kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার

আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ, পিএইচডি

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে এ পর্যন্ত ৭০টি বছর পেরিয়ে গেল। আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উৎসব চলছে।

আত্মমূল্যায়ন করলে দেখা যায়, বাংলা ভাষার প্রতি যথার্থ মূল্যায়ন করতে আমরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি।

ইংরেজি ভাষানির্ভরতার জন্য শিক্ষা ও গবেষণায় আমরা জাতি হিসেবে পিছিয়ে গেছি। বলা যায়, নিজের ভাষায় জ্ঞান ও বিজ্ঞান উদ্যোগহীনতার ফলে আদৌ উন্নয়ন হয়নি। আমরা শিক্ষিত বাঙালিরা এমন একটি জায়গায় পৌঁছে গেছি যে ৩০ সেকেন্ড বাংলায় কথা বলার যোগ্যতা হারিয়েছি। অনেক মহাপ্রাণ বলিদান হলো, ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ গেল, দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠিত হলো, বিনিময়ে স্বাধীনতা এলো। অথচ যে ভাষার জন্য আমাদের এই সংগ্রাম ও ত্যাগ, সেই স্বাধীন দেশে নিজের মাতৃভাষাকে সঠিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা ও সর্বস্তরে এই ভাষার প্রয়োগের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল।

একুশের চেতনা দিয়েই বাঙালি জাতির শুরু। ২১ থেকে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে চূড়ান্তভাবে সেই চেতনার বিকাশ লাভ ঘটে। আমরা পাই প্রিয় বাংলাদেশ।

আমরা স্বাধীন দেশ পেলাম কিন্তু আজও আমরা নিজের ভাষার চর্চা না করে অপসংস্কৃতিতে নিমজ্জিত। এই অপসংস্কৃতি, দেশপ্রেমহীনতা ও দুর্নীতি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। আমরা এখন বাংলাদেশ ছাড়ছি।

চীন, কোরিয়া, জাপান, জার্মানি, তুরস্ক, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, ইরানি জাতি নিজের ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করে বিশ্বে নিজেদের অবস্থানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। অর্থনীতি, বিজ্ঞান, জ্ঞানে আজ দেশগুলো পরাশক্তি। অন্যের ভাষা শিখে এগোনা যে বেশ কঠিন, অথচ সহজ রাস্তাটি আজও আমরা নির্ধারণ করতে পারলাম না।

স্বাস্থ্য শিক্ষা, প্রকৌশল নিয়ে একটি বিশ্বমানের বাংলা অনুবাদের বই আজও পাঠ্যপুস্তক হিসেবে পেলাম না। যাঁরা আমরা শিক্ষিত হিসেবে দাবি করি তাঁদের জন্য লজ্জার বিষয়।

অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতা। এই ত্যাগের পর সেই ভাষা ৫০ বছরে কতটুকু এগোল—এ প্রশ্ন রাখাই যায়। ইংরেজি শিখে কতটুকু এগোলাম আমরা? ইংরেজি, হিন্দির মিশ্রণে অনেকটা গোঁজামিলে মিশ্রিত সংস্কৃতিতে আমরা ভাষার প্রতি সেই শ্রদ্ধাবোধ অটুট থাকেনি। অটুট থাকেনি দেশপ্রেম।

বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ কোটি বাংলাভাষী মানুষ। আমরা জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা বাংলা চাই; অথচ নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ভালো বাংলা বই প্রকাশ করি না। এটা স্ববিরোধিতা।

ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া আমাদের কোনো গত্যন্তর নেই। নিঃশেষিত ও পরাজয় নিশ্চয়ই কোনো সমাধান হতে পারে না। অতি দ্রুততার সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানো আমাদের প্রধান দায়িত্ব। হয়তো বা একটি সামাজিক বিপ্লব দরকার সুস্থ পরিবর্তনের। মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে সূচনা হয়েছিল আন্দোলনের। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখণ্ডের দুটি ভিন্ন ভাষার জাতিসত্তাকে মিলিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই সমস্যা। এই ভাষা আন্দোলনকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মনে করা হয়। স্বাধীন দেশে ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে এই দিনটিকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা হতো। এই ইতিহাস বাংলাদেশের অনেকেরই জানা। কিন্তু এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরির পেছনে রয়েছে আরো অনেক সংগ্রামের ইতিহাস। সেই সংগ্রামের চেতনা কিন্তু আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

১৯৪৮ সালের প্রথম ভাষা আন্দোলনের সময়েই ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের কনভোকেশনের ভাষণে পাকিস্তানের বড় লাট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হবে, কথাটা উচ্চারণের পর পর ছাত্রদের উচ্চকণ্ঠের প্রতিবাদ ‘না, না’ ধ্বনিত হয়েছিল। মনে হলো বাংলা মায়ের সন্তানরা বুকে আঘাত পেয়েছে—আমরা ’৫২-তে রুখে দাঁড়ালাম। সেই চেতনার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনলাম ১৯৭১ সালে।

আজও কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা চালু হয়নি। একুশের চেতনা বলতে আমরা কী বুঝি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাই হয়েছে সেই জাতির মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় জীবনের ভাষা হিসেবে গ্রহণ ও জীবিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করার মাধ্যমে। আমরা আজও পিছিয়ে আছি। আমরা বিদেশি ভাষা চর্চা করব প্রয়োজনে; কিন্তু নিজের ভাষাকে সমৃদ্ধ করব সবার আগে।

নিজের ভাষার সব কিছুকে গতিশীল করা যত সহজ। গবেষণা জ্ঞান, বিজ্ঞানচর্চায় নিজের ভাষায় মানুষ উৎকর্ষে পৌঁছাতে পারে। আজও নিজের ভাষায় বিশ্বমানের জ্ঞানচর্চার উপকরণ তৈরি করতে না পারা চরম অবক্ষয়, অপমান ।

ফিরে দাঁড়ানো ছাড়া আমাদের কোনো গত্যন্তর নেই। নিঃশেষিত ও পরাজয় নিশ্চয় কোনো সমাধান হতে পারে না। অতি দ্রুততার সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানো আমাদের প্রধান দায়িত্ব। উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজন একটি সামগ্রিক সামাজিক উদ্যোগ।

 

লেখক : অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক-গবেষক ও চেয়ারম্যান, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ট্রাস্ট

মন্তব্য