kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

আপনাকে অভিনন্দন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী

আলী হাবিব

১ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আপনাকে অভিনন্দন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী

২৭ ফেব্রুয়ারি, মধ্য ফাল্গুনের বিকেলটা ছিল একেবারেই অন্য রকম। অনন্য এক শুভ সংবাদ দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের একটি গৌরবোজ্জ্বল মহৎ অর্জনের সুসংবাদ জানালেন দেশের মানুষকে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা ইউএন-সিডিপির পাঁচ দিনব্যাপী ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনাসভা শেষে শুক্রবার রাতে এই সিদ্ধান্ত আসে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, ‘এ কৃতিত্ব সমগ্র বাংলাদেশের জনগণের।’ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই মাইলফলক অর্জন করেছে বলে মনে করছেন তিনি। তাই প্রবাসীদেরও এই কৃতিত্বের অংশীদার করতে তিনি একেবারেই দ্বিধান্বিত নন। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ বা যোগ্যতা অর্জন তিনি দেখছেন, ‘সমগ্র জাতির জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের’ বিষয় হিসেবে।

জাতিসংঘ ১৯৭১ সালে কিছু নির্ণায়কের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের সবচেয়ে কম উন্নত দেশগুলোকে স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি হিসেবে পৃথকভাবে শ্রেণিবদ্ধ করে। ১৯৭৫ সাল থেকে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে থাকা বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা ইউএন-সিডিপির সব শর্ত পূরণ করে ২০১৮ সালে। জাতিসংঘের নিয়মানুযায়ী কোনো দেশ পর পর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণের মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ পায়। সিডিপি তিনটি সূচকের ভিত্তিতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করে। তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ শর্ত পূরণ করে অনেক এগিয়ে গেছে। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার জন্য একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হয় কমপক্ষে এক হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার, ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল এক হাজার ৮২৭ ডলার। মানবসম্পদ সূচকে নির্ধারিত মানদণ্ড ৬৬-এর বিপরীতে বাংলাদেশের অর্জন ৭৫.৪। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে উত্তরণের জন্য মানদণ্ড নির্ধারিত ছিল ৩২ বা তার কম। কিন্তু ওই সময়ে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২৭।

সিডিপির প্রবিধান অনুযায়ী উত্তরণের সুপারিশ পাওয়ার পর একটি দেশ তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত প্রস্তুতি সময় ভোগ করতে পারে। করোনাভাইরাস মহামারির বাস্তবতায় উত্তরণ প্রক্রিয়াকে টেকসই ও মসৃণ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে সিডিপির কাছে প্রস্তুতির জন্য পাঁচ বছর সময় চাওয়া হয়েছে। সব ঠিক থাকলে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল শেষে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে আনুষ্ঠানিক উত্তরণ ঘটবে।

অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ওঠার পর বাংলাদেশকে বেশ কিছু বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। মোকাবেলা করতে হবে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও। যেমন—সস্তা ঋণ পাওয়া এবং বিভিন্ন রপ্তানি সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। বিশ্ববাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, বিভিন্ন পণ্যে আমদানি শুল্ক আরোপসহ আরো কিছু সুযোগ ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে হবে। বেশ কিছু সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রহিত হয়ে যাবে; অন্যদিকে এর সুবিধাগুলো কাজের মাধ্যমে অর্জন করে নিতে হবে। তাঁরা মনে করছেন, এখন দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুবিধা কাজে লাগাতে তৈরি পোশাকশিল্পে অতিনির্ভরতা কাটিয়ে পণ্যের বহুমুখীকরণের পাশাপাশি অর্থনীতির সার্বিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। অন্যদিকে বাংলাদেশ বাইরে বাজার সুবিধা টিকিয়ে রাখতে পারবে কি না; তৈরি পোশাক রপ্তানি নিয়ে কোনো উদ্বেগ দেখা দিলে করণীয় কী, তা নিয়েও ভাবতে হবে। মানবসম্পদের উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে এখন। এক্সচেঞ্জ রেট ইস্যু, পোর্ট ইস্যু, পরিবহন ইস্যুসহ সব চ্যালেঞ্জ অ্যাড্রেস করে মার্কেট অ্যাকসেস সৃষ্টি করতে হবে বলে মনে করেন দেশের অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে রপ্তানির উপযুক্ত পরিবেশও সৃষ্টি করতে হবে।

আমরা আমাদের অর্থনীতি ও সার্বিক উন্নয়নের দিকে একটু দৃষ্টি দিতে পারি। ২০০৮-০৯ বছরে জিডিপির আকার ছিল মাত্র ১০৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০ সালে তা ৩৩০.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০৮-০৯ বছরে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ১৫.৫৭ বিলিয়ন ডলার। আর ২০১৮-১৯ বছরে তা ৪০.৫৪ বিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৭.৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৪৪.০৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০১ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮.৯ শতাংশ এবং হতদরিদ্রের হার ছিল ৩৪.৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২০.৫ শতাংশ এবং হতদরিদ্রের হার ১০.৫ শতাংশে। ২০০৯-১০ সালে বিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার ২৭১ মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৪ হাজার ৪২১ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুৎ সুবিধাভোগী জনসংখ্যা ৪৭ থেকে বেড়ে ৯৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে তৃতীয় এবং মাছ-মাংস, ডিম, শাক-সবজি উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে এবং ইলিশ উৎপাদনকারী ১১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর সুবিধা আজ শহর থেকে প্রান্তিক গ্রাম পর্যায়েও বিস্তৃত হয়েছে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পদ্মা সেতু দৃশ্যমান। মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পসহ বেশ কিছু মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দুই ডজনের বেশি হাইটেক পার্ক এবং আইটি ভিলেজ নির্মিত হচ্ছে।

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা এক ধাপ বাড়ল। উন্নয়নশীল দেশের সুফল পেতে হলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের মানুষের দক্ষতার উন্নয়ন করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আজকের বাংলাদেশ এক বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। নিঃসন্দেহে এই বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, দেশের মানুষই এসব কাজ করে দিয়েছে। কিন্তু তাঁর ‘মিশনারি ভিশন’ আর গত ১২ বছরের নিরলস পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার ফসল আজকের এই অর্জন—এ কথা তো অস্বীকার করা যাবে না।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা ছিল বাঙালির মহত্তম অর্জন। সেই স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ও জাতির পিতার জন্মশতবর্ষে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ নিঃসন্দেহে আলাদা তাৎপর্য বহন করে। বাঙালির এই অর্জনে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আপনাকে অভিনন্দন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

 

লেখক : সাংবাদিক, ছড়াকার

মন্তব্য