kalerkantho

সোমবার । ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ৮ মার্চ ২০২১। ২৩ রজব ১৪৪২

ভিন্নমত

শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক দরপতনের পেছনে

আবু আহমেদ

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক দরপতনের পেছনে

শেয়াবাজারের ওঠানামা প্রকৃতপক্ষে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শেয়ারবাজারের সূচক পিক (চূড়া) থেকে ৪০০ পয়েন্টের বেশি নিচে নেমে গেছে। এক থেকে দেড় মাস আগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের অবস্থান পাঁচ হাজার ৯৬০ পয়েন্ট পর্যন্ত উঠেছিল। সূচক যখন বাড়ে, টার্নওভারও বাড়ে। এটাই নিয়ম। বিশ্বে এটাই ঘটে। সূচক পড়তে থাকলেও টার্নওভার দু-এক দিন বাড়ে; কিন্তু পতন অব্যাহত থাকলে টার্নওভার আরো বেশি পরিমাণে কমে যায়। গত সপ্তাহে এটা অব্যাহতভাবে ঘটেছে। গত সপ্তাহে সূচক প্রতিদিনই ২০ থেকে ৩০ পয়েন্ট করে কমেছে। ফলে টার্নওভার অনেক কমে গেছে।

এই পতনের আগে শেয়ারবাজারে উৎসাহ-উদ্দীপনা অনেক বেশি ছিল। এর মধ্যে একটা শেয়ার খুব প্রভাব বিস্তার করে। সেটা হচ্ছে মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি রবি। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এটা নিয়ে খুব উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। যেহেতু মার্কেটটা ডমিনেট করছেন অতি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এবং তাঁদের পরিমাণ ৮০ শতাংশ, তাই উচ্ছ্বাসটাই বেশি দেখা যায়। তাঁদের কারণে ১০ টাকার শেয়ারের দাম ৩০-৩৫ টাকায় চলে গেল। প্রথম দিকে সেলারও ছিল না। এরপর ৪৫-৫০ টাকা থেকে কিছু বিক্রেতা আসা শুরু করলেন। অর্থাৎ যাঁরা আইপিওতে পেয়েছেন, তার শেয়ার বিক্রি করা শুরু করলেন। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ারটাকে ৭২ টাকা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। তাঁদের একটা ভাবনা ছিল যে এটা মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি, গ্রামীণফোনের দাম যদি ৩৮০ টাকা হয়, এটার দাম কেন ১০০ টাকার নিচে থাকবে। তাঁরা অত্যন্ত সরল করে ফেললেন। অথচ তাঁরা এর ব্যালান্সশিটের সঙ্গে ইনকাম স্টেটমেন্ট মিলিয়ে দেখলেন না। তাঁদের উচিত ছিল অন্তত রবির আইপিও প্রসপেক্টাসটা পড়া। এতে বিনিয়োগকারীরা জানতে পারতেন আসলেই রবির কী অবস্থা। মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি হলেই যে কেউ বিশাল আয় করবে, তা কিন্তু না। গ্রামীণফোনের সঙ্গে এর তুলনা এই মুহূর্তে চলে না। গ্রামীণফোনের সুবিধা হচ্ছে তার ইকুইটি বেইস বেশি, আয়ও বেশি। তাদের ঋণও কম। মনে রাখতে হবে, রবি যখন এয়ারটেল ও ওয়ারিদকে কিনে নিয়ে মার্জ করেছে, তখন তাদের প্রচুর ঋণ হয়েছে। ফলে তারা লাভ দেখাতে পারছে না।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এমন অবস্থায় রবিকে শেয়ারবাজারে আসতে দিল কেন। এ বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের জানা উচিত, একটা বিশেষ বিবেচনায় এর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটা একটা মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি, সেলুলার টেলিফোন অপারেটরদের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে, তাই এটা বাজারের গভীরতা বাড়াবে বলে আনা হয়েছে। আর শেষ পর্যন্ত দু-এক বছর পর হলেও বিনিয়োগকারীরা এখান থেকে ভালো ডিভিডেন্ড পে আউট করতে পারবেন। এই ধারণা থেকে সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন তাকে অনুমোদন দেয়। এর কারণে বাজার বিশ্লেষকরাও রবিকে চেয়েছিলেন। আমি নিজেও এর পক্ষে বলেছিলাম।

অন্যদিকে ব্রিটিশ আমেরিকা টোব্যাকো কম্পানি নিয়ে আরেকটা ঘটনা। মাস দেড়েক ধরে বাজারে একটা গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হলো, কম্পানিটি বোনাস দেবে। এর আগে কখনো কোনো মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি কী দেবে না দেবে, এটা বাইরে প্রকাশ হতো না। আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, হঠাৎ করে এর দাম বাড়া শুরু হয়েছে। এক হাজার ৩০০ টাকার শেয়ার এক হাজার ৭০০ টাকার বেশি হয়ে গেল। অথচ মাত্র দুই বছর আগে কম্পানিটি সর্বশেষ বোনাস দিয়েছে। পরে কম্পানিটি সত্যি সত্যি বোনাস দিয়েছে। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কম্পানিটি জানিয়েছে, তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ করবে বলে নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছে। এখানে দুর্ভাগ্যজনক একটা বিষয় হলো, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বোনাসের কথা বলে শেয়ার ক্রয় করেছেন। কিন্তু যখন খুবই ভালো বোনাস দিয়েছে, তার পরই আবার কম্পানিটির শেয়ারের দামটা পড়া শুরু করল। তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ভাবনা ও তাঁদের কার্যকলাপকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে? মোটকথা গত এক-দেড় মাসে শেয়ারবাজারে যে পতন ঘটেছে, তাতে রবি ও বিএটিসির এই ঘটনাও বড় ভূমিকা রেখেছে।

আরেকটা ব্যাপার হলো, ফ্লোর প্রাইস বলে একটা কথা আছে। গত সপ্তাহের শুরুতে এটা ছিল ৯০৭ টাকা বা এর কাছাকাছি কিছু। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মনে করলেন, বোনাস দেওয়ার পর এই প্রাইস না-ও থাকতে পারে। এই ভয়ে তাঁরা শেয়ার বিক্রি করা শুরু করলেন। এভাবে তাঁরা ভুল সিদ্ধান্ত নিলেন। অথচ ভুলটা ধরা পড়ার পর দাম আবার ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেড়ে গেল। এভাবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা না বুঝে, না জেনে সিদ্ধান্ত নেন এবং ভুল ব্যাখ্যা করে বলে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। রবির ব্যাপারে এমনটা ঘটল। রবির ডিভিডেন্ড দেবে বলে গুজব ছড়াল। যদিও রবি পরে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তাদের আয় নেই, ডিভিডেন্ড দেওয়া সম্ভব নয়। আর এটাই বাস্তবতা।

আরেকটা সমস্যা হলো আমাদের বিনিয়োগকারীরা দ্রুত লাভ চান। এর মিল পাওয়া যায় পাকিস্তানে। সেখানকার বিনিয়োগাকারীরাও চান তাঁদের লাভটা তাঁদের অ্যাকাউন্টে চলে আসুক। ফলে একজন যখন বিক্রি শুরু করে দেন, অন্যরাও বিক্রি করে দেন। কার আগে কে বিক্রি করে, এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এতে শেয়ারবাজার অনেক সময় পড়ে যায়। এটা আরো অনেক দেশেও হয়।

আমি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বলে থাকি, ভাই, একটা কম্পাানির শেয়ারের যে দামটা হওয়া উচিত এবং দাম যদি তার থেকে নিচে থাকে, তাহলে এই শেয়ার ক্রয় করলে আপনার ক্ষতিটা কী? আমার কাছে অনেকে জানতে চান, পতনের কারণে বাজারটা আগের জায়গায় চলে যাবে কি না। আমার জবাব হলো, যাবে না। কারণ আগের জায়গায় গেলে অনেক শেয়ার এত সস্তা হবে যে এখন মানুষ আর এগুলো ছাড়বে না। সুতরাং এখনো যাঁরা বুঝেশুনে কিনবেন, তাঁরা অনেক লাভ করবেন। আমি সব সময় একটা কথা বলি, শেয়ারবাজারে মার্কেট মুড বা মার্কেট সেন্টিমেন্টও একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আর কম্পানির অবস্থা কী, কম্পানির ব্যবসা বাড়ছে কি না, সেটাও আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই না জেনে, না বুঝে এটা-ওটার সমান—এভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

সুতরাং আমি মনে করি, সাম্প্রতিক সময়ে যে শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে, এটা স্বাভাবিক ঘটনা। কখনো কখনো বড় কোনো শেয়ারের ব্যাপারে ভুল-বোঝাবুঝি হলে অথবা হতাশা এসে গেলে শেয়ারবাজারে বড় কারেকশন হয়। এটা বিদেশেও ঘটে। ভারতেও হয়েছে অনেকবার। চীনেও হয়েছে। তাই সাম্প্রতিক সময়ের পতনটাকে কারসাজিও বলা যাবে না। এ ক্ষেত্রে পেনিক সেল ঘটেছে। আর এই মুহূর্তে কারসাজি হলে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পক্ষে ধরা সম্ভব।

আসলে আমাদের গুরুত্ব দিয়ে বোঝা উচিত, আমাদের লোকজন আইপিও শুরু হলে প্রথম ট্রেডিংয়েই কেন তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি দাম দিয়ে কেনা শুরু করে। এর মধ্যে সম্প্রতি একটি আইসিও কম্পানির শেয়ার ২৫ টাকা করে কিনেছে। একটি ঠিকাদারি কম্পানির শেয়ার ১০০ টাকায় কিনেছে। এনার্জি প্যাকের শেয়ারও অনেক বেশি দামে কিনেছে। অর্থাৎ যখনই আইপিও শুরু হয়, তখন তারা অনেক বেশি দামে নিয়ে যায়। তারপর এর দাম এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে। তাই এবারের ঘটনায় আমি সব দোষ বিনিয়োগকারীদের দিতে চাই। তাঁরা কেন ওভার ভ্যালুড শেয়ার ক্রয় করেন, যখন বারবার নিচে নেমে আসে?

মোটকথা, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হয়ে পড়া, বাজার সম্পর্কে জ্ঞানের ঘাটতি, অতি অল্প সময়ে ধনী হওয়ার প্রবণতা আমাদের শেয়ারবাজারের অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী। এবারও তা-ই ঘটেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, অল্প সময়ে ধনী হতে গেলে অল্প সময়ে টাকাও হারাতে হয়। এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। এটা অন্য দেশের শেয়ারবাজারেও ঘটেছে। এখানে কাউকে দোষ দেওয়ার সুযোগ নেই।

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : আফছার আহমেদ

 

মন্তব্য