kalerkantho

বুধবার । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৯ মে ২০২১। ৬ শাওয়াল ১৪৪

ভিন্নমত

লকডাউনের বিকল্প চিন্তাই অর্থনীতির জন্য মঙ্গল

আবু আহমেদ

১১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



লকডাউনের বিকল্প চিন্তাই অর্থনীতির জন্য মঙ্গল

বাংলাদেশে কভিড-১৯ সংক্রমণ শুরুর দিকে লকডাউনজাতীয় বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তখন ব্যাপক হারে লোকজনের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়ায়নি। ফলে সংক্রমণের গতি নিয়ন্ত্রণে বিধি-নিষেধগুলোর দরকার ছিল। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, তখন ‘লকডাউনের’ মধ্যেও প্রতি সপ্তাহে সংক্রমণ বাড়তে থাকে এবং পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এবারের বাস্তবতা হলো ভাইরাসটি সর্বত্র কমবেশি ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে করোনাভাইরাসের বিভিন্ন ধরনও (ভেরিয়েন্ট) দেখা দিয়েছে। ফলে এবার লকডাউন কতটা কার্যকর হবে তা সুস্পষ্ট নয়। কিন্তু দেশে লকডাউন দেওয়া মানে যে অর্থনীতিকে লকডাউন করে দেওয়া—সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অর্থনীতিকে লকডাউন করে দেওয়ার অর্থই হলো মানুষের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, ভোগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। পরিণামে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়া এবং দেশ পিছিয়ে যাওয়া। তাই আমাদের বিকল্পটা নিয়েই ভাবতে হবে, বেশি জোর দিতে হবে।

আমি গত এক মাস ধরে দেখছি, টিসিবির তেল, চিনি, চাল, ডাল, পেঁয়াজ বিক্রির ট্রাকের পেছনে লম্বা লাইন। খেয়াল করলে দেখা যাবে, শুধু নিম্নবিত্ত নয়, অনেক সম্পন্ন মধ্যবিত্তও আজ লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ একসময় তারা ট্রাকের পেছনে দাঁড়িয়ে এসব পণ্য কেনার জন্য অপেক্ষা করত না। এর অর্থটা কী? অর্থটা হলো তাদের আয় কমে গেছে। বাজারে গিয়ে পণ্যগুলো কেনার মতো ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। কেন এমনটা হবে? বিশ্বব্যাংক বলছে, আমাদের অর্থনীতি এখনো সাড়ে ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি করছে। তাহলে একটা শ্রেণি এই দুরবস্থায় পতিত হলো কেন? কারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের একটা অংশের আয়প্রবাহ কমে গেছে। আর এটা ঘটেছে গত বছরের লকডাউন থেকে ।

আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষকে অলস করে রাখা, ভোগকে দমিয়ে দেওয়া, বিনিয়োগকে না করে দেওয়া—এমনটা বাংলাদেশ সইতে পারে না। উন্নত দেশ পারতে পারে, আমরা নই। ভারতও আঞ্চলিক ভিত্তিতে লকডাউন করছে। তাই আমাদের সক্ষমতার দিকটি বিবেচনা করতে হবে। এক সপ্তাহের ‘লকডাউন’ নিয়েও প্রশ্ন আছে। তা এক সপ্তাহ বা ১০ দিন করে বাড়ানো হবে এমন ধারণাও কেউ কেউ করছেন। কিন্তু লকডাউনের মাধ্যমে অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরা হবে এবং সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গতবার ‘লকডাউনের’ সময় বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অর্ধেক বেতন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ‘লকডাউন’ দীর্ঘায়িত করলে এবারও কি তা-ই হবে না? শুনতে খারাপ লাগলেও বলি, সংশ্লিষ্ট খাতের যারা লকডাউনের পক্ষে কথা বলেন তাদের যদি বলা হয় যে লকডাউনের সময় বেতন দেওয়া হবে না কিংবা অর্ধেক বেতন দেওয়া হবে, তখনো কি তারা লকডাউনের পক্ষে থাকবেন? নিশ্চয়ই না।

লকডাউনের মতো বিধি-নিষেধগুলোর কারণে গরিব লোকেরা যে সমূহ বিপদে পড়বে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রাজধানী ঢাকায় কতগুলো লেবার মার্কেট আছে। সেখানে দিনমজুররা কোদাল, টুকরি নিয়ে বসে থাকে। তাদের ডাকলে তারা বিভিন্ন বাসাবাড়ি বা অফিসে দিনমজুরের কাজ করে। এখন এসব মানুষের কাজ যদি বন্ধ থাকে, তারা কী করবে? তারা তো দিন আনে, দিন খায়। লকডাউন এদের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে? আমি অর্থনীতির লোক। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং গরিব লোকেরা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেটার পক্ষে আমি কোনো যুক্তি দাঁড় করাতে পারি না। সমগ্র অর্থনীতিকে লকডাউন দেওয়া সহজে মেনে নিতে পারি না। করোনার কারণে এরই মধ্যে ৩৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমায় চলে গেছে। এখন কি নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিকে আরো বেশি পরিমাণে ওই দিকে ঠেলে দিতে পারি? লকডাউন আমাদের রপ্তানি খাতকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিদেশে জনবল পাঠানোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আমাদের মতো দেশ দ্বিতীয়বার লকডাউনের ধকল কতটা সইতে পারবে, তা খুবই চিন্তার বিষয়, সেটা পূর্ণ লকডাউন হোক বা লকডাউনের আদলে বিধি-নিষেধই হোক। তার চেয়ে বরং সরকারের উচিত জনসমাবেশের ওপর কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা। সিনেমা হল কিংবা পর্যটনকেন্দ্রে লোক-সমাগম কমিয়ে রাখা। স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করতে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি কভিড চিকিৎসা সহজলভ্য করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে সিট বাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, প্রাইভেট মেডিক্যালগুলোকে কভিড চিকিৎসায় উৎসাহ দিতে হবে, আইসিইউ বাড়াতে বাধ্য করতে হবে। ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করতে হবে। যতটা সম্ভব দ্রুত টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকার বিদেশে উদ্ভাবিত টিকাগুলো দেশে এনে উৎপাদনের যে চিন্তা করছে, সেটাকে এগিয়ে নিতে হবে।

শুধু জনগণ কেন, লকডাউনের কারণে সরকারও তো সমস্যায় পড়বে। অর্থবছরের শেষ কোয়ার্টারে এসে সরকারের রাজস্ব আহরণের দিকটাও দেখতে হবে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তা জালের (সোশ্যাল সেফটিনেট) জন্য আরো টাকা খরচ করতে চায়। কিন্তু ‘লকডাউন’ অব্যাহত রাখলে তো সেই টাকা রাজস্ব সংগ্রহ থেকে আসবে না। কারণ রাজস্ব সংগ্রহ নির্ভর করে মূলত ভোগ ও বিনিয়োগের ওপর। এখন লকডাউনের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও ভোগকে নিরুৎসাহ করলে রাজস্ব সংগ্রহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া সরকার যে উন্নয়নকাজগুলো করছে এর অর্থায়নের জন্য সরকারকে ঋণ করতে হবে। সোশ্যাল সেফটি নেটের জন্য ঋণ করতে হবে। আর সরকারের ঋণ বাড়লে মূল্যস্ফীতিও বাড়বে এক পর্যায়ে। তখন তো সবার অবস্থাই খারাপ হয়ে যাবে। তাই বাংলাদেশের যেটা করা উচিত তা হলো অর্থনীতি ও মানুষ দুটিকেই একসঙ্গে বাঁচানো। এ জন্য লকডাউন নয়, বরং স্বাস্থ্যবিধিতে জোর দিতে হবে এবং কভিড চিকিৎসায় মানুষকে আস্থা জোগাতে হবে।

গত এক সপ্তাহের ‘লকডাউনে’ শিল্প-কারখানাগুলোকে বাইরে রাখা হয়। কিন্তু কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন, বাজারজাত ও ভোগ—সব কিছুই বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ সাধারণ দোকানপাট বন্ধ। গতবারও লকডাউনের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির। এবার আরো বেশি হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এরই মধ্যে পুঁজি হারিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তরুণদের অনেকে নতুন করে শুরু করছে। এখন দ্বিতীয় দফা ‘লকডাউন’ সব উদ্যোগ ধ্বংস করে দেবে। আমাদের মনে রাখতে হবে কর্মসংস্থানের দিক থেকে আমাদের অর্থনীতির বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। আমি একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে বলব, আমাদের স্বাস্থ্যবিধির ওপর জোর দিয়ে লকডাউন থেকে সরে আসতে হবে। কারণ লকডাউনের যে উপকার হবে, তার থেকে অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে।

আরেকটা বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। এ ধরনের আপৎকালে গরিব লোকেরা আরো গরিব হয়। ধনী লোকেরা আরো ধনী হতে থাকে। অর্থাৎ বৈষম্য মারাত্মক আকার ধারণ করে। বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। বিধি-নিষেধগুলোকে লকডাউন মনে করে সামর্থ্যবান লোকজন বাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তাতে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায় এবং ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়ে। গতবারের কথা আমার মনে আছে, কেউ কেউ ছয় মাসের খাদ্যদ্রব্য, মাছ, মাংস কিনে বাসাবাড়িতে জমা করেছে। সুতরাং লকডাউন মানেই গরিব লোকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। তাই তাদের দিকে তাকিয়ে হলেও অর্থনীতিকে সচল রাখতে হবে। ভোগ ও সরবরাহব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে। খুচরা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখতে হবে। ব্যাংকগুলো দুই-আড়াই ঘণ্টা নয়, স্বাভাবিক নিয়মে খোলা রাখতে হবে। এটাও একটা চিন্তার বিষয় যে অল্প সময়ের জন্য ব্যাংক খোলা রাখলে সেখানে ভিড় বেড়ে যাবে, যাতে সংক্রমণ উল্টো বাড়তে পারে। লকডাউনের আরেকটা কুফল হলো, এতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে যায়। আর আতঙ্ক হলো অর্থনীতির শত্রু। তাই আমাদের আতঙ্ক সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকা উচিত। আতঙ্কের কারণে মানুষের মধ্যে মজুদদারিও বেড়ে যায়।

মোটকথা আমাদের এই সংক্রমণ পরিস্থিতিটাকে সহজভাবে নিতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে যেখানে লোক-সমাগম বারণ করা যায়, সেখানে তা করতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই অর্থনীতিকে লকডাউনে ফেলা উচিত নয়।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা