kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

শিশুদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলুন

এ কে এম আতিকুর রহমান

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শিশুদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলুন

প্রকৃতির নিয়মেই আজকের একটি শিশু ভবিষ্যতে একজন নিখুঁত মানুষে পরিণত হবে। সে তার ওপর বর্তিত দায়িত্ব নেবে ও তা পালন করবে এবং সমাজে তার অবস্থানকে প্রতিষ্ঠা করবে। যে শিশুটি আজ জন্মগ্রহণ করল, সে একদিন মানবিক গুণাবলির অধিকারী হয়ে জাতিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবে এবং মানবকল্যাণে মূল্যবান অবদান রাখবে। এ কারণেই শিশুদের জাতির ভবিষ্যৎ বলা হয়। তাই শিশুদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনার গুরুত্ব অপরিসীম। আর এ ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা।

একটি শিশুকে আত্মবিশ্বাসী এবং আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার জন্য মূল দায়িত্ব মা-বাবা এবং শিক্ষকদেরই নিতে হবে। তবে তাদের সহপাঠী এবং প্রতিবেশীদের প্রতি তাদের আচরণ, মিথস্ক্রিয়া ইত্যাদিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আমরা জানি আত্মবিশ্বাস সাফল্যের সড়ক তৈরি করে। আত্মবিশ্বাস একজন ব্যক্তিকে বিশ্বের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার ক্ষমতা অর্জন করতে সহায়তা করে। এটা সত্য যে আত্মবিশ্বাসকে পরিচর্যা ও অনুশীলনের মাধ্যমে বিকশিত এবং উন্নত করা যায়। এ ক্ষেত্রে একটি শিশুর অবস্থান বা অনুভূতি কোনো বিষয় নয়। মা-বাবারা তাদের সন্তানদের অনুশীলন করার এবং দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিয়ে আত্মবিশ্বাসের উন্নয়নে সহায়তা করতে পারেন। শিশুরা ভুল করবে, তারা অকৃতকার্য হবে; তবে তারা প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শিখবে। নিজেদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য শিশুদের অনুপ্রাণিত করা দরকার। আর এ ক্ষেত্রে মা-বাবাই তাদের সন্তানদের সক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি বোঝে।

প্রাথমিক স্তরে পাঠদানের লক্ষ্যটি এমন হওয়া উচিত যে শিশুরা খেলতে খেলতে আনন্দের সঙ্গে শিখবে। লেখাপড়ার পদ্ধতি যদি মানসিক চাপের উৎস হয়ে দাঁড়ায় বা কঠিন মনে হয়, তবে তারা পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাতে পারে। পাঠদানের পদ্ধতি ও কৌশল হতে হবে শিশুদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা বিকাশের সহায়ক। একজন শিক্ষকের শিক্ষাদানের পদ্ধতি হবে আকর্ষণীয়, সহজে বোধগম্য এবং মেধা বিকাশের ভিত্তি। আমাদের লক্ষ রাখতে হবে যে পড়াশোনা যেন শিশুদের জন্য কোনো বোঝা বা চাপের কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, যার ফলে পড়াশোনার প্রতি তারা আগ্রহই হারিয়ে ফেলে।

শিক্ষার পদ্ধতিগুলো এমন হওয়া উচিত, যাতে শিশুরা নিজেদের থেকেই কিছু করার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো কিছু সৃষ্টি করার জন্য শিশুদের আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা।

একটি শিশু যদি কোনো বিষয়ে মৌখিক বা লিখিতভাবে তার নিজস্ব ভাবনা প্রকাশ করতে পারে, তবেই একজন শিক্ষকের পাঠদান সফলতা পায়। তার মনে যা আসে তাই তাকে ভাবতে দিন, সে যেমন করে চিন্তা করে সেভাবেই তা প্রকাশ করতে দিন। অনেক সময়ই তারা অঙ্কনের মাধ্যমে তাদের চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ করতে পারে। এভাবেই তারা তাদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী কাজ করে আত্মবিশ্বাস এবং আত্মনির্ভরতাকে বৃদ্ধি করতে পারে। যখন এই দুটি বিষয় একটি শিশুর জীবনের শুরুতেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন ভবিষ্যৎ বাস্তবতা যা কিছুই হোক না কেন, তার চলা বাধাগ্রস্ত হবে না। সে সব বাধাকে সম্মুখীন করতে সক্ষম হবে। কারণ তার মধ্যে যে সেই মানসিক শক্তি এবং প্রতিভা রয়েছে।

শিশুদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা এবং আচরণের বিকাশে সহায়তা করতে হবে। তাদের পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশের সুযোগ দিলে দেখা যাবে তার নিজের ওপর আস্থা এবং আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে। শিশুদের অতিরিক্ত প্রশংসা না করে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে কঠোর পরিশ্রম করার জন্য আরো অনুপ্রাণিত করতে হবে। শিশুদের সঠিক পরামর্শ দেওয়া এবং গাইড করা উচিত। অন্যের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষমতা তার আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে তোলে। শিশুদের সমস্যা সমাধানের কৌশল শেখাতে হবে। সমস্যার সমাধা না করে দিয়ে সমস্যা সমাধানে তাকে সহায়তা করুন। আপনার সন্তানদের উৎসাহিত করুন, তবে তাদের আপনার ওপর নির্ভরশীল করবেন না। তারা তাদের মতো করেই সমস্যার সমাধান সন্ধান করুক। তাদের পাশে দাঁড়ান এবং সাহায্য করুন, তবে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও উৎসাহ ব্যতীত তাদের কাজে হাত দেবেন না। বাড়িতে বা ঘরের কিছু কাজে তাদের দায়িত্ব দিতে হবে। মা-বাবাকেও তাদের আত্মবিশ্বাসের উন্নতি করা আবশ্যক। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবাই হতে পারে সন্তানদের রোল মডেল। মা-বাবার দৃঢ়তা এবং আত্মবিশ্বাস তাদের সন্তানদের অনুপ্রাণিত করবে এবং তারা তা অনুসরণ করবে।

শিক্ষকদের বন্ধুদের মতো হওয়া উচিত। শিশুরা ভয় থেকে শিখতে পারে না; বরং তাদের আত্মবিশ্বাস হারাতে পারে। তারা যেভাবে সঠিক কাজটি করতে পছন্দ করে সেভাবেই তাদের গাইড করতে হবে। শিশুদের পাঠ্যসূচি এবং পাঠ্যপুস্তক সম্পর্কে আমাদের যত্নবান হতে হবে, যাতে তাদের ওপর অযথা পড়াশোনার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া না হয়। শিক্ষার বিষয়ে শিশুদের মধ্যে যেন কোনো অনীহা বা অসন্তোষ সৃষ্টির অবকাশ না থাকে। শিশুদের প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে বেড়াতে নেওয়া যেতে পারে। এটি তাদের মানসিক বিকাশে সহায়তা করবে। স্কুল কর্তৃপক্ষ বা অভিভাবকরা নিজেরাই এজাতীয় প্রগ্রাম পরিচালনা করতে পারেন।

শিশুদের প্রতি সদয় হতে হবে। তাদের স্নেহ এবং ভালোবাসা দিয়ে বেড়ে ওঠার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। কোনোভাবেই তাদের প্রতি আমাদের নির্দয় হওয়া উচিত হবে না। তারা ভালো কিছু অনুসরণ করলে অবশ্যই ভালো কিছু শিখবে। প্রতিটি শিশুর মধ্যে যেন সামাজিক, পারিবারিক এবং মানবিক মূল্যবোধের গুণাবলি জন্ম নেয় সেদিকে অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে।  

শিশুদের আদর্শ ও জ্ঞানী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মা-বাবার দায়িত্ব অসীম এবং এই কাজটি তাদের শৈশবকাল থেকেই শুরু করা দরকার। একদিন এই শিশুরা বড় হবে এবং তাদের মতো করেই তাদের নিজস্ব জীবন খুঁজে নেবে। শিশুরা যেহেতু জাতির ভবিষ্যৎ; যদি তারা আত্মবিশ্বাসী এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে গড়ে ওঠে, তবে জাতির আত্মবিশ্বাস ও স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রও দৃঢ়তর হবে।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

মন্তব্য