kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বীমার ভূমিকা

এস এম ইব্রাহিম হোসাইন

১ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বীমার ভূমিকা

এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, যা বৈশ্বিক লক্ষ্য  (Global Goal) হিসেবেও পরিচিত, ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সব সদস্য দেশ দারিদ্র্য দূর করে পৃথিবীকে রক্ষা করতে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সব মানুষ শান্তি ও সমৃদ্ধি উপভোগ করার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য সর্বজনীন আহ্বান হিসেবে গৃহীত হয়েছিল।

প্রথম লক্ষ্য—সর্বত্র সব মানুষের জন্য দারিদ্র্যের সম্পূর্ণ অবসান  SDG-এর লক্ষ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যা অন্যান্য লক্ষ্য অর্জনেও সহায়ক ভূমিকা রাখে। মধ্যম ও নিম্ন আয়ের যারা বীমা নেয়, তারা যখন কোনো প্রচণ্ড ধাক্কা খায় বা বিপদে পড়ে আবার দারিদ্র্যে নিপতিত হয়, বীমা তাদের দারিদ্র্যের হাত থেকে রক্ষা করে। যাদের বীমা থাকে না, তারা যখন বিপদে পড়ে প্রায়ই সঞ্চয় ভেঙে ফেলে, আত্মীয়-পরিজনের কাছ থেকে ঋণ নেয় বা  NGO/ব্যাংক থেকে উচ্চসুদে ঋণ নেয়, ফলে পরিবারের ভরণ-পোষণে মিতব্যয়ী হয়, কখনো নামমাত্র মূল্যে সম্পদ বিক্রি করে দেয়। ক্ষুদ্র বীমার মাধ্যমে যখন আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা হয়, তখন ক্ষুদ্রঋণ বীমা, কৃষি বীমার মাধ্যমে গরিব ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি হয় এবং দারিদ্র্য হ্রাস পায়।

দ্বিতীয় লক্ষ্য—ক্ষুধা অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা এবং উন্নত পুষ্টিমান অর্জন এবং টেকসই কৃষি প্রসার। ‘ক্ষুধা’ উন্নয়নের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা। ধারণা করা হয় যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মানুষের স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের জন্য পর্যাপ্ত খাবার নেই (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)। গত ১০ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ জিডিপির .৫ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত বার্ষিক খরচ হয়েছে। আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে যে ১০টি দেশ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে, তন্মধ্যে বাংলাদেশ একটি। সুতরাং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যেমন—বন্যা, সাইক্লোন, খরা ইত্যাদি দুর্যোগে কৃষকের যে ফসল ক্ষতি হয় তা পূরণের জন্য কৃষি বীমা একটি উত্কৃষ্ট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা মাধ্যম হতে পারে। বীমা প্রাকৃতিক বড় দুর্যোগে মানুষকে সহায়তা করতে পারে নতুবা স্বল্প আয়ের মানুষ হতদারিদ্র্যে নিমজ্জিত হবে।

তৃতীয় লক্ষ্য—সব বয়সী সব মানুষের জন্য সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণ। সব বয়সের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নতুবা উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এবং উদীয়মান অর্থনীতিতে কার্যকর সর্বজনীন স্বাস্থ্য কাভারেজ স্কিমের অভাবে, স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠী তাদের স্বাস্থ্যের যত্ন ব্যয়ের  (Health expenditure) জন্য লড়াই করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের মানুষের পকেটের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবছর ৭ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। জিডিপির মাত্র ৩.৪ শতাংশ সরকার স্বাস্থ্য খাতে খরচ করে। অর্থ সংকটের কারণে যেন কারো চিকিৎসা ব্যাহত না হয়, এ জন্য অনেক দেশ আগে থেকেই এ ব্যাপারে একটি তহবিল গঠনের ব্যবস্থা প্রচলন করে, যা ‘স্বাস্থ্য বীমা’ ব্যবস্থা।

