kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

বাঁচার জন্য বনের বাস্তুতান্ত্রিক সেবা প্রয়োজন

বিধান চন্দ্র দাস

৩ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাঁচার জন্য বনের বাস্তুতান্ত্রিক সেবা প্রয়োজন

বনের বাস্তুতান্ত্রিক সেবা এখনো আছে বলেই আমরা বেঁচে আছি। বন থেকে যে উপকার বা সুবিধাগুলো আমরা পাই, সাধারণভাবে তাকেই বনের বাস্তুতান্ত্রিক সেবা বলা হয়। এই সেবাগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটি দৃশ্যমান আবার কোনো কোনোটি অদৃশ্যমান। যে ব্যক্তি জীবনে কোনো দিন একবারের জন্যও কোনো বনে পা রাখেননি, তিনিও কিন্তু বনের বাস্তুতান্ত্রিক সেবা পেয়ে থাকেন। আসলে বনের এই বাস্তুতান্ত্রিক সেবা আমরা পাচ্ছি বলেই আমরা বেঁচে আছি। এই সেবা ছাড়া পৃথিবীতে মানুষসহ অনেক প্রাণী বেঁচে থাকতে পারত না।

বনের বাস্তুতান্ত্রিক সেবাগুলোকে মোট চার ভাগে ভাগ করা হয়। অতি সংক্ষেপে এগুলো হচ্ছে—১. বস্তুগত সেবা : বনের লতা, পাতা, ফল, মূল, কাঠ ইত্যাদি—যা খাদ্য, ওষুধ কিংবা অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়। ২. নিয়ামক সেবা : কার্বন জমাকরণ ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, মিঠা পানির দূষণ ও মৃত্তিকা ক্ষয়রোধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা ইত্যাদি। ৩. সহায়তা সেবা : মৃত্তিকা তৈরি, অক্সিজেন উৎপাদন, পুষ্টি আবর্তন ইত্যাদি। ৪. সাংস্কৃতিক সেবা : আধ্যাত্মিক প্রশান্তি, চিত্তবিনোদন, পর্যটন, শিক্ষা ইত্যাদি।

এ বছর বিশ্ব বন্য প্রাণ (বিখ্যাত ইংরেজি অভিধানগুলোর সংজ্ঞানুযায়ী ওয়াইল্ডলাইফের বাংলা হওয়া উচিত বন্য প্রাণ, বন্য প্রাণী নয়) দিবসের প্রতিপাদ্য করা হয়েছে, ‘বন ও জীবিকা : মানুষ ও পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখছে (ফরেস্ট অ্যান্ড লাইভলিহুডস : সাসটেইনিং পিপল অ্যান্ড প্লানেট)’। এই প্রতিপাদ্য জাতিসংঘ ঘোষিত উন্নয়ন অভীষ্টগুলোর কয়েকটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বনের সঙ্গে প্রাণীর সম্পর্ক গভীর। লাখো কোটি বছর ধরে এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বনভূমির বিকাশ ও বিস্তারে সাহায্য করে নানা ধরনের প্রাণী। বিশেষ করে অমেরুদণ্ডী প্রাণী। আবার প্রাণীদের বেঁচে থাকতেও সাহায্য করে বনভূমি। পৃথিবীতে ৩০ থেকে ৩৫ কোটি মানুষ বনের মধ্যে কিংবা বনের ধারে বসবাস করে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ জীবিকার জন্য বনের ওপর নির্ভরশীল। আসলে আমাদের জীবন ও জীবিকার জন্য বনই হচ্ছে জিয়নকাঠি। এই সব বিবেচনায় এ বছরের বিশ্ব বন্য প্রাণ দিবসের প্রতিপাদ্যটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

মানুষ যখন আরণ্যক জীবন যাপন করত, তখন বন তথা বন্য প্রাণ (প্রাণী, উদ্ভিদ ও অণুজীব) ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। শেষ বরফ যুগের পর (১০ থেকে ১১ হাজার বছর আগে) পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বরফ গলে গেলে আবার সেসব জায়গায় বনভূমি তৈরি হয়। মোটামুটি এই সময় (পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় কিছু আগে কিংবা পরে) শুরু হয় কৃষি। এর জন্য পরিবেশের ওপরে সেই সময়ে কিংবা তার পরেও লক্ষণীয় কোনো ক্ষতি হয়নি। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি (শিল্প বিপ্লবের শুরু) থেকেই শুরু হয় বিপত্তি। যন্ত্র আর জনসংখ্যার ক্রমাগত বৃদ্ধিতে বন তথা বন্য প্রাণ সংকুচিত হতে শুরু করে। মানুষ নির্দয়ভাবে বন সংহারে মেতে ওঠে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে এখনো এটি অব্যাহত আছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের বিবেচনাহীন কর্মকাণ্ডে আমাদের জিয়নকাঠি এই বন ক্রমাগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার গত বছরের হিসাব অনুযায়ী বিগত এক দশকে প্রায় ১৮ কোটি হেক্টর বনভূমি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এই আয়তন উত্তর আফ্রিকার একটি দেশ লিবিয়ার আয়তনের প্রায় সমান। বলা হচ্ছে, ২০১৫ থেকে ২০২০ পর্যন্ত প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ হেক্টর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অন নেচার) নথিভুক্ত পৃথিবীর ২০ হাজার বনজ বৃক্ষ প্রজাতির মধ্যে আট হাজার প্রজাতিকে লাল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। অর্থাৎ এই ২০ হাজার প্রজাতি হুমকিগ্রস্ত। প্রধানত মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড (কৃষি, শিল্প, রাস্তা ও অবকাঠামো নির্মাণ, কাঠ চুরি, খনিজ দ্রব্য আহরণ ইত্যাদি) ও অব্যবস্থাপনার জন্যই বন ধ্বংস হচ্ছে। আর এর ফলে ধ্বংস হচ্ছে অন্যান্য বন্য প্রাণ।

জাতিসংঘের একাধিক প্রতিবেদনে বন সংরক্ষণে বনের মধ্যে কিংবা পাশে বসবাসকারী আদিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা বলা হয়েছে। সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডের রাজকীয় সম্মানে ভূষিত কবি, জন ড্রাইডেন অরণ্যবাসীদের প্রকৃতির মহান আদিম সন্তান বলে অভিহিত করেছিলেন। এই জনগোষ্ঠী প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকার জন্য বন থেকে তারা শুধু বনজ দ্রব্য আহরণ করে না, বনকে সংরক্ষণও করে। এটি তাদের সংস্কৃতিরও অঙ্গ। এ বছর বিশ্ব বন্য প্রাণ দিবসকে উপলক্ষ করে জাতিসংঘ থেকে তাদের বন সংরক্ষণের সংস্কৃতিকে অনুসরণ করার জন্য বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের বনকে প্রধানত ক্রান্তীয় চিরসবুজ বন (পাহাড়ি বন), ক্রান্তীয় আর্দ্র পাতাঝরা বন (শালবন), ম্যানগ্রোভ বন ও জলাভূমির বন হিসেবে ভাগ করা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশে উপকূলীয় এলাকায় সৃজিত বন ও গ্রামীণ বনও রয়েছে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত বন অধিদপ্তরের ‘ফরেস্ট ইনভেন্টরি’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমাণ ১৮ লাখ ৮৪ হাজার ১৯ হেক্টর আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিবেদন, গবেষণাপত্র ও বিশ্ব বন পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ’ অনুসারে বাংলাদেশে বন উজাড় ও বনের অবক্ষয় (বৃক্ষের আচ্ছাদন কমে যাওয়া) ঘটেছে।

আমাদের দেশে মূলত বনভূমির ওপর দেশের বিপুল জনসংখ্যার অভিঘাত তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত। বাংলাদেশে বন উজাড় ও বন অবক্ষয়ের জন্য প্রধানত এই দুটি কারণ দায়ী। বন্য প্রাণকে রক্ষা করতে হলে যেকোনো মূল্যে বন সংরক্ষণের বিকল্প নেই। বনের সম্পদকেন্দ্রিক প্রত্যক্ষ বলয়ের মধ্যে বসবাসকারী মানুষদের বন ব্যবস্থাপনায় (কো-ম্যানেজমেন্ট) বেশি করে জড়িত করাসহ তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়টি কার্যকর করা প্রয়োজন। দেশে যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক বনভূমি পুনরুদ্ধার করা দরকার। সামাজিক ও কৃষি বনায়ন আরো গভীরভাবে সম্প্রসারণ করার মাধ্যমে দেশে কাঠের চাহিদা (জ্বালানিসহ) পূরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আকর্ষণীয় প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এগুলো বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জিং; কিন্তু অসম্ভব নয়।

এবারের বিশ্ব বন্য প্রাণ দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ওয়েব পেজে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কনজারভেশন বায়োলজিতে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে এই জনগোষ্ঠীর মুখ্য ভূমিকার কথা বলা হয়। বন কিংবা বনের ধারে বাস করা জনগোষ্ঠীর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আহরিত ও সঞ্চালিত জ্ঞানকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। তাদের জীবিকা, বন্য প্রাণ ও বন সংরক্ষণের ব্যাপারে বাইরের কোনো মডেল তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে তার ফলাফল সুস্থায়ী না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির সঙ্গে মিল রেখে কর্মপরিকল্পনা করা প্রয়োজন। তবে তার জন্য দরকার নিবিড় গবেষণা। একমাত্র গবেষণার মাধ্যমেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও স্থানীয় মানুষদের বন্য প্রাণ তথা বন সংরক্ষণ বিষয়ক চিরায়ত জ্ঞান সম্পর্কে জানা সম্ভব। তবে আমাদের দেশের বাস্তবতায় বনসংশ্লিষ্ট স্থানীয় জনগোষ্ঠী চিহ্নিতকরণে যথেষ্ট বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য