দিকে। তবে একা যেতে পারতাম না, সঙ্গে বড় কাউকে দেওয়া হতো। মেলায় নানা ধরনের খেলনা, মাটির ও বাঁশের জিনিস, গৃহস্থালির তৈজসপত্র, নানা রকমের মিষ্টি ইত্যাদি পাওয়া যেত।

আমার শখ ছিল সব সময় টিনের তৈরি করা চাকা লাগানো মোটরগাড়ির। মেলা থেকে সুতা দিয়ে টেনে টেনে মহানন্দে বাড়ি ফিরতাম। স্কুলে থাকতে খুব আগ্রহ ছিল একটা সাইকেলের, সেটা পেলাম কলেজে উঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনশন করে বাবার কাছ থেকে একটা ৫০ সিসি হোন্ডা আদায় করেছিলাম। আর ছোটবেলার গাড়ির শখ মিটল ৫০ বছর যখন বয়স হলো। আমার নাতনি ‘ইচ্ছা’ যখন বলে ওর ১৮ বছর বয়স হলে আমার এখনকার গাড়িটা ওকে দিয়ে দিতে, তখন ওকে এসব গল্প শোনাই।

নববর্ষে হালখাতা আরেকটা আনন্দের ব্যাপার ছিল। সব ব্যবসায়ী নতুন বছরে নতুন (বাকির) হিসাবের খাতা খুলতেন। খদ্দেররা কিছু টাকা জমা করতেন আর তাঁদের মিষ্টিমুখ করানো হতো। আমরাও বাবার সঙ্গে পরিচিত দোকানে গিয়ে মিষ্টি খেয়েছি।

কী আনন্দময় ছিল আমাদের শৈশব। স্কুলের পড়া শেষে যখন লক্ষ্মীপুর ছেড়েছি, তখন থেকেই নববর্ষের আনন্দ ফিকে হয়ে এসেছে। বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকায় আবার সে আনন্দ ফিরিয়ে আনল ছায়ানট রমনার বটমূলে প্রভাতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তারপর যুক্ত হলো চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকদের কল্যাণে মঙ্গল শোভাযাত্রা। পহেলা বৈশাখ মনে হয় পুরো ঢাকা শহরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। এখন শুধু ঢাকায় নয়, বাংলাদেশের অনেক জায়গায়ই প্রভাতি অনুষ্ঠান হয়, মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়।

এবার নববর্ষের সব আনন্দকে স্তব্ধ করে দিয়েছে অকল্পনীয় এক অতিমারি কভিড-১৯। নতুন বছরে আমরা কেউ কারো সঙ্গে মিলতে পারব না। তবে এই কষ্ট আমরা হাসিমুখে মেনে নেব, যদি এই পৃথিবী থেকে অতিমারির অবসান হয়। বেঁচে থাকলে অনেক পহেলা বৈশাখ আসবে আমাদের জীবনে (অবশ্য আমার মতো  ৮০ ছুঁই ছুঁই মানুষের কথা বাদ দিয়ে)। প্রকৃতির কাছে মানুষ যে কত অসহায়, তা আমরা মর্মে মর্মে অনুভব করেছি। সর্বংসহা ধরিত্রীকে আর নয় পীড়ন।

নববর্ষের পুণ্য প্রভাতে রবীন্দ্রনাথের বাণী কণ্ঠে ধারণ করে প্রার্থনা করি—

‘নূতন প্রাণ দাও, প্রাণসখা, আজি সুপ্রভাতে বিষাদ সব করো দূর নবীন আনন্দে, প্রাচীন রজনী নাশো নূতন উষালোকে’

আমরা বাঁচি আশায়, ভালোবাসায়। ধরার বুকে নতুন সূর্য উঠবেই। নববর্ষ সবার জন্য মঙ্গলময় হোক।

 

লেখক : অনারারি প্রেসিডেন্ট (ওয়ার্ল্ড ওয়াইড), ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (আইটিআই)



সাতদিনের সেরা