পঞ্চম লক্ষ্য—লিঙ্গসমতা অর্জন এবং সব নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন। লিঙ্গভেদে নারী ও পুরুষদের ঝুঁকি রয়েছে। এই পার্থক্যগুলো জৈবিক এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক উভয় কারণ দ্বারা চালিত। জাতীয় বীমানীতি ২০১৪-এর ৪৩ নম্বর ক্রমিক অনুযায়ী নারীর স্বাস্থ্য ও জীবনকেন্দ্রিক স্বল্প প্রিমিয়ামভিত্তিক বীমাপণ্য উদ্ভাবন, যেমন—নারীর জন্য সঞ্চয় বীমা, দুর্ঘটনা বীমা, গ্রুপ বীমা ইত্যাদি এবং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক শর্তাদি (যেমন—গর্ভধারণ ধারা) বিলোপকরণের কথা বলা হয়েছে। অথচ আমাদের দেশে জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো নারীর জীবন বীমা অবলিখনে ঝুঁকি পরিহার করার জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় গর্ভধারণে সন্তান প্রসবজনিত জটিলতায় নারীর মৃত্যু হলে দাবি পরিশোধ করা হয় না। এটা পরিবর্তন হওয়া বাঞ্ছনীয়।

অষ্টম লক্ষ্য—সবার জন্য পূর্ণাঙ্গ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং শোভন কর্মসংযোগ সৃষ্টি এবং স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন। বীমা সম্পদ রক্ষা করে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিনিয়োগের জন্য ঋণ এবং অন্যান্য তহবিল ছাড় করে। বীমা ঝুঁকি স্থানান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বীমা প্রতিষ্ঠানের কাঁধে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি নেয় এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বীমার ভূমিকা রয়েছে। এই ঝুঁকি হস্তান্তর প্রক্রিয়া আছে বলেই ব্যবসায়ীরা নিরুদ্বিগ্ন থাকতে পারেন এবং উৎকণ্ঠাহীনভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে। এ ছাড়া বীমাশিল্প অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অর্থের সংস্থান সৃষ্টি করে। সে তার অর্জিত আয় ব্যাংকে জমা রেখে দেশের পুঁজি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক চাহিদা সৃষ্টি করে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করে, যার ফলে GDP বৃদ্ধি পায়। উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বৈদেশিক বাণিজ্য বা আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র বা  Letter of credit বা  L/C খোলাতে হয় এবং এ জন্য বীমা কাভার নিতে হয়। কেননা দুই দেশে পণ্যদ্রব্য জাহাজে আনা-নেওয়া করা সম্ভব হলেও মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব বীমা প্রতিষ্ঠানের।

যদি আমাদের দেশে মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ক্ষুদ্র বীমাঋণ, অসুস্থতা, মৃত্যুঝুঁকিসহ চালু করা যায়, তবে বীমা গ্রাহকদের অকস্মাৎ মৃত্যুতে ঋণের দায় পরিশোধ, দুর্ঘটনায় পঙ্গু হলে চিকিৎসার ব্যয় প্রদান, পরিবারের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হবে। ফলে এই বীমা পলিসি দারিদ্র্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখতে পারবে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র বীমার জন্য যদি করপোরেট এজেন্ট, ব্যাংক অ্যাশিউর‌্যান্স চালু করা যায়, তাহলে NGO/MFও ব্যাংকের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বীমার আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং  NGO/MFI ব্যাংকসহ বীমা কম্পানিও লাভবান হবে। এ ছাড়া শিক্ষা বীমা, গ্রুপ বীমা, সম্পত্তি বীমা ও বিবিধ বীমার পরিধি বৃদ্ধির জন্য সরকারি সম্পত্তির বীমা এবং জাতীয় বীমানীতি ২০১৪-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা গেলে এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বীমার ভূমিকা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

লেখক : প্রধান অনুষদ সদস্য এবং পরিচালক (অ.দা.), বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স একাডেমি

মন্তব্